kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস কোন পথে?

ড. সমীরুজ্জামান সমীর, ড. আবু সায়েদ মাহমুদ ও ড. এনায়েতুর রহমান   

২ জুলাই, ২০২০ ১৭:২৯ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



বাংলাদেশে করোনাভাইরাস কোন পথে?

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও কভিড-১৯ মহামারি হানা দিয়েছে এবং দেশ আজ এক অস্বাভাবিক অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কভিড-১৯ রোগী ধরা পড়েছে এক লাখ ২২ হাজার এবং মোট মারা গেছে এক হাজার ৫৮২ জন (২৪ জুন, ২০২০)। অন্যদিকে এই পর্যন্ত বিশ্বের ২১৩টি দেশে প্রায় ৯৩ লাখ লোক এতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার লোক মারা গেছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার প্রতি এক লাখ জনে একজন মানুষ এই রোগে মারা গেছে, যেখানে সারা বিশ্বে মৃত্যু হয়েছে গড়ে ১৬ হাজার জনে একজন। কভিড-১৯ মহামারির কারণে ইউরোপের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে আরো অনেক বেশি (মোট জনসংখ্যার তিন হাজার ৮৭৩ জনে একজন)। বাংলাদেশে অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় টেস্টের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো কয়েক গুণ বেশি। বাংলাদেশে টেস্টের অপ্রতুলতার কারণে যেহেতু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা কম, মৃতের সংখ্যা দিয়েই মহামারির ভয়াবহতা বিচার করাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশের মতো এত ঘনবসতিপূর্ণ একটা দেশে, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বেশির ভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয় না, অতি সংক্রামক যেকোনো রোগ অন্যান্য দেশের তুলনায় আরো দ্রুত ছড়ানোর কথা। মার্চে শুরু হওয়ার সাড়ে তিন মাস পরেও রোগের বিস্তারের যে হার এবং মৃত্যুর যে হার তা বিশেষভাবে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের কম। বিশেষভাবে ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুবিধাদি নিতান্তই অপ্রতুল, সেই দিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কথা। এখানে একটা যুক্তি হতে পারে যে বাংলাদেশে হয়তো এখনো মহামারির পিকটা আসেনি বলে মৃতের হার কম। কিন্তু কেন এই পিক আসতে এত ঘনবসতিপূর্ণ একটা দেশে সাড়ে তিন মাসের ওপর সময় লাগবে? করোনাভাইরাসের তীব্রতা কি বাংলাদেশে কম? কম হলে কেন কম? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। আরো একটি প্রশ্ন এখানে করা যায়, বাংলাদেশে কি মার্চের আগে করোনাভাইরাস অনুপ্রবেশ নেই? চীন থেকে জানুয়ারিতেই বাংলাদেশে করোনা অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা কি উড়িয়ে দেওয়া যায়? বলা কি যায় যে বাংলাদেশ পিক পেরিয়ে গেছে? 

মহামারির শুরুর দিকে বিশ্বব্যাপীই করোনা শনাক্তকরণের টেস্টের অপ্রতুলতা, অনেক সাধারণ উপসর্গযুক্ত রোগীর টেস্ট করতে না যাওয়া, উপসর্গহীন রোগী শনাক্ত না হওয়া, এ রকম আরো নানা কারণে বিপুল পরিমাণ রোগী সরকারিভাবে প্রকাশিত পরিমাণের বাইরে রয়ে গেছে বলে অনুমিত। যদিও যুক্তরাজ্যের সরকারিভাবে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২৪ জুন পর্যন্ত তিন লাখ ছয় হাজার লোক কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে, যবধষঃযফধঃধ.ড়ৎম/ এর মতে, মোট আক্রান্তের এই সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ এবং এ পর্যন্ত মোট মারা গেছে ৪৩ হাজার ৮১ জন। এই তথ্যের ভিত্তিতে যখন আমরা মৃত্যুর হারকে পরিমাপ করি তখন দেখা যায় যে যুক্তরাজ্যে প্রকৃত মৃত্যুর হার ১ শতাংশের চেয়েও কম। যে দেশে টেস্ট যত বেশি হয়েছে, সেই দেশে সরকারিভাবে প্রকাশিত সংখ্যা প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যার তত কাছাকাছি হওয়ার কথা। যদি ধরে নেওয়া যায় যে কাল্পনিক কোনো এক দেশে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া লোকদেরকেই শুধু করোনা টেস্ট করা হয়, সে দেশে মৃত্যুর হার মনে হবে ১০০ শতাংশ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর হার এর চেয়ে অনেক কম। কাজেই যেই দেশে টেস্ট যত কম করা হবে, সেই দেশে প্রকৃত মৃত্যুর হার প্রকাশিত মৃত্যুর হারের তুলনায় তত কম হবে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই অ্যানালিসিসের ফল কী হবে এটা আমাদের ভেবে দেখা দরকার। যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাস প্রবেশ করে বাংলাদেশের প্রায় মাসখানেক আগে, কাজেই বাংলাদেশের এখনকার অবস্থা যুক্তরাজ্যের এক মাস আগের অবস্থার সমান হওয়ার কথা। আজ থেকে এক মাস আগে যুক্তরাজ্যে দৈনিক মৃত্যুর পরিমাণ ছিল ৪৫০ জন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী এই সংখ্যা হওয়া উচিত এক হাজার ১২৫ জন (বাংলাদেশের জনসংখ্যা যুক্তরাজ্যের ২.৫ গুণ), কিন্তু বাংলাদেশে মারা গেছে এক দিনে ৩৮ জন, কাজেই মৃতের সংখ্যার বিচারে যুক্তরাজ্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ গুণ বেশি। যুক্তরাজ্যে এই মহামারির পিক চলে গেছে প্রায় আড়াই মাস আগে, তখন দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এক হাজার ১০০ জন। সেই হিসাবে বাংলাদেশের পিক তো আরো দেড় মাস আগেই চলে যাওয়ার কথা এবং তখন দৈনিক দুই ৭৫০ জন করে মারা যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার ঘনত্ব বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম, স্বাস্থ্যসেবার মান বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়, এসব বিবেচনায় কভিড-১৯-এর মতো এত সংক্রামক একটি রোগ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দ্রুত বিস্তার লাভ করার কথা এবং মৃত্যুর হার হওয়ার কথা অনেক বেশি, কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার বিপরীত। কারণ যাই হোক, এটা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। যদিও বাংলাদেশে যেই পর্যায়ের আতঙ্ক অবস্থা বিরাজ করছে, মহামারির এখন পর্যন্ত গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় তা একটু বাড়াবাড়ি বললেও বেশি বলা হবে না। আমাদের এই আতঙ্কের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আসলে সাধারণ জনগণ। আমাদের অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা একটি বিশ্বব্যাপী মহামারির মধ্যে আছি, কাজেই সাবধানে আমাদের থাকতেই হবে যতটুকু সম্ভব, কিন্তু যতটা আতঙ্কিত আমরা করোনাভাইরাসের কারণে হচ্ছি ততটা কি হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে আমরা আছি? আমাদের মনে রাখতে হবে যে আতঙ্কিত হয়ে গেলে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অনেক অযৌক্তিক কাজ করে ফেলি, যা হয়তো স্বাভাবিক অবস্থায় করার কথা কল্পনাও করতে পারি না। একজন আতঙ্কিত মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও কম কার্যকর হয়, আতঙ্কিত একজন সাঁতার না জানা মানুষ হাঁটু পানিতেও ডুবে মরে যেতে পারে। বাড়াবাড়ি রকমের আতঙ্কিত হয়ে গেলেই সম্ভব হাসপাতাল লকডাউনের মতো কাজ করা, ডাক্তারকে আক্রমণ করা, করোনা রোগীর বাসায় ঢিল মারা এবং এ রকম অযৌক্তিক আরো অনেক কিছু।  
মহামারির শুরু থেকে এ পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে বিশ্বের সব দেশে কভিড-১৯ মহামারির বিস্তার এবং আচরণ এক রকম না। আসলে এক দেশের সঙ্গে অন্য আরেক দেশের তুলনা করাটা অনেক বিবেচনায়ই খুবই কষ্টসাধ্য একটা কাজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা এক দেশের মোট আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যাকে অন্য দেশের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে ফেলি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে যদি একটি দেশের এক কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এক লাখ লোক আক্রান্ত হয় এবং অন্য একটি দেশের দুই কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার লোক আক্রান্ত হয়, তবে যদিও প্রথম দেশে আক্রান্তের সংখ্যা কম, প্রথম দেশেই রোগের ভয়াবহতা বেশি। এই জন্য প্রতি ১০ লাখ লোকের মধ্যে কোন দেশে কতজন আক্রান্ত হলো এবং কতজন মারা গেল সেই সংখ্যার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশকে তুলনা করাটা অনেক বেশি যুক্তিসংগত। ১০ লাখ লোকের মধ্যে কতজন এই ভিত্তিতে তালিকা করলে বাংলাদেশের অবস্থান আক্রান্তের সংখ্যার ভিত্তিতে ৮৯তম এবং মৃতের সংখ্যার ভিত্তিতে ১০৮তম। 
যুক্তরাজ্যে প্রথম মৃত্যু মার্চের প্রথম সপ্তাহে হওয়ার পর দৈনিক নতুন রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে এবং মধ্য এপ্রিলে দৈনিক মৃতের সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছে। তারপর থেকে ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা কমতে কমতে ২৪ জুনে দৈনিক ১৫৪ জনে এসে ঠেকেছে। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের লোকসংখ্যার তুলনা করলে বাংলাদেশে এই সংখ্যা হওয়া উচিত দৈনিক ৩৮৫ জন। এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাজ্য যেই মাত্রার সংখ্যাকে মনে করছে কম, তার ১০ ভাগের একভাগ দৈনিক মৃতের সংখ্যা (৩৮ জন) দেখে বাংলাদেশে আমরা আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছি। 
কোনো দেশে একটি মহামারির প্রকোপ কতটা তা নির্ধারণের জন্য অন্য বছরের একই সময়ে কত লোক সাধারণত মারা যায় এবং মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে মহামারির কারণে মারা যাওয়াটা কোন অবস্থানে আছে তার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়। কভিড-১৯ মহামারির কারণে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশেই অন্যান্য বছরের একই সময়ে মারা যাওয়ার সংখ্যার তুলনার গত কয়েক মাসে অনেক বেশি লোক মারা গেছে এবং অনেক দেশেই কভিড-১৯ মৃত্যুর কারণের প্রথম দিকে চলে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৫০০ লোক বিভিন্ন কারণে মারা যায়, বিগত প্রায় দুই-তিন সপ্তাহ কভিড-১৯-এর কারণে মৃত্যুর সংখ্যা দৈনিক প্রায় ৪০ জন। দৈনিক এই মৃত্যুর সংখ্যা বিভিন্ন মৃত্যুর কারণের মধ্যে ২০তম, বাংলাদেশে জুন মাসে প্রতিদিন পানিতে ডুবেই ৫০ জন লোক মারা যায়। কাজেই করোনাভাইরাসের ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সাবধানে থাকতে হবে; কিন্তু বাড়াবাড়ি যাতে না হয়ে যায় এটা আমাদের দেখতে হবে। বাংলাদেশে কভিড-১৯ প্যান্ডেমিকে যত না ক্ষতি হচ্ছে, পারিপার্শ্বিক অন্যান্য অনেক কারণে ক্ষতি হচ্ছে আরো অনেক বেশি। অনেকে হারাচ্ছেন তাঁদের চাকরি, ছোট ছোট অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে যাচ্ছেন এবং দরিদ্র মানুষ আরো দরিদ্র হচ্ছে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে মধ্যম ও নিুমধ্যবিত্ত অনেক পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, ভবিষ্যতে এর পরিণাম হবে সুদূরপ্রসারী। ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক নন-কভিড রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে না পারায় এর ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ জনগণ। উন্নত বিশ্বের অনুকরণে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ অনেক সময়েই কাজ করার পরিবর্তে ক্ষতিই করছে বেশি। অনেক পরিবারকেই হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় মাথায় নিয়েই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে জীবিকা অন্বেষণে বাইরে বের হতেই হচ্ছে।
কভিড-১৯ মহামারি সারা বিশ্বের সবাইকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে মানবজাতি আসলে এ ধরনের একটি পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। মহামারির প্রথম থেকেই যদিও দেখা গেছে যে বেশির ভাগ কভিড-১৯ রোগীই কোনো প্রকার চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে যাচ্ছিল, কিছু রোগী যে কেন হঠাৎ করে মারা যাচ্ছিল বুঝে উঠতেই বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনেক সময় লেগেছে। শুরুতে অনেক ভুল করেছে, ভুল করতে করতেই শিখেছে কিভাবে করোনা রোগীকে সেবা করতে হয়। বিশ্বব্যাপী এই যে গণ-লকডাউন হলো এর প্রধান কারণই ছিল করোনাভাইরাসের বিস্তারকে একটু দেরি করিয়ে দিয়ে ডাক্তার এবং বিজ্ঞানীদের একটু সময় দেওয়া, যাতে করে রোগ নির্মূলের উপায় বের করতে না পারলেও অন্তত রোগীকে কিভাবে ম্যানেজ করতে হবেÑএটা বের করে ফেলতে পারে। বিশ্বজুড়েই হাজার হাজার বিজ্ঞানীর অক্লান্ত পরিশ্রমে এবং স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ডাক্তার ও নার্সদের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে আমাদের হাতে এখন বেশ কিছু ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি চলে এসেছে, যেগুলো মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে। হয়তো এ কারণেই বিশ্বব্যাপী রোগীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও মৃতের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য লকডাউন দিয়ে রাখাটা ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর পক্ষেও যেখানে সম্ভব না, সেখানে বাংলাদেশে এটা কতটুকু বাস্তবসম্মত এটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা সব দেশই করছে, যাতে করে অন্য রোগীদের সেবা দিয়েও কভিড রোগী ম্যানেজ করতে পারে। করোনাভাইরাসের মতো এত সংক্রামক একটি জীবাণু যে একেবারে চলে যাবে না। লকডাউন না করেও কিভাবে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় তার বাস্তবসম্মত উপায় বের করাই হবে এখনকার চ্যালেঞ্জ। 
এত এত খারাপ খবরের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে জিনোম বিজ্ঞানীরা। গত বছর ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে উৎপত্তির পর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ার সময় সারস-কোভ২ ভাইরাসটির দুই শতাধিক ছোটখাটো মিউটেশন ঘটেছে। কিছু মিউটেশনের ফলে কিছু কিছু দেশে এর তীব্রতা বাড়লেও কিছু দেশে আবার কমেছে। বাংলাদেশে প্রচুর লোক আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর হার কম হওয়ার ওপর এখানকার মিউটেশনগুলোর প্রভাবের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এসংক্রান্ত গবেষণায় বাংলাদেশের বিসিএসআরআইর জিনোম ল্যাবের কাজ বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রিপোজিটরিতে সাবমিট করা ১১১টি জিনোম ডাটার ৭০টিই করেছে বিসিএসআরআইর টিম, যেটি বিশ্বব্যাপীই একক কোনো প্রতিষ্ঠানের উত্তোলন করা ডাটার সংখ্যার ভিত্তিতে প্রথম সারিতে। সারা বিশ্বেই বিজ্ঞানীরা সারস-কোভ২-এর মিউটেশনগুলোর জিনোম সিকোয়েন্স করছে এবং ওই সব ডাটার ওপর ভিত্তি করেই মূলত বিশ্বজুড়ে এরই মধ্যেই ৭৮টি ভ্যাকসিন প্রকল্প চালু করা হয়েছে, আরো ৩৭টি নতুন ভ্যাকসিন প্রকল্প বিকশমান। অগ্রসরমাণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রথম/দ্বিতীয় এই দুইটি পর্যায়ের ট্রায়াল একই সঙ্গে করে চলেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, দুটি যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেকনোলজি কম্পানি ও তিনটি চীনা বৈজ্ঞানিক দল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে বানরের দেহে করোনাভাইরাসকে চেনার মতো প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি সাফল্যের সঙ্গে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং তারা খুবই আশাবাদী যে তাদের এই ভ্যাকসিন মানবদেহেও কার্যকর হবে। যেহেতু বাংলাদেশের সারস-কোভ-২-এর জিনোম ডাটাও আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে কাজ করে যাওয়া বিজ্ঞানীদের কাছে পৌঁছেছে, সেহেতু উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন বাংলাদেশের মানুষের ওপরও কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়। আশা করা হচ্ছে যে বিশ্বের ইতিহাসে এ পর্যন্ত যতা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে এর মধ্যে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনই সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে আমাদের হাতে চলে আসবে।
এ পর্যন্ত প্রাপ্ত উপাত্তে বাংলাদেশের কভিড-১৯ মহামারির যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে মনে হচ্ছে না যেকোনো এক জাদুমন্ত্রবলে হঠাৎ করেই করোনাভাইরাস আমাদের মধ্য থেকে চলে যাবে। তবে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর যে হার তা কোনোমতেই আতঙ্কিত হয়ে সব কিছু অচল করে দেওয়া সমর্থন করে না। এটা একটা মহামারি, নতুন একটা রোগ, যার অনেক কিছুই এখনো অজানা, কাজেই ভয় পাওয়াটাই যুক্তিসংগত, সাবধানেও থাকতে হবে। তবে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। করোনাভাইরাসে যদিও বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেক কম, কিন্তু এর মধ্যেও অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত লোকের মৃত্যুর হার বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের চেয়েই অনেক বেশি। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত লোকেরাই এই মহামারি মোকাবেলায় এবং দেশের লোকদেরকে অন্য রোগের হাত থেকে বাঁচানোর সম্মুখযোদ্ধা। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাটা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে এই মহামারির মোকাবেলা করার ফাঁকে অন্য নন-কভিড রোগে মানুষের মৃত্যু যাতে বেড়ে না যায়। বেশির ভাগ করোনা রোগী এমনিতেই সুস্থ হয়ে যায়, যাদের ঝুঁকি বেশি তাদেরকেই সাবধানে রাখতে হবে। আর দশটা রোগের চেয়ে অনেক বেশি সংক্রামক হওয়ায় আমাদের অনেকেরই কভিড-১৯ হয়ে যাবে, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে করোনা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু না! 

লেখক পরিচিতি : ড. সমীরুজ্জামান সমীর ও ড. আবু সায়েদ মাহমুদ জিনোম গবেষক এবং বিসিএসআইআরের পক্ষে কভিড-১৯ -এর যে ৭০টি জিনোম আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, সেই গবেষণাদলের গবেষক। আরেকজন ড. এনায়েতুর রহমান যুক্তরাজ্যের আলস্টার ইউনিভার্সিটির বায়োডিভাইস গবেষণাগারের গবেষক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা