kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

বুক রিভিউ

যে মুজিব অনন্য, যে মুজিব কৃষকের

মাহতাব হোসেন   

৩০ জুন, ২০২০ ১২:৩২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যে মুজিব অনন্য, যে মুজিব কৃষকের

আজকের কৃষিক্ষেত্রে যে বৈচিত্রময় সাফল্য, বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি-নিরাপত্তাদানে সক্ষমতা সেই ভিত্তি বঙ্গবন্ধু নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে কৃষকের প্রতি অন্তরতম মমত্বে স্থাপন করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান বুঝেছিলেন এই দেশের মানুষের জীবন বদলাতে পারে শুধু কৃষিই। দুরদর্শী শেখ মুজিবকে সেভাবেই তুলে এনেছেন লেখক কৃষিবিদ মোঃ লতিফুর রহমান সুজান তার 'বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ও মৎস্য খাতে উন্নয়ন প্রতিভাস' গ্রন্থে। এই বইয়ে বর্ণিত হয়েছে শেখ মুজিবের কৃষি বিপ্লব, চিন্তা ও মৎস্য সম্পদ দিয়ে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের প্লট। মৎস্যখাতে বঙ্গবন্ধুর অবদান ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এটিই সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ।

জাতির পিতা প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বাধিক উন্নয়নের বৈজ্ঞানিক তৎপরতার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন সম্পদ, ফসলের চাষ, গো-সম্পদ, হাঁস-মুরগির চাষ, দুগ্ধ খামার, সর্বোপরি মৎস্য চাষের ব্যবস্থা করতে বলেছেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলাদেশের মোকাবেলায় সম্ভাবনময় শিল্প যেমন-পাট, চা, চামড়া, মাছ, বনজ সম্পদকে পুনঃসংগঠিত করার উপর জোর দেন এবং এর মধ্য দিয়ে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার কথা বলেন। ১৯৭৩ সালে উত্তরবঙ্গের নাটোরে যান বঙ্গবন্ধু। সেখানে তিনি ধানক্ষেত, সংরক্ষণ ডিপো, পাট গুদাম ও মৎস্য খামারের কার্যক্রম পরিদর্শণ করেন। উত্তরা গণভবনের লেকে রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছের তিন হাজার পোনা ছাড়েন। বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলেই আজ বাংলাদেশ মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর চিন্তারই প্রতিফলন জাতীয় মৎসনীতি ১৯৯৮, যা তার কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রণয়ণ করেন।  

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ, এই দেশের পানিতে যে মৎস্য সম্পদ রয়েছে তা একটি দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুর্নগঠনের সময়ও বঙ্গবন্ধু সমুদ্র সম্পদের উন্নয়নের বিষয়েও উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলে মৎস্য সম্পদের যে বৈচিত্র্যময় অবস্থান তা জানার জন্য নানাবিধ জরিপ ও গবেষণামূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করা হয়। জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে সমুদ্রবিজয় অভিযাত্রার সূচনা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার ১ম দেশ হিসেবে স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় তিনি বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদের (২) নম্বর ধারা অনুযায়ী সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত 'টেরিটোরিয়াল ওয়াটার অ্যান্ড মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট' ১৯৭৪ প্রণয়ণ করেন। তাঁর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিমি এলাকায় মৎস্য আহরণে আইনগত অধিকার পায় বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু মৎস্য সম্পদকে কতটা গুরুত্ব দিতেন তা তাঁর নিজের জীবনের ঘটনাগুলো থেকেই উপলব্ধি করা যায়। গণভবনের লেকে তিনি মাছ ধরতেন, নিজ হাতে মাছকে খাবার দিতেন। তিনি যখন গণভবনের লেকে মাছগুলোকে খাবার দিতে যেতেন তখন মাছগুলো বুঝতে পারতো, তারা এগিয়ে আসতো খেতে। এই দৃশ্য অনেকেই দেখেছেন। তিনি বিভিন্ন সময় ভাষণে মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের কথা বলেছেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে এক ভাষণে খাদ্য বলতে শুধু চাউল, আটা নয়; মাছ, মাংস, ডিম তরিতরকারীও কথাও উল্লেখ করেন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া ভাষণ ছিল কৃষি ও মৎস্য বিপ্লবে যুগান্তকারী ভাষণ। সেসময়ই তিনি কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদায় উন্নিত করার ঘোষণা দেন। বঙ্গন্ধুর সেই যুগান্তকারী ভাষণ লিপিবদ্ধ হয়েছে এই গ্রন্থে যা প্রত্যেক কৃষিবিদদের জন্য গুরুত্ব বহণ করে। 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর একটি বিধ্বস্ত দেশকে কিভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে তার জন্য শেখ মুজিব নিয়েছিলেন যুগান্তকারী কিছু পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি নিজেই মাঠে নেমে পড়েছিলেন। ঘুরে ঘুরে দেখতেন দেশের আনাচে কানাচে কিভাবে কৃষিকে এগিয়ে নেওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু কৃষককে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতেন। তাঁর একাধিক ভাষণে উঠে এসেছে সে কথা। কারণ কৃষক বাঁচলেই, কৃষকের মেরুদণ্ড সোজা হলে বাংলাদেশ উঠে দাঁড়াতে পারবে। বঙ্গবন্ধু এদেশের জমিতে দ্বিগুণ ফসল উৎপাদন করতে বলেছেন। কারণ বঙ্গবন্ধু জানতেন পৃথিবীর সেরা জমি এই বাংলার মাটিই। তিনি জাতি হিসেবে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে নিজেদের পায়ের উপর দাড়াঁতে শিখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কৃষকদের কথা চিন্তা করতেন, তাদের সুযোগ সুবিধার কথা চিন্তা করতেন। কৃষিকাজে সবাইকে উৎসাহ দিতেন। ১৯৭২ সালের প্রথম বাজেট দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। ৩১৮ কোটি টাকার বাজেটের কৃষির জন্য বরাদ্দ ছিল ১০৩ কোটি টাকা। আজকের এই কৃষি সমৃদ্ধ সবুজ বাংলাদেশের বীজ বপন করেছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লেখক সে বিষয়টিই এখানে শুধু কাগজে কলমে প্রমাণ নয়, যেন বাস্তবে দৃশ্যমাণ করেছেন। ১৫৯ পৃষ্ঠার এই বইয়ে যেমন উঠে এসেছে একজন শেখ মুজিবের জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার গল্প, তেমনই প্রতীয়মাণ হয়েছেন একজন কৃষি ও মৎস্যবান্ধব শেখ মুজিব। যিনি বাঙালি জাতিকে অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভর করে, যা আজ চোখের সামনে সুস্পষ্ট।  

কৃষি বিশেষ করে মৎস্য খাত নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ও পদক্ষেপ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আলোচ্য গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই গ্রন্থটিকে আরো বিশিষ্টতা দিয়েছে গ্রন্থটির সাফল্য কামনা করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী শ ম রেজাউল কমির এমপি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এমপি এবং মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজ এর শুভেচ্ছা বাণী। গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করেছে মৎস্য ও কৃষি সম্পর্কিত ৪৭টি দুর্লভ চিত্র, কিছু ভাষণ ও ঘটনার কিউআর কোড যা  গ্রন্থটিকে একটি প্রামাণিক দলিলের মর্যাদা দিয়েছে। লেখকের সাবলীল ভঙ্গিমার লেখা পাঠক হৃদয়ে সহজেই এমন একজন মুজিবকে স্থান করে দেবে; সে মুজিব অনন্য, সে মুজিব আমাদের মাটির দেহের, কৃষকের পরমাত্মীয়।

বইয়ের নাম-বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ও মৎস্য খাতে উন্নয়ন প্রতিভাস
লেখক- কৃষিবিদ মোঃ লতিফুর রহমান সুজান
প্রকাশক-রিদম প্রকাশনা সংস্থা
মূল্য-৩৫০ টাকা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা