kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

স্বাস্থ্য খাতের প্রাসঙ্গিক কথা

অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখর    

৩০ জুন, ২০২০ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্বাস্থ্য খাতের প্রাসঙ্গিক কথা

অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখর

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট প্রণয়ন, প্রণীত বরাদ্দের সঠিক বিনিয়োগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ সত্যি এক দুরূহ ব্যাপার। তবে কোরোনার ফলে সৃষ্ট এই মহামারি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যদশাকে এইবার যেভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে তা ইতিপূর্বে কোনো কারণ দ্বারাই শনাক্ত করা যায়নি। সমস্যা শনাক্ত করা গেলে তার থেকে উত্তরণের সদিচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে উত্তরণ সময়ের ব্যাপার মাত্র। 

একথা অনস্বীকার্য যে, দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চিকিৎসার জন্যে শরণাপন্ন হন। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর প্রথমেই আসে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কথা। পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় চার লক্ষ মানুষ চিকিৎসা সেবার জন্যে বিদেশ গমন করে। ব্যুরো অফ ইমিগ্রেশন, ইন্ডিয়া ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ওই বছর  ২,২৫৬,৬৭৫ জন বাংলাদেশি ভারতীয় পর্যটকের মধ্যে ২,২৫,৬৬৮ জন পর্যটক যান কেবল মেডিক্যাল ভিসায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। 

ভারতে মেডিক্যাল ট্যুরিজম তাদের অর্থনীতি খাতকে সুসংহত করেছে। ভারত সরকার বিদেশি রোগীদের দ্রুত আগমনের জন্যে মেডিক্যাল টুরিস্ট ভিসা, মেডিক্যাল এসকর্ট ভিসা ও অন এরাইভাল ভিসার ব্যবস্থা করেছে যাতে অযথা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পথে সময় নষ্ট না হয়। কেবল যে এই বিপুলসংখ্যক রোগী দেশ ছাড়েন চিকিৎসার জন্যে তাই নয়, বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মেডিক্যাল স্যাম্পলও যায় ভারতে নিয়মিতভাবে। এই স্যাম্পল সংগ্রহের জন্যে ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে ভারতীয় প্রতিনিধিরা আছেন যেমন ঢাকায় লাল প্যাথ ল্যাব।

এখন প্রশ্ন হলো এই যে বিপুল পরিমাণ রোগী এবং রোগীর স্যাম্পল বাংলাদেশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নিয়মিতভাবে যায় এর কারণগুলো কি কি? উচ্চ মূল্যের চিকিৎসা, চিকিৎসার দীর্ঘসূত্রিতা, অপ চিকিৎসা, ভুল চিকিৎসা, প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও নার্সের স্বল্পতা, দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত সরকারি বা বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল কারণ। বাংলাদেশে গত কয়েক বছর স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু দুর্নীতির কেলেঙ্কারির বিষয় সামনে এসেছে। 
ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্য খাতে ১১টি উৎস থেকে দুর্নীতি হয় বলে জানিয়েছে যার মধ্যে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ঔষধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পণ্য কেনাকাটা অন্যতম। বলাবাহুল্য চিহ্নিত এই খাতগুলোর বিরুদ্ধে যে চাইলেই রাতারাতি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে তা নয় তবে সরকার আন্তরিক হলে একই সঙ্গে অনেক কটির বিরুদ্ধে এখনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরেকটি দুর্বল দিক হলো ডাক্তার ও রোগীর অনুপাত ও বিন্যাস। ৬৪ জেলায় ৫৮টি সরকারি হাসপাতালে অভিজ্ঞ ডাক্তার, নার্স, যন্ত্রপাতির অভাব লেগেই থাকে সারা বছর। 

পরিসংখ্যান মতে ঢাকায় প্রতি দশ হাজার লোকের জন্যে ১০.৮ জন, চট্টগ্রামে ৪.৮ জন ডাক্তার নিয়োজিত আছেন। বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীতে এই অনুপাত আরো কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে প্রতি ১০,০০০ জন রোগীর জন্যে ৫.২৬ জন ডাক্তার কাজ করেন যা দক্ষিণ এশিয়াতে দ্বিতীয় নিম্নতম। কেবল ভুটানে প্রতি ১০,০০০ জন রোগীর জন্যে ৩.৭ জন ডাক্তার সেবা দান করেন। পক্ষান্তরে ১৯৯১ সালে স্বাধীন হওয়া জর্জিয়াতে (Georgia ) প্রতি ১০,০০০ জনে  ডাক্তার আছেন ৫০.৯ জন। আরেকটি সমস্যা হলো বাংলাদেশের ৭৮% জনগণ বাস করেন গ্রামে, পক্ষান্তরে ৭০% ডাক্তারের বসবাস শহর অঞ্চলে। এর মূল কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। পারিবারিক স্বচ্ছলতা, সন্তানের শিক্ষা, উন্নততর নাগরিক সুবিধা প্রভৃতি কারণেই ডাক্তার সাহেবরা এতো শহরমুখো। 

যতদিন না এই সমস্যাগুলোকে সঠিকভাবে আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে ততদিন ডাক্তারদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ স্বল্পতা হলো আরেকটি দিক যা স্বাস্থ্য খাতকে দুর্বল করা ও সামগ্রিক অব্যবস্থার জন্যে দায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একটি দেশের মূল বাজেট এর ১৫% বা জিডিপি এর ৫% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। এই অর্থ বছরে (২০২০-২০২১)  প্রস্তাবিত মোট বাজেটের ৭.২ শতাংশ অর্থাৎ ২৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ স্বাস্থ্য খাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যা গত অর্থবছরের তুলনায় তিন হাজার কোটি টাকার মতো বেশি।

এবার শুধু করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সমন্বিত স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণায় ১০০ কোটি টাকা। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী যারা কভিড-১৯ মোকাবেলায় কাজ করছেন তাদের জন্য ৮৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। হতদরিদ্র জনসমষ্টির অর্ধেকই বসবাস করে বিশ্বের পাঁচটি দেশে। 
এদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নামও। বাকি চারটি দেশ হলো ভারত, নাইজেরিয়া, কঙ্গো ও ইথিওপিয়া। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী (Purchasing power parity (PPP), যাঁদের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম, তাঁদের হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন অনুসারে, সারা বিশ্বে এখন দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম আয় করেন এমন দরিদ্র লোকের সংখ্যা ৭৩ কোটি ৬০ লাখ। ২০১৮ সালে এসে ওই পাঁচটি দেশে কত দরিদ্র লোক বাস করে, সেই হিসাবও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ কোটি ৬২ লাখ মানুষের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা অনুযায়ী, এরা হতদরিদ্র। এ ছাড়া ভারতে ৯ কোটি ৬৬ লাখ, নাইজেরিয়ায় ৯ কোটি ৯২ লাখ, কঙ্গোয় ৬ কোটি ৭ লাখ এবং ইথিওপিয়ায় ২ কোটি ১৯ লাখ গরিব মানুষ বাস করে। 

এই হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে স্বাস্থ্যখাতে যতই প্রণোদনা দেওয়া হউক না কেন স্বাস্থ্য রক্ষা করা দুরূহ। এই বিষয়টি সরকারি নীতি নির্ধারকদের অত্যন্ত গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। তাছাড়াও স্বাস্থ্য খাতে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব বিবেচনায় বিশেষ সংস্কারের দাবিদার আর তাহলো আউট অফ পকেট পেমেন্ট/এক্সপেন্ডিচার (OOP)। যে খরচা রোগী বা তার পরিবার চিকিৎসা বাবদ ব্যয় করেন নিজের পকেট থেকে যেখানে রাষ্ট্র, ইস্যুরেন্স বা আর কারো কোনো অবদান অর্থাৎ অংশগ্রহণ থাকে না তাকে সহজে OOP বলা হয়। এই খরচাটি মেডিক্যাল বা নন-মেডিক্যালও হতে পারে।

যেমন ডাক্তারের ফি, ঔষধ, অপারেশন খরচ এইসব হচ্ছে মেডিক্যাল OOP। আর রোগীর পরিচর্যাকারীর পেছনে খরচ, চিকিৎসায় গিয়ে বাড়ি ভাড়া প্রভৃতি হলো নন-মেডিক্যাল OOP। বাংলাদেশি রোগীদের OOP দক্ষিণ  এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সব চাইতে বেশি। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম হওয়া এর একটি মূল কারণ। ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ থেকে জানা যায় বাংলাদেশে OOP হলো ৬৭ % যা কিনা দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে সর্বোচ্চ। ২০১৭ ভুটানের OOP ছিল ১৩.৩১ আর ইন্ডিয়ার ৬২.৪০। অতএব এই বিষয়টিকে নীতিনির্ধারকেরা বিবেচনায় নিয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন এটাই কাম্য! 

এ ছাড়া নন কমুনিকেবল ডিসিস (NCDs) বা ছোঁয়াচে নয় এমন রোগে আক্রান্তরাও স্বাস্থ্য খাতকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে হৃদরোগ, ক্যান্সার, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিস প্রভৃতি সবচাইতে বেশি পরিচিত NCDs। গবেষণা প্রমাণ করে যে প্রতি ১ ডলার যদি NCDs নিরাময়ে ব্যয়িত হয় তাহলে ৭ ডলার সমাজে ফিরে আসে আর তা আসে উৎপাদনশীলতা, দীর্ঘজীবিতা ইত্যাদির মাধ্যম। ২০০০ সালে বাংলাদেশ NCDs এ মৃত্যু হার ছিল ৪২.৬% আর ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬৬.৯ %। ১৫ বছরের ব্যবধানে ২৪.৩ % মৃত্যু হারের বৃদ্ধি স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনাকেই ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাত অন্যান্য খাতের চাইতে অনেক বেশি সমস্যা সঙ্কুল। এই খাতে দুর্নীতিও ব্যাপক। বাজেটে যতই বরাদ্দ বাড়ানো হউক দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে যদি বিনিয়োগ রক্ষা না করা যায়, যদি OOP কমানো না যায়, যদি NDCs এ মৃত্যু হার না কমানো যায়, যদি গ্রামাঞ্চলে ডাক্তার বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি না করা যায় তাহলে স্বাস্থ্য খাতে লক্ষ্য অর্জন সুদূরপরাহত।

লেখক : প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা