kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

কভিড-১৯ পরিস্থিতি

আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার কৌশলে অনানুষ্ঠানিক খাতের ঝুঁকি

সৈকত ইসলাম   

২৭ জুন, ২০২০ ১১:২০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার কৌশলে অনানুষ্ঠানিক খাতের ঝুঁকি

প্রতীকী ছবি

কয়েক দিন ধরে কভিড পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলোর জন্য ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের কিছু পরামর্শ বিভিন্ন মাধ্যমে সামনে আসছে, খরচ কমিয়ে টিকে থাকার জন্য বেশ কিছু পরামর্শ আছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কর্মীদের বেতন বা অন্যান্য ভাতা কমানো। এভাবে বেতন-ভাতা কমানো কতখানি যৌক্তিক, সেটা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, যারা ব্যাংকের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদের অনেকেই এই আলোচনায় শামিল। ব্যাংক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন কমানোর পরামর্শ নিয়ে নিউজ মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়া বেশ উত্তাল। সেটা এক হিসেবে যৌক্তিক। দীর্ঘ সময় ধরেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা বছর বছর বেতন-ভাতা বৃদ্ধি দেখে এসেছে, স্বাভাবিকভাবে এখন বেতন-ভাতা কমানো কেউ-ই সহজে মেনে  নেবে না।

খরচ কমানোর জন্য ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের এই পরামর্শের বাইরে আরো কিছু পরামর্শ ছিল। যেমন— ব্যাংকগুলোকে তাদের বিভিন্ন প্রকাশনা, স্টেশনারি ইত্যাদি খাতে যেমন—ডায়েরি, ক্যালেন্ডার, বিভিন্ন প্রকাশনা, স্যুভেনির, বিজ্ঞাপন বিষয়ে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে বলা হয়েছে, সেই সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারেও মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই এ পথে হয়তো হাঁটবে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পরিচিত কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলার পর সেই আভাসই মিলল। 

গত এক দশকে প্রেস, রেস্টুরেন্ট বা ডেকোরেটরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচুর পরিবর্তন এসেছে, এক দশক আগেও ঢাকা বা দু-একটা বড় শহরের বাইরে মোটামুটি মানের কোনো প্রেস বা রেস্টুরেন্টও ছিল না। ডেকোরেটর নামে যেগুলো ছিল, সেগুলো একেবারেই নিম্নমানের। কিন্তু গত এক দশকে শিক্ষিত অনেকেই এই ব্যবসাগুলোতে এসেছেন। তাঁদের অনেকেই বেশ ভালো অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছেন, প্রেসগুলো আধুনিক হয়েছে, ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠানগুলো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় স্থানীয় পর্যায়ে কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়েছে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এই চাহিদার মূল কারণ ছিল বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, তাদের প্রকাশনা, তাদের স্টেশনারি সামগ্রী। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির বাইরে বেশ একটা বড় শিক্ষিত বা দক্ষ শ্রেণির (ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার, ইভেন্ট ম্যানেজার ইত্যাদি) কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে শুধু তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান তৈরি করেছে তা-ই নয়, স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে অন্য বেশ কিছু সহযোগী প্রতিষ্ঠানেও কর্মসংস্থান হয়েছে।  

এই প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আকারের কর্মসংস্থান তৈরি করলেও তাদের অনেকেই ফর্মাল বা  আনুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত না। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো দেশের  বেশির ভাগ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার অন্যতম কারণ হলো, কম দামে পণ্য উত্পন্ন করা বা সেবা দেওয়া। কম দামে পণ্য উত্পাদন বা সেবা দেওয়ার জন্য তারা স্বল্প মূল্যের অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাই এখানে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁদের শতভাগই আনুষ্ঠানিক কাজের সুবিধাদি (নির্দিষ্ট বেতন, নির্দিষ্ট কাজের সময় বা ছুটি, উত্সবভাতা, চিকিত্সাভাতা) কিছুই পান না এবং তাঁদেরই বেশির ভাগই স্বল্প বেতনে কাজ করে থাকেন। তাঁরা হলেন সেই অনানুষ্ঠানিক বা informal sector-এ নিয়োজিত শ্রমশক্তি, যাঁদের কথা  করোনা পরিস্থিতির দরুন বর্তমানে বাংলাদেশে পত্রপত্রিকায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ইদানীং শোনা যাচ্ছে। প্রেস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে পরিবহন, পর্যটনসহ সব আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক শিল্প বা সেবা প্রতিষ্ঠানেই এই অনানুষ্ঠানিক কর্মীরা আছে। করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাঁদের কী হবে?  তাঁদের জন্য কিছু করা উচিত ইত্যাদি আলোচনাও অল্পবিস্তর আসছে। যদিও এই অনানুষ্ঠানিক বা informal sector-টি কী, কতজন এই খাতে নিয়োজিত আছেন, দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের কী রকম অবদান, সে বিষয়ে খুব বেশি আলোচনা আসছে না।

অনানুষ্ঠানিক বা informal sector নিয়ে মোটামুটি চারটি স্কুল অব থট আছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের উত্পত্তির কারণ বা তার প্রকৃতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও মূল বিষয়ে তারা সবাই একমত যে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মীরা যেসব সুবিধা পেয়ে থাকে, অনানুষ্ঠানিক খাতে সেগুলো সম্পূর্ণ অনুপস্থিত বা খুব সীমিত আকারে উপস্থিত। এই সুবিধাগুলোর মধ্যে আছে চাকরির একটি ফর্মাল চুক্তিপত্র, নির্দিষ্ট বেতন, নির্দিষ্ট কাজের সময় বা ছুটি পাওয়ার বিধান, উত্সবভাতা, চিকিত্সাভাতা, যথোপযুক্ত কারণ ব্যতীত চাকরি না যাওয়ার বিধান। একটি প্রতিষ্ঠান  আনুষ্ঠানিক হলেও তার কর্মীরা অনানুষ্ঠানিক কর্মী হতে পারেন। প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক না অনানুষ্ঠানিক তা সাধারণত নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নিবন্ধন আছে কী নেই তার ওপর। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরকারের বিভিন্ন নিবন্ধন আছে, সে হিসেবে তারা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনানুষ্ঠানিক নয়; কিন্তু তাদের কর্মীরা ওপরে বর্ণিত সুবিধার অন্তর্ভুক্ত নয়, তখন সেই কর্মীরা অনানুষ্ঠানিক কর্মী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন।     

অনানুষ্ঠানিক খাতের এই ধারণা খুব বেশি পুরনো নয়, সত্তরের দশকের শুরুর দিকে কিথ হার্ট নামের একজন প্রথম এই ধারণা দেন। অতিরিক্ত শ্রমিক, স্বল্পমজুরি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে এ ধরনের শ্রমের উদ্ভব হয় বলে তিনি বলেন। আর্থার লুইসসহ অনেক অর্থনীতিবিদ এই খাতটি খুব দ্রুতই বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে মনে করতেন। তাঁদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে এই অনানুষ্ঠানিক খাত শুধু টিকেই থাকেনি; বরং বিংশ শতকের শেষভাগ এবং একবিংশ শতাব্দীতে সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মসংস্থান এই অনানুষ্ঠানিক খাতেই তৈরি হয়েছে। ২০০৯ সালের এক গবেষণা  মতে, তত্কালীন  বিশ্বব্যাপী তিন বিলিয়ন কর্মীর মধ্যে ১.৮ বিলিয়ন কর্মী ছিল এই অনানুষ্ঠানিক খাতে, যা মোট শ্রমশক্তির ৫০ শতাংশেরও বেশি। 

বাংলাদেশে সর্বোচ্চসংখ্যক শ্রমশক্তি কৃষিতে নিয়োজিত থাকায় এবং একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষিবহির্ভূত স্বনিয়োজিত কাজে নিয়োজিত থাকায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির আকারটি গড় বৈশ্বিক আকারের চেয়ে অনেক বেশি। ২০১৭ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্মক্ষম  ৬২.১ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৫১.৭ মিলিয়ন মানুষই অনানুষ্ঠানিক কর্মী, যা মোট শ্রমশক্তির ৮৩ শতাংশের কিছু বেশি এবং এই অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের জিডিপিতে অবদান ছিল ৪৪ শতাংশ। এত অধিকসংখ্যক শ্রমশক্তির তুলনায় তাদের জিডিপিতে অবদান দেখলেই বোঝা যায় যে এই কর্মীদের উত্পাদনশীলতা অনেক কম। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে অনানুষ্ঠানিক খাত দারিদ্র্য দূরীকরণে কতটা কার্যকর, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, তবে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যেখানে আনুষ্ঠানিক খাত শ্রমশক্তির তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনেক পিছিয়ে আছে, সেখানে এই খাত যে কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।   

বাংলাদেশের অনেক শ্রমঘন শিল্প তো বটেই, এমনকি ছোট-বড় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার অন্যতম কারণ হলো, কম দামে পণ্য  উত্পন্ন করা বা সেবা দেওয়া। কম দামে পণ্য উত্পাদন বা সেবা দেওয়ার জন্য অনেক আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানই স্বল্পমূল্যের অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই বাংলাদেশের শিল্প খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির মধ্যে অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের সংখ্যা ৮৯.৯ শতাংশ এবং সেবা খাতে নিয়োজিত অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের সংখ্যা ৭১.৮ শতাংশ। এই বিশালসংখ্যক অনানুষ্ঠনিক কর্মীর মধ্যে অল্পসংখ্যক  অনানুষ্ঠানিক কর্মী (অনলাইনে কাজ করা খুব দক্ষ আউটসোর্সিং কর্মী এবং নিবন্ধনবিহীন কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিক,  দক্ষ কিছু পেশাজীবী) ছাড়া প্রায় সবাই স্বল্প মজুরিতে কাজ করেন। ২০১০ সালের পর বাংলাদেশের ইনফরমাল সেক্টর নিয়ে যেহেতু কোনো ডিটেইল সার্ভে হয়নি, তাই এই স্বল্প মজুরি কত তা বলা সম্ভব নয়। ২০১০ সালের সার্ভে অনুযায়ী এই খাতের কর্মী যাঁরা কৃষিক্ষেত্রে কাজ করে থাকেন, তাঁদের গড় মাসিক আয় এক হাজার ৪০০ টাকার মতো,  আর যাঁরা অকৃষি খাতে কাজ করেন, তাঁদের গড় মাসিক আয় দুই হাজার ২০০ টাকার মতো। বর্তমানে এই আয় নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে; কিন্তু মূল্যস্ফীতি আর আনুষঙ্গিক বিষয়  বিবেচনা করলে প্রকৃত আয় হয়তো খুব বেশি বাড়েনি। তাই এই খাতের বেশির ভাগ কর্মীর আর্থিক অবস্থা বেশ দুর্বল।  আবার একটা বড় অংশ হয়তো সাধারণভাবে দিন আনে দিন খায় যে কথা আছে, তার মধ্যে না পড়লেও যেহেতু তারা খুবই স্বল্পমূল্যে কাজ করে থাকে এবং  তারা আনুষ্ঠানিক কাজের সুবিধাদি নির্দিষ্ট বেতন, নির্দিষ্ট কাজের সময় বা ছুটি, উত্সবভাতা, চিকিত্সাভাতা কিছুই পেয়ে থাকে না, ফলে তাদের আয়ের প্রায় পুরোটাই ব্যয় হয়ে যায় এবং সঞ্চয় বলতে গেলে থাকেই না। এদের অনেকেই নিয়মিত আয় করতে থাকলে মধ্যম আয়ের শ্রেণিভুক্ত হবে; কিন্তু সেই আয়ে সামান্য সময়ের জন্য ছেদ পড়লেও তাদের স্বাভাবিক খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যয় সংস্থান করার উপায় থাকবে না। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল পাঁচ কোটির বেশি। তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কত তার কোনো পরিসংখ্যান নেই, তবে প্রতিজনের বিপরীতে গড়ে যদি  একজনও নির্ভরশীল থাকে, তাহলেও সংখ্যাটি হবে ১০ কোটির বেশি। এই কমবেশি পাঁচ কোটি মানুষের যদি নিয়মিত আয় বাধাগ্রস্ত হয়, তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যয় সংস্থান করতে পারবে না। অনেকেরই খাদ্য ও বাসস্থান ছাড়া চিকিত্সা-শিক্ষার মতো কিছু  নিয়মিত ব্যয় থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। এই কমবেশি ১০ কোটি মানুষের যদি  জীবনধারণের জন্য  অতি প্রয়োজনীয় ব্যয় বাধাগ্রস্ত হয় এবং অন্য সব ধরনের ব্যয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বাকি আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত কর্মী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের অবস্থা যে স্বাভাবিক থাকবে না, তা সহজেই অনুমেয়।     

লেখক : সরকারি চাকরিজীবী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা