kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক পুঁজি ও করোনাকালীন যৌথ দায়িত্বশীলতা

ড. এ কে এম মাহমুদুল হক   

২৩ জুন, ২০২০ ১৫:০৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক পুঁজি ও করোনাকালীন যৌথ দায়িত্বশীলতা

বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সামাজিক পুঁজির অন্যতম ক্ষেত্র, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অ্যালামনাইসহ অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং দায়িত্বশীলতা প্রকাশের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা করা হয়। পাশাপাশি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হয়। অর্থাত্ দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে জাতিগঠন ও দেশগঠনে কার্যকর ভূমিকা পালনের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক বন্ধন, মানবতাবোধ, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা, সৃষ্টিশীলতা, অনুকূল ও প্রতিকূল পরিবেশে দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা, উচ্চতর গবেষণার শিক্ষা দেওয়া হয়। এককথায় শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত জ্ঞানচর্চার সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ, যা জাতি ও রাষ্ট্রকে যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে আলোর পথ দেখায়।    

মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ, আর্তমানবতার উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সামাজিক পুঁজির অবদান অনস্বীকার্য। অতীত ও বর্তমান যেকোনো সময়ের বিচারে মূল্যায়ন করে এটা বলা যায় যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিজেদের মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য হিসেবে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত রেখেছে এবং রাখছে। 

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানবতার জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং সহপাঠী ও স্বজনদের দুরারোগ্য ব্যাধির সীমাহীন চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের জন্য বাক্স হাতে শিক্ষার্থীদের দলবেঁধে নিরলসভাবে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক পুঁজির একটি বড় উদাহরণ। এটাও সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, সামাজিক দূরত্বের মতো অপ্রিয় শর্তগুলো যদি না থাকত তাহলে করোনাকালীন এই দুঃসময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে সামগ্রিক ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী যোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা পালন করত। তার পরও তাদের মানবিক কার্যক্রম থেমে নেই। 

করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহতায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ মহামারি প্রতিরোধ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং মহামারির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পরিবার ও নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষদের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে সীমিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। স্বল্প পরিসরে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা করোনা টেস্টিং ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রস্তুত, বিতরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে করোনা প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে টেকনিক্যাল সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে। 

দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার ক্ষেত্রে অর্থ এবং খাদ্যসামগ্রী প্রদান করে ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া বিভাগসমূহ তাদের শিক্ষক ও অ্যালামনাইয়ের যৌথ তহবিলে নিজ নিজ বিভাগের করোনা ও ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পরিবারকে সাধ্যানুযায়ী আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়তায় কোনো কোনো ক্যাম্পাসে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য পোষা প্রাণী সংরক্ষণের অংশ হিসেবে কুকুর, বিড়াল এবং পাখির নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরা করোনা মোকাবেলায় কার্যকর ওষুধ, উপাদান বা অন্য কোনো কৌশলের সন্ধান করে যাচ্ছেন এবং নিয়মিত গবেষণা পরিচালনাসহ গণমাধ্যমে সংকট মোকাবেলায় যৌক্তিক মতামত প্রদান করছেন।  

জনপ্রিয় ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার যেমন—জুম, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিম, মেসেঞ্জার রুম ইত্যাদির মাধ্যমে ক্যাম্পাসভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যৌথ প্রচেষ্টায় করোনা মোকাবেলার কৌশল এবং সমসাময়িক ইস্যুতে লাইভ প্রগ্রামও আয়োজন করছে, যা এর মধ্যেই সাড়া ফেলেছে। হঠাত্ নেমে আসা করোনার দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের এমন প্রচেষ্টাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে অপ্রত্যাশিত স্থবির শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে ভার্চুয়াল শিক্ষা কার্যক্রমের বিকল্প না থাকলেও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সমস্যা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্বল ইন্টারনেট সেবা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রশিক্ষণের অভাবে আপাতত এটা চালু হচ্ছে না বলেই চলে। ইউজিসি পরিচালিত অনলাইন জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ লক্ষ্যে আনুষঙ্গিক সুবিধা এবং তহবিল সংগ্রহে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সঙ্গে ইউজিসি আলোচনা চালাচ্ছে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অনলাইন এডুকেশন পলিসি প্রণয়নের কাজ করছে। এটা স্পষ্ট যে শতভাগ সমাধান পেতে সময় লাগবে। 

করোনাকালীন ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের বিকল্প হিসেবে শিক্ষকরা তাঁদের ক্লাসগুলোর ভিডিও রেকর্ড করে ফেসবুক আইডিতে অথবা নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করতে পারেন এবং একাডেমিক দিকনির্দেশনাসংবলিত হ্যান্ডনোট এবং ক্লাস লেকচারগুলো একটি নির্দিষ্ট ওয়েব পোর্টালে আপলোড করে দিতে পারেন। ছাত্ররা সুবিধামতো সেই উপকরণগুলো সংগ্রহ করতে পারে। রুটিন করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক একটি নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ব নির্ধারিত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ফোনালাপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসার জবাব দিতে পারেন। তবে এ প্রক্রিয়ায় বাধা হতে পারে শিক্ষকদের একটি অংশের প্রয়োজনীয় আইটি দক্ষতার অভাব। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পরিবারের অথবা নিকটবর্তী কারো কাছ থেকে সাহায্য নিতে পারেন।            

দেশে বর্তমানে সাড়ে আট লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে, যার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই প্রায় সাড়ে চার লাখ। এদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। করোনার প্রকোপে এদের অনেকেই কাজ হারিয়েছে। অনেক পরিবার আছে, যারা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া সন্তানদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবার এখন নিঃস্ব ও অসহায়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তার ওপর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাত মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এদের সাহায্যে সচ্ছল পরিবারের ছাত্র, অ্যালামনাই এবং শিক্ষকদের এগিয়ে আসা উচিত। প্রতিটি বিভাগ বর্ষ অথবা সেমিস্টারভিত্তিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের কাউন্সেলিংয়ের জন্য একাধিক শিক্ষককে দায়িত্ব দিতে পারে, যাঁরা আয়ত্তাধীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলতে পারেন, যেখানে অবদান রাখতে পারেন এমন গুরুত্বপূর্ণ অ্যালামনাই সদস্যরাও সংযুক্ত থাকবেন। 

দিনে দিনে চাকরির বাজার সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে চাকরিপ্রত্যাশীদের সংখ্যা ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলছে। চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো করোনাকালীন যেখানে লোক ছাঁটাইয়ের ধান্ধায় ব্যস্ত, সেখানে করোনা-উত্তর পৃথিবীতে কর্মসংস্থানের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে সেটা সহজেই অনুমেয়। তাই একজন ছাত্র যত দ্রুত চাকরির বাজারে প্রবেশ করবে তত দ্রুত তার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ফাইনাল পরীক্ষা মহামারির পূর্বেই সম্পন্ন হয়েছে সেগুলোর ফলাফল প্রকাশ করা এখন খুব কঠিন কাজ নয়। একটা পরীক্ষা কমিটিতে সাধারণত তিন-চারজন শিক্ষক কাজ করে থাকেন। কমিটির সদস্যরা একটু আন্তরিক হলেই অতি সহজে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ফলাফল প্রস্তুতের কাজটি করতে পারেন। শিক্ষকদের ক্ষুদ্র অথচ মহত্ এই উদ্যোগটি বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে শক্তি জোগাবে বলে মনে করি। 

বন্ধের সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনাকালীন ক্ষতিগ্রস্তদের কল্যাণে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অ্যালামনাইদের মধ্যে সামাজিক পুঁজির ক্ষেত্রটি আরো সম্প্রসারণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। তবেই করোনাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিপক্ষীয় যে সামাজিক পুঁজি গড়ে উঠবে তা করোনা-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কল্যাণে অধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্বাস করি।

লেখক: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা