kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার ঝুঁকি এবং কিছু জরুরি পরামর্শ

ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী   

১৮ জুন, ২০২০ ১৪:২৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার ঝুঁকি এবং কিছু জরুরি পরামর্শ

গত ১ জুন ২০২০ তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জারি করা এক বিশেষ পরিপত্রে ঘরের বাইরে অবস্থানকালে সবার জন্য মাস্ক পরার নির্দেশ জারি করা হয়। এই নির্দেশনা অনুসারে, ‘বাহিরে চলাচলের ক্ষেত্রে সব সময় মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অন্যথায়...’। তার মানে, কোনো রকমের শিথিলতার সুযোগ ব্যতীত ঘরের বাইরে বের হলেই সার্বক্ষণিক মাস্ক পরে থাকা বাধ্যতামূলক। নির্দেশনায় আইনের উল্লিখিত ধারা অনুসারে এই বিধান অমান্য করলে এক লাখ টাকা জরিমানা, অথবা অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।

এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে আপাত যুক্তিটি খুব পরিষ্কার : বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখন চতুর্থ ধাপে আছে এবং প্রতিদিনই শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে এবং ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার অনেক কারণ আছে। দৃষ্টিসীমায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন অনুপস্থিত। এ অবস্থায় সর্বশক্তি দিয়ে করোনা সংক্রমণ রোধের চেষ্টা হিসেবেই সরকারের তরফে মাস্ক বাধ্যতামূলক করার এই উদ্যোগ। কিন্তু একজন অণুজীববিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য গবেষক হিসেবে মাস্ক নিয়ে কিছু জরুরি বিষয় সংস্লিষ্ট সবার জানা থাকা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি।

প্রথমেই একটা বিষয় জেনে নেওয়া দরকার যে মানবদেহে করোনাভাইরাস ঢোকার যে কয়টি রাস্তা (পোর্টাল অব এন্ট্রি) আছে, তার মধ্যে হাত অন্যতম। কারণ ভাইরাস বাতাসে ভেসে আসার চেয়ে বরং হাত থেকে নাকে-মুখে-চোখে যেতে পারে। তাই মাস্ক পরার পাশাপাশি নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, মাস্ক পরে থাকাটা একজন ব্যক্তির মনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়ার ব্যাপারে এক ধরনের মিথ্যা নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে (যা বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত)। এর ফলে মাস্ক পরা ব্যক্তি নিজেকে নিরাপদ ভেবে নিয়ে নিয়মিত হাত জীবাণুমুক্ত করার ব্যাপারে শিথিলতা দেখাতে পারে। আর এমনটি হলে উল্টো একজনের হাতে করোনাভাইরাস কোনোভাবে লেগে গেলে সে মনের অজান্তেই দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে, অন্য মানুষকে এবং অন্য বস্তুতে ভাইরাস ছড়িয়ে যেতে থাকবে।

নিরাপত্তার এই মিথ্যা আশ্বাসের বিষয়টি চিন্তা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাধারণত হ্যান্ড গ্লাভসের সর্বজনীন ব্যবহারে খুব জোর দেয় না। বরং সারা বিশ্বের রোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সবচেয়ে বেশি জোর দেয় নিয়মিত হাত ধোয়ায় (জীবাণুমুক্ত করায়)। তাই মাস্ক বাধ্যতামূলক করতে গিয়ে যেন হাতের মাধ্যমে ভাইরাসটি আরো বেশি ছড়িয়ে না যায়, সেই সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশে জনমানুষের (বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের) জন্য রাস্তায়, বাজারে, সর্বোপরি ঘরের বাইরে হাত ধোয়ার কোনো সুব্যবস্থা এখনো দৃশ্যমান নয়। তাই সবাই মাস্ক পরলেও হাত না ধোয়ার কারণে ভাইরাসের বিস্তার কতখানি ঠেকানো যাবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।

তার ওপরে এটি এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত যে মাস্ক পরা মানুষ মনের অজান্তেই কিছুক্ষণ পর পর হাত দিয়ে মাস্ক ঠিক করা, চুলকানি বা অস্বস্তি কাটানো, এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই ঘন ঘন নাকে-মুখে-চোখে হাত দিয়ে থাকে। এ সমস্যাটি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও হয়ে থাকে, যেখানে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতা যথেষ্ট ভালো। সেই জায়গায় আমাদের দেশে জনমানুষের এই স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব বিবেচনায় নিলে মাস্ক পরার পর কী কী করা যাবে আর যাবে না, করলে কিভাবে করতে হবে, সে বিষয়ে ব্যাপক জনসংযোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের তরফে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

এবার সচেতনতার পাশাপাশি আমাদের দেশের আর্থিক দিকটিও বিবেচনায় আসতে পারে, কারণ কার্যকর মাস্ক কেনার সঙ্গে খরচের বিষয় জড়িত। বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার আশপাশে বাস করে। ঢাকা শহরে লাখো বস্তিবাসী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এমনকি ঘরহীন ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তার ওপর রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর—এমন শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অগণিত। বিত্তশালীদের একটা বড় অংশ যখন ঘরের ভেতর লকডাউন পালন করতে পারছে, সেখানে এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে বের হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সবার জন্য ঘরের বাইরে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার সময় কি এই সব মানুষের বর্তমান আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করা হয়েছে?

তাই মাস্ক কেনার খরচ কমানোর জন্য একই মাস্ক বাধ্য হয়ে এমনকি একই পরিবারের কয়েকজন মিলে ব্যবহার করার আশঙ্কা আছে। সে ক্ষেত্রে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে করোনাভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই সমস্যা মোকাবেলায় ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনে দরিদ্র মানুষের মধ্য বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণের কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।

তার ওপর একই মাস্ক দীর্ঘদিন ব্যবহার করার কারণে তার মধ্যে ধুলা, থুতুর কণা, লালা, মুখের জলীয় বাষ্প জমে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু বংশ বিস্তার করতে বা লম্বা সময় টিকে থাকতে পারে। এটি বরং ব্যবহারকারীর জন্য আলাদা এক ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। এই অবস্থা ঠেকাতে যেসব মাস্ক একবারের বেশি ব্যবহার করা যায় না (যেনন—সার্জিক্যাল মাস্ক এবং এন৯৫ মাস্ক), সেগুলো পুনরায় ব্যবহার না করা, আর কাপড়ের মাস্ক কিভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা যায়, সে ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তদুপরি অভ্যাসগত বা আর্থিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সবার জন্য মাস্ক পরার আরো কিছু সমস্যা আছে। মাস্ক পরার কারণে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা ব্যাহত হয়ে থাকে, যার কারণে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কিছুটা কমে যায়। এটি অনেক সময়, বিশেষ করে যারা লম্বা সময় কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করে, তাদের মধ্যে হাইপোক্সিয়া (রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি) বা হাইপারকার্বিয়া (রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের আধিক্য) ঘটিয়ে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে আগে থেকেই অন্যান্য সমস্যা (কো-মরবিডিটি) আছে, এমন ক্ষেত্রে এগুলো এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কারা কখন কোন অবস্থায় মাস্ক খুলে ফেলতে পারবে, সেই বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে সবাইকে জানানো দরকার বলে মনে করি। 

সর্বসাধারণের জন্য মাস্ক পরার নিয়ম নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা আমেরিকার ভেতরে এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে টানাপড়েন চলছে। এ নিয়ে এরই মধ্যে জল ঘোলা কম হয়নি। সর্বশেষ এখন যদিও মাস্ক পরার নির্দেশনা এসেছে, কিন্তু সেটা সর্বাবস্থায় বাধ্যতামূলক আইন আকারে পৃথিবীর কোথাও নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা আছে, আপাত সাধারণ একজন ব্যক্তি তখনই মাস্ক পরবে, যখন সে লোকসমাগম আছে এমন স্থানে (যেমন—দোকানে, বাজারে, গণপরিবহনে) থাকবে। এ ছাড়া বাকি সময় মাস্ক পরার কোনো নির্দেশনা নেই।

কিন্তু অবাক করার বিষয়, বাংলাদেশে জারি করা নির্দেশ অনুসারে ঘরের বাইরে বের হলেই এই মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কেন পৃথিবীর সবার থেকে আলাদা, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা কোথাও পাওয়া যায়নি। উপরন্তু ভুল নিয়মে মাস্ক পরার দরুন উল্টো করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়।

এ অবস্থায় বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করোনাভাইরাস সংক্রমণের চ্যালেঞ্জ আরো কার্যকরভাবে মোকাবেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা নির্দেশনায় কিছু পরিমার্জন বা পরিবর্ধন আনা যেতে পারে বলে মনে করি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় তাদের মধ্যে বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। তার সঙ্গে মাস্ক ব্যবহারের সঠিক নিয়মাবলি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরামর্শসমূহ জনসাধারণের মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক ভিত্তিতে উন্মুক্ত স্থানে হাত ধোয়ার (জীবাণুমুক্ত করার) জন্য বুথ স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সর্বোপরি এ ধরনের যেকোনো পলিসি বিবেচনা বা বাস্তবায়নের সময় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করি। ধন্যবাদ।

লেখক : অণুজীববিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য গবেষক, কো-অর্ডিনেটর
মাইক্রোবায়োলজি প্রগ্রাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা