kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

কভিড-১৯: করোনাভাইরাসের সঙ্গে বসবাসে অভ্যস্ত হওয়াই জরুরি

হীরেন পণ্ডিত   

৫ জুন, ২০২০ ১৪:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কভিড-১৯: করোনাভাইরাসের সঙ্গে বসবাসে অভ্যস্ত হওয়াই জরুরি

কভিড-১৯ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আজ এক কঠিন বাস্তবতা। সারা বিশ্বে এই মহামারি দেখা দিয়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং আক্রান্ত হচ্ছে অগণিত মানুষ। কবে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে তা কেউ জানে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের এই মহামারি সহসা দূর হবে না। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে না। যত দিন না কোনো প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার হচ্ছে, তত দিন করোনাভাইরাসকে সঙ্গী করেই হয়তো আমাদের বাঁচতে হবে। জীবন-জীবিকার স্বার্থে চালু করতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, খুলতে হবে অফিস-আদালত। বিশ্বের প্রায় সব দেশই এর মধ্যে লকডাউন শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে একেবারেই নয়। 

প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের মহামারির কারণে সারা বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। অগণিত মানুষের প্রাণহানি ছাড়াও এই মহামারি মানুষের জীবন-জীবিকায় চরম আঘাত হেনেছে। সংক্রমণ যাতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য জরুরি কিছু সেবা ছাড়া বন্ধ করে দিতে হয়েছিল অফিস-আদালত, কল-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু। লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। হারিয়েছে তাদের জীবিকার সংস্থান। ফলে তারা অনেকে কষ্টের মাঝে জীবন-যাপন করছে।

বিশেষজ্ঞদেরও মতো আমাদেরও মনে হয় করোনাভাইরাস খুব শিগগির শেষ হচ্ছে না। আবার মনে হতে পারে, এই করোনাভাইরাস কখনোই যাবে না। হয়তো বা রূপ বদলাবে, প্রকৃতি বদলাবে, পরিস্থিতি বদলাবে, হয়তো একসময় দুর্বল হয়ে আসবে। কিন্তু মনে হয়, করোনা থাকবে আমাদের চারপাশেই। 

গত দুই মাস থেকে বাংলাদেশ অবরুদ্ধ। কয়েক দফায় ছুটি বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু কোথাও না কোথাও গিয়ে এর শেষ হবে। ছুটি শেষ করে সবকিছু শুরু করতে হবে। গার্মেন্টস, কল-কারখানা, শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো যেকোনো জনসমাগমই করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তবু মানুষকে জীবনের প্রয়োজনেই বাইরে যেতে হয়। এখন আমাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা যে ঘরের বাইরে যাচ্ছি, তা সত্যিই প্রয়োজনীয় কি না। আমরা যেন নিজেদের ঝুঁকির মুখে ফেলে না দিই। নিজের ভালোটা নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। বেঁচে থাকার চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই, সুস্থতার চেয়ে বড় কোনো উপলক্ষ নেই।

আগে বা পরে সরকারকে সবকিছু খুলে দিতেই হবে। তাই আমাদের সবাইকেই করোনার সঙ্গে অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশন করে বেঁচে থাকার উপায় বের করতে হবে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে। কিন্তু শুধু দৃঢ় মনোবল দিয়ে কাজ হবে না, শারীরিক ও মানসিক দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে। আসলে দৃঢ় মনোবল, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করাও জরুরি। তবে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। 

আমাদের করোনা-পূর্ব বিশ্বে ফিরে যেতে অনেক সময় লাগবে। করোনা-পরবর্তী বিশ্ব হবে আসলে এক নতুন বিশ্ব। মাস্ক ব্যবহার হবে আমাদের প্রতিদিনকার একটি বিষয়। আমাদের মাস্ক ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে। করোনাভাইরাস এসে মাস্ক ব্যবহার করতে আমাদের বাধ্য করছে। আমরা হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারের কথা বলি, করোনা-পূর্ব সময়ে মানুষের মুখের ওপর হাঁচি বা কাশি দিতেন তারা কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাটা সব সময় জরুরি।

করোনার পরে আপনার কর্মক্ষেত্রের পরিবেশও একটু হলেও পাল্টে যাবে। অফিসে প্রবেশ করা থেকে শুরু করে, সব ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অফিসে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়তো বদলে যাবে বসার ব্যবস্থা। সবকিছুতেই অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশন করতে হবে। তবে জমায়েত বা একসঙ্গে বসে গল্প করার সময় আরো সতর্ক থাকতে হবে। লোক-সমাগমের ঝুঁকিটা আরো অনেক দিন থাকতে পারে। বাইরে বের হলে আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি। কারো সঙ্গে কথা বলার সময় আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে দুজনের মুখেই মাস্ক লাগানো আছে। কারো সঙ্গে দেখা হলেই হাত মেলানো এবং বুকে জড়িয়ে ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে।

তবে শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে আর দৃঢ় মনোবল দিয়েই করোনাকে দূর করা যাবে না। করোনার বিরুদ্ধে সবার আগে দরকার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। খাদ্যাভ্যাসের মাঝেও পরিবর্তন আনতে হবে। একজন ধূমপায়ীর চেয়ে অধূমপায়ীর ঝুঁকি কম। আপনার ফুসফুস, লিভার, কিডনির সুরক্ষা আপনাকেই করতে হবে। শরীর হলো একজন মানুষের সব। আপনি যদি আপনার শরীরটাকে শক্ত রাখতে পারেন, তাহলে যত ভাইরাস আসুক না কেন সহজে আপনাকে কাবু করতে পারবে না। শারীরিক সক্ষমতার জন্য চাই পুষ্টিকর, সুষম ও নিয়মিত খাবার। পরিমিত খাবার, পরিমিত ঘুম এবং ব্যায়াম জরুরি। একটা রুটিন জীবনে আমাদের অভ্যস্ত হতে হবে। ফাস্ট ফুড, জাংকফুড, রেস্টুরেন্টের খাবার, রাস্তার পাশের খাবার খেয়ে আমরাও আমাদের শরীরকে ঝুঁকিতে না ফেলি। সুস্থ থাকার জন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভিটামিন ‘সি’ খাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। লেবু বা মৌসুমি ফলই কিন্তু আপনার প্রয়োজনীয় পুষ্টি আর ভিটামিনের চাহিদা মেটাতে পারবে। 

আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, শরীর সুস্থ থাকবে এমন খাবার খেতে হবে। তাহলে মোকাবেলা করতে পারবেন করোনাভাইরাস। আসলেই করোনাভাইরাস যেহেতু খুব সহজে যাচ্ছে না, তাই করোনার সঙ্গে অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশন করে নেওয়াই এখন জরুরি। 

লেখক: প্রাবন্ধিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা