kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ

প্রকৃতি নিজেই নিজের রক্ষাকবচ তৈরি করে

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

৫ জুন, ২০২০ ১২:২১ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



প্রকৃতি নিজেই নিজের রক্ষাকবচ তৈরি করে

‘প্রকৃতি নিজেই নিজের রক্ষাকবচ তৈরি করে প্রাকৃতিক নিয়মেই। তাইতো বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড় আর জোয়ার জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষার জন্য সাগর তীরের উপকূলে আপনা আপনিই গড়ে ওঠে ম্যানগ্রোভ বনভূমি। মানুষের যেমন চোখ আছে, তেমনি চোখের সুরক্ষার জন্য চোখের পাপড়ি এবং ভ্রু আছে, ঠিক তেমনি উপকূলের সুরক্ষায় রয়েছে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ম্যানগ্রোভ বনভূমি। বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে উপকূল রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বনভূমি নিয়ে এমনই মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই মতামত ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় প্রবীণ এলাকাবাসীও।

বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়প্রবণ উপকূলীয় জেলাসমূহের মধ্যে বরগুনার অবস্থান ঠিক মাঝখানে। যার কারণে বাংলাদেশ অভিমূখে যে ঘূর্ণিঝড়ই আসুক না কেন বেশিরভাগ সময়ই বরগুনা থাকে মূল নিশানায়। এতে একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের সাথে যুদ্ধ করেই টিকে থাকে এ জনপদের মানুষ। এ যুদ্ধে জনপদকে নিরাপদ রাখতে সহযোগিতা করে আসছে জেলার সদর উপজেলা, তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ অংশে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে হাজার হাজার একর ভূমিতে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বনভূমি।

সুন্দরবনের একটি বড় অংশ খুলনা অঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষা করলেও বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলাসহ দক্ষিণ-পূর্ব জেলা সমূহকে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে সুন্দরবনের চেয়ে স্থানীয় বনভূমিসমূহই বেশি সুরক্ষা দিয়ে থাকে। বরগুনার তালতলী উপজেলার টেংড়াগিড়ির বনভূমি, সদর উপজেলার কুমিড়মারা, গোড়াপদ্মা ও নিশানবাড়িয়ার বনভূমি এবং পাথরঘাটার হরিণঘাটার বনভূমি, লালদিয়ারচর ও নিজলাঠিমারার বনভূমি বরগুনা জেলাকে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড় থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে।

স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাগরতীরবর্তী এলাকার একাধিক এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসব বনভূমি না থাকলে যেকোন ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান দাঁড়াতো দ্বিগুনেরও বেশি। বরগুনার তালতলী উপজেলার প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা তালতলী উপজেলা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার মোসলেম আলী (৭২) বলেন, তালতলীর টেংড়াগিড়ি বনভূমি না থাকলে এতসব ঘূর্ণিঝড়ে তালতলীর অস্তিত্ব অনেক আগেই বিলীন হয়ে যেত। তিনি বলেন, প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার একর ভূমি নিয়ে তালতলীর টেংড়াগিড়ির বন, যা স্থানীয়ভাবে আশারচর এবং ফাতরার চর নামে পরিচিত।

বরগুনা সদর উপজেলার পরীরখাল এলাকার একজন এলাকাবাসী মাহমুদ আব্বাস (৪৫) বলেন, প্রতিবছরই বরগুনায় দুই-একটি বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় হয়। এসব ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস এবং উত্তাল বঙ্গোপসাগরের তীব্র জোয়ারের চাপ সবই ঠেকিয়ে দেয় কুমিড়মারা, গোড়াপদ্মা আর নিশানবাড়িয়ার বনভূমি। তিনি আরও বলেন, প্রতিবারই ঝড়ে এসব বনভূমির অনেক ক্ষতি হয় তবে তা আবার আপনাআপনিই ঠিক হয়ে যায়।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরগুনার সভাপতি ও বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, বরগুনায় গত অর্ধশতাব্দী ধরে যত ঘূর্ণিঝড় এসেছে তার অধিকাংশই অনেকটা দুর্বল করে দিয়েছে এসব বনভূমি। তাই আমাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্যই এসব বনভূমির প্রতি আমাদের আরও যত্নবান হওয়া উচিৎ। তিনি আরও বলেন, একইসাথে উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলোতে তাল এবং খেজুরসহ দেশীয় প্রজাতির দৃঢ়মূলের বিভিন্ন বৃক্ষ রোপন করা জরুরি।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রো ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ড. মোঃ আলমগীর কবির বলেন, ‘প্রকৃতি নিজেই নিজের রক্ষাকবচ তৈরি করে প্রাকৃতিক নিয়মেই। তাইতো সাগরতীরের উপকূলে আপনা আপনিই গড়ে ওঠে এসব ম্যানগ্রোভ বনভূমি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যেমন চোখ আছে, তেমনি চোখের সুরক্ষার জন্য চোখের পাপড়ি এবং ভ্রু আছে, ঠিক তেমনি উপকূলের জন্য রয়েছে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ম্যানগ্রোভ বনভূমি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা