kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ আষাঢ় ১৪২৭। ৩ জুলাই ২০২০। ১১ জিলকদ  ১৪৪১

বিশ্বায়নে করোনার প্রভাব এবং আমাদের উত্তরণ

মো. হাবিবুর রহমান   

৪ জুন, ২০২০ ০৯:২০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশ্বায়নে করোনার প্রভাব এবং আমাদের উত্তরণ

কোনো জাতির সভ্যতা কেবল তার অজ্ঞাতে হয়ে উঠার ব্যাপার নয়, সজ্ঞানে নিজেকে সৃষ্টি করারও ব্যাপার। মানবজাতিকে আজ নতুন সভ্যতা সৃষ্টির প্রয়োজনে জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ইত্যাদি বিষয় গভীরভাবে বুঝতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে বুঝতে হচ্ছে—শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উত্পাদন বাড়িয়ে খরচ কমানোর নীতি ব্যবহূত হয়, এতে দ্রব্যসামগ্রীর দাম কমে যায়। অন্যদিকে বর্ধিত জনসংখ্যার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চাহিদাও বাড়তে পারে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মানুষের মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। বিশ্বজুড়েই কোথায় এর শেষ, কেউ বলতে পারছে না। বিশ্বব্যাপী এই মহামারি নিয়ে শুরু হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯-এর ব্যাপ্তি বিশ্বায়নের সামগ্রিকতাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। কভিড-১৯-এর প্রতিষেধক উদ্ভাবিত না হওয়ায় এই মানবিক সংকট আরো জোরালো অবস্থানে পৌঁছেছে। আমরা সবাই সহযোগী অবস্থানে থেকে, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সহযোগিতাকে একে অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কাজ করে যাচ্ছি এবং নির্ভরশীলতার জায়গায় নতুনভাবে কাজের পরিধি দিন দিনই বেড়ে চলছে। কভিড-১৯-এর জন্ম চীনের উহান প্রদেশে হলেও যোগাযোগ ও আধুনিকতা এবং সামগ্রিকতার প্রভাবে দ্রুতই সর্বত্র ব্যাপকভাবে এর বিস্তার ঘটেছে। মানববাহী এ ভাইরাস মনুষ্যজীবের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়েই থাকছে সর্বত্র। কভিড-১৯ মোকাবেলায় সব সূচক এখন অর্থনৈতিক মন্দার দিকে, যা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সম্প্রসারিত হবে। এটা ১৯৩০ সালের বিশ্বমন্দাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সম্প্রতি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, বিশ্বে করোনার ক্ষতিকর প্রভাবে ২৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। বিশ্ব অর্থনীতির ৯.৭ শতাংশ ধস নামতে পারে, যেখানে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার অনুমান করা হয়েছে। মানুষের জীবন ও জীবিকা বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা শিগগিরই আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিচ্ছে না। করোনা মহামারির সঙ্গে সহনীয় হতে এবং জীবন-জীবিকা বাঁচানো ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে সরকারি পর্যায়ে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই মানবিক সংকট মোকাবেলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে সরকার। 

সামগ্রিকতার ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামো আজ প্রভাবিত। তাই নির্ভরশীলতার জায়গায় আমাদের সময় এসেছে ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি, শ্রমঘন শিল্পের বিকাশ ঘটানো ও সম্প্রসারণ করার। মহামারি মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হলো নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং করোনাসহিষ্ণু ইমিউনিটির দিকে যাওয়া। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় স্থানীয় পর্যায়ের জীবিকায়নের ক্ষেত্রগুলো আরো সচল ও সম্প্রসারিত করার সুযোগ তৈরি করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মহামারি মোকাবেলার দৃষ্টান্তগুলো পর্যালোচনা সাপেক্ষে কর্মপন্থা তৈরি এবং তাকে স্থানীয়করণ করা। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থেকে সাহায্য বা অনুদান প্রদান দীর্ঘ সময়ব্যাপী হয় না। যেকোনো ধরনের মহামারি কোনো সময়ই দীর্ঘ সময় অব্যাহত ছিল না এবং একসময় তা প্রাকৃতিক নিয়মেই বিদায় নিয়েছে। তাই সেই চেষ্টা প্রাকৃতিক নিয়মেই চলমান রয়েছে। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে লকডাউন ব্যবস্থা শিথিল হয়ে যাবে এবং একটা সময় করোনাসহিষ্ণু হয়ে উঠবে সবাই। স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতাও আমাদের রয়েছে, আবার অনেকে মানছে না জীবিকার প্রয়োজনে। অনেকে বেরিয়ে পড়ছে। এর ফলে হার্ড ইমিউনিটিও তৈরি হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেকোনো দুর্যোগ ও মহামারির প্রভাব পড়ে সব সময় সাধারণ মানুষের ওপর। এদের বেশির ভাগই এই শ্রমজীবী মানুষ, এরাই ভুক্তভোগী। শহরকেন্দ্রিক নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলোর বাঁচার করুণ আকুতি ফুটে ওঠে এদের অসহায় চাহনিতে ও চোখে-মুখে। সঞ্চয় নেই, তবু যা ছিল তা শেষ, লকডাউনে কর্মহীন মানুষগুলোর সীমিত সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে অতি দ্রুতই। খাদ্য, কাজ না থাকায় এই মানবিক সংকট আরো প্রকট হয়েছে। এসব মানুষের কাজের সুব্যবস্থা করে পথচলাকে সচল রাখতে হবে। তা না হলে সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যাহত হবে এবং বিপদ বাড়বে। এ জন্য সরকার কাজের পথ সুগম করতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ হাতে নিয়েছে—খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করেছে, পাশাপাশি অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বা ঋণ প্রদানের মাধ্যমে কাজকে আর ব্যবসাকে সচল রাখার চেষ্টা চলছে। এ জন্য সহজ শর্তে বা বিনা সুদে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে। তাই নারীদেরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে উন্নয়নকর্মী হিসেবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে হবে।

স্বল্পতম সময়ে বিশ্বব্যাপী দ্রুত করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য ইমিগ্রেশন, পর্যটন ও ভ্রমণব্যবস্থাকে দায়ী করা হচ্ছে। ফলে আমাদের বিচরণের পরিধি সীমিত হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতি সামলে উঠতে বেশ সময় লাগবে, এটি নিশ্চিত। উল্লেখযোগ্য রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। পাট, চামড়া, চা ও ঔষধশিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। সরকারের চলমান উন্নয়নমূলক মেগাপ্রকল্পগুলোকে করোনার প্রভাবমুক্ত রেখে এগিয়ে নিতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে মহামারি মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা ও সহযোগী মনোভাবের চিত্র ফুটে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে মানুষ বেশি, তাই রোগীর সংখ্যাও বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংকট মোকাবেলায় সময়মতো সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সুশাসন ও জনবান্ধব সেবা প্রদানের পরিচয় দিচ্ছে আমাদের ডাক্তার, নার্স—সবাই। সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো আজ জাতির দুর্দিনে মহামারি সেবা প্রদানে উদ্বেল। দেশের জনসংখ্যা ও রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করে পর্যাপ্ত চিকিত্সা সরঞ্জাম, টেকনিশিয়ান, নার্স ও ডাক্তারের ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নেই, এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসছি আমরা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মানায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। কাম্য ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা সম্পদের আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে সচল রাখছে কর্মোদ্যমী এই স্বাস্থ্যকর্মীরা।

করোনাকালে আমাদের সমাজে মানবিক সংকটের কিছু চিত্র স্পষ্টতই দৃশ্যমান হয়েছে। একদিকে যেমন ত্রাণ বিতরণে ব্যত্যয়গুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা করা হয়েছে। করোনা আক্রান্তদের প্রতি নানা সামাজিক নিগ্রহ, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং আমাদের মানবিক স্খলনের ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে ফেলে যাওয়া বা করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীকে রেখে নিকটজনের অবহেলার শিকার হয়েছে অনেক করোনা রোগী। স্বজনদের পলায়নের ঘটনা আমাদের হূদয় স্পর্শ করেছে। সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয়িত আমাদের মননকে অনেকখানি তাড়িত করে। অন্যদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই এ মাহাবির্পযয়ে এগিয়ে এসেছে, যা আমাদের প্রত্যাশাকে আরো স্বতঃস্ফূর্ত করেছে। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা, দায়িত্ববোধ থেকে ব্যক্তি, রাষ্ট্রের এই কঠিন সংকটে পাশে থাকার প্রবণতা ব্যাপকতর হচ্ছে।
কৃষিপণ্যের সরবরাহ সব সময় সচল ছিল। মহামারি মোকাবেলায় দেশে খাদ্যঘাটতির আশঙ্কা ছিল। কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ায় সেটি আমরা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। দেশের মোট খাদ্যচাহিদার সঙ্গে উত্পাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সুসমন্বয় ছিল। যথাসময়ে তথ্য ও পরিসংখ্যান থাকায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। মধ্য আয়ের দেশে আমাদের অর্জিত গ্র্যাজুয়েশনের ধারা অব্যাহত রাখতে প্রযুক্তিনির্ভর অধিকতর উত্পাদনশীল ও লাভজনক কৃষিতে মনোনিবেশ ছিল। আর করোনার বিরুদ্ধে শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিগুণ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ দেশীয় ফলের উত্পাদন ও সরবরাহব্যবস্থা ছিল।

ডিজিটাল ও তথ্যসেবা আমাদের বিগত এক দশকের অর্জিত সাফল্য, আজ এর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে। তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে অফিস কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে করোনাকালেও। আমাদের সময়কে ও মহামারিকে আমরা জয় করেছি। ইন্টারনেট আর ই-মেইল, ফেসবুক সচলতা এবং ই-কমার্স জবাবদিহির আওতায় এসেছে। ভোক্তা অধিকার অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে।

করোনার বিশ্বায়নের ফলে শাসক-শাসিত এক হয়ে সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনার টিকা আবিষ্কার হলে পেন্টেট উন্মুক্ত করতে সবাই রাজি হচ্ছে। দ্রুতই সবাই সফল হবে—সেই প্রত্যাশাই আমাদের। আমাদেরও এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বেড়েছে, পাশাপাশি নিজস্ব অবস্থান থেকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আত্মকর্মসংস্থান ও মানবিক মূল্যবোধ খাতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে—এই প্রত্যাশা করি।

লেখক : উপসচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা