kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

অপরিকল্পিত নগরীতে করোনার মরণ থাবা, সুস্থ থাকাই চ্যালেঞ্জ

মোঃ শাহ জালাল মিশুক   

৩ জুন, ২০২০ ২০:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অপরিকল্পিত নগরীতে করোনার মরণ থাবা, সুস্থ থাকাই চ্যালেঞ্জ

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত বিশ্ব। বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৬৩ লাখ ছাড়ালো। এ মহামারিতে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে পরীক্ষা কম হওয়ায় এবং অনেক দেশই হাসপাতালের বাইরের মৃত্যু হিসাবে অন্তর্ভুক্ত না করায় প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও করোনার ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পায়নি। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা ভাইরাসের  রোগী শনাক্ত হলেও প্রথম মৃত্যুর খবর আসে ১৮ মার্চ। আজ ৩ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫,১৪০ জন। আর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৬ জন। বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে প্রথম থেকেই ঢাকা শহর ছিল শীর্ষে।

করোনাভাইরাস যেহেতু বিদেশ থেকে দেশে প্রবেশ করা মানুষের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাই ঢাকাতে ভাইরাসের প্রকোপ অনেক বেশি। পাশাপাশি ঢাকার মত জনবহুল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত নগরীতে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যানুযায়ী, 'গত ২ রা জুন পর্যন্ত রাজধানীর মোট ২১৬ টি এলাকায় করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি এলাকায় শনাক্ত হয়েছে দুই শতাধিক। একশ'র বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২টি এলাকায়।'

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা শহরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর মিছিল এমনভাবে বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে অপরিকল্পিত ও দূষণের ঢাকা নগরী নিজেই যেনো একটি করোনা বোমা। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের তথ্য মোতাবেক এই শহরের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস করে। যেখানে করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শহর নিউইয়র্কে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১১ হাজার জন। ঢাকায় ক্রমবর্ধমান নগরমুখীতা এবং দ্রুত নগরায়নের সাথে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠছে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা নগরীতে বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে ওঠা অবকাঠামোর ৭৩ শতাংশই পুরোপুরি অপরিকল্পিত।
 
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে, 'বাসযোগ্য ও আদর্শ কোনো শহরে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা জরুরি। কিন্তু রাজধানীতে মাত্র ৪.৩৮ শতাংশ জলাভূমি এবং ৯.২০ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদন রয়েছে। ১৯৯৯ সালে ঢাকায় ১৪.০৭ শতাংশ খোলা জায়গা ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে খোলা জায়গার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৬১ শতাংশে।' 

এভাবেই দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে জনসংখ্যার আধিক্য ও যত্রতত্র কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দালানকোঠা গড়ে ওঠার পাশাপাশি রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব, মানসিক ও স্নায়ুবিক চাপ বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সঙ্কট, পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা, পরিবেশ ও বায়ুদূষণ ইত্যাদি অব্যাহতভাবে বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবার ওপর। এমন অভিযোগ তুলেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নগরীতে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের বিস্তার বহুগুণে বেড়ে গেছে। এমনকি সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান মনে করেন, 'স্বাস্থ্যসেবার উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে অপরিকল্পিত নগরায়ন।' 

পাশাপাশি আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর মনে করেন, ঘনবসতির কারণে রাজধানীতে করোনা রোগী বেশি। তিনি বলেন, 'ঢাকার মতো জনবহুল, ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিত নগরে খুব সহজেই মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। সেসঙ্গে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সুবিধা দেশের অন্য অন্য জায়গার তুলনায় ঢাকায় বেশি, সেটিও একটি কারণ। এছাড়াও ঢাকার হাসপাতালগুলোর মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে।' অর্থাৎ করোনাভাইরাস ক্রমেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পরা এবং কার্যকরী নগর স্বাস্থ্য ব্যহত করার জন্য অনেকাংশেই  অপরিকল্পিত নগরায়নই দায়ী।

অন্যদিকে করোনাভাইরাস ব্যাপক বিস্তারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন বড় ধরণের বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলে বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে দিচ্ছে। এই প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করবে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশগুলোতে। 

গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, 'করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮% নেমে দুই কিংবা তিন শতাংশ হতে পারে।' তাই করোনা সংক্রমণের মধ্যেই ধীরে ধীরে লকডাউন উঠে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশও হয়তো অচিরেই সে পথে যাবে। করোনা সাথে আমাদের লড়াই করে বাঁচতে হলে সুস্থ থেকে, সুরক্ষিত রেখে প্রতিরোধের কোন বিকল্প নেই। 

ইতিমধ্যেই আমরা শিখেছি হাঁচি, কাশি, সংস্পর্শ, ব্যবহার্য রুমাল, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি সামগ্রীর মাধ্যমে ছড়ায়। সুতরাং সবাইকে ইতিমধ্যেই সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সচেতন ভাবে এর চর্চা করতে হবে যাতে এগুলো থেকে ভাইরাসটি না ছড়াতে পারে। রোগী এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখতে হবে এবং তার সেবার ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করে রোগ ছড়ানোর সম্ভাব্য পথ বন্ধ করতে হবে। 

পাশাপাশি যে সকল খাবার (যেমন: ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার) আমাদের শরীরে এন্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহের মাধ্যমে শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে দেয় তা করোনা প্রতিরোধে গ্রহণ করতে হবে। এভাবেই করোনার মরণ থাবা থেকে বাঁচতে নগরবাসীদের যেকোনো মূল্যে সুস্থ থাকতে হবে, সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুরক্ষিত রাখতে হবে অন্তত যতদিন পর্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক আবিস্কৃত না হয়। পাশাপাশি জনবহুল এ নগরীর নাগরিকদের উন্নত নগর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে অবশ্যই উন্নত নগর পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

*** মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা