kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

করোনা সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত গবেষণা

ড. মোহাম্মদ এয়াকুব   

৩ জুন, ২০২০ ০৮:২১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনা সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত গবেষণা

শুরুতে অনেক দিন আগের একটি গল্প বলি। কোনো এক লোকের শরীরে ফোড়া হয়। তিনি  বেশ কিছুদিন কষ্ট পাওয়ার পর একদিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তারকে বলেন, ‘ডাক্তার সাহেব আমার এই ফোড়াটির কারণে শরীরে খুব ব্যথা পাচ্ছি। দয়া করে ফোড়াটি কেটে ফেলে দিন।’ তখন ডাক্তার বললেন, ‘ঠিক আছে, দেখি আপনার জন্য কী করতে পারি, রক্তের কিছু পরীক্ষা দিচ্ছি, প্যাথলজি থেকে পরীক্ষাগুলো করিয়ে আনুন।’ তখন রোগী বললেন, ‘সামান্য একটি ফোড়ার জন্য পরীক্ষা কেন প্রয়োজন হবে? পরীক্ষা ছাড়াই করে দিন, এত ঝামেলায় যেতে পারব না।’ ডাক্তার বললেন, ‘পরীক্ষা না করে আমার পক্ষে  কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়।’ তখন রোগী রাগ করে ডাক্তারখানা থেকে  বের হয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন, পথিমধ্যে নাপিতের সঙ্গে দেখা। নাপিত জিজ্ঞেস করল, ‘মশায়, কেমন আছেন?’ তখন  রোগী নাপিতের কাছে সব কিছু খুলে বললেন। নাপিত বলল, ‘এটা কোনো বিষয় হলো? বসেন, আমি ক্ষুর দিয়ে  ফোড়াটি কেটে ফেলে দিচ্ছি।’ নাপিত দ্রুততার সঙ্গে কাজটি সমাধা করে দিল। এটি গল্প হলেও এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কোনো বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকলে এবং সমস্যার গভীরে যেতে না চাইলে অবস্থা কী হতে পারে। শুধু রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যাগুলোর সমাধানে আমাদের দেশে মৌলিক গবেষণার চর্চা নেই বললে চলে। দু-চার কথা বলে সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয়। সর্বক্ষেত্রে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু সমস্যা আছে যার গভীরে যাওয়া প্রয়োজন। সমস্যা যদি যথাযথভাবে চিহ্নিত করা না যায় তার সমাধান টেকসই হয় না।

সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাস-কভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য, জীবন ও জীবিকায় যে আঘাত এনেছে তার প্রভাব মানুষকে অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে। খুব দ্রুত যে সমাধান হয়ে যাবে তা নয়। সব কিছু আবার নতুন করে সাজাতে হবে। কিন্তু কাজটি খুব সহজও নয়। পরিকল্পনা ও নীতি গ্রহণে অনেক তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন হবে। গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যা খুঁজে বের করতে হবে। অন্যান্য দেশে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা জানতে হবে। তবে বাংলাদেশে ব্যবস্থা নিতে গেলে আলাদাভাবে গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে। কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কভিড-১৯-এর প্রকোপ সব দেশে সমান নয়। এশিয়ার মধ্যে চীনে, যে দেশে প্রথম কভিড-১৯ শনাক্ত হয়, সেখানে ২৮  মে, ২০২০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা হচ্ছে ৮২ হাজার ৯৯৫, অথচ দক্ষিণ এশিয়ার ভারতে এক লাখ ৫৮ হাজার ৪১৫, তবে বাংলাদেশে ৩৮ হাজার ২৯২, ভুটানে মাত্র ২৮ জন। সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা চীনের চেয়ে ১৬ লাখেরও বেশি (১৭,৪৫,৮০৩)। অন্যদিকে ইউরোপের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে স্পেনে দুই লাখ ৮৩ হাজার ৮৪৯ (সূত্র : জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয় ও ওয়ার্ল্ডোমিটারস)। এর অর্থ হচ্ছে দেশভেদে সংক্রমণের হারে পার্থক্য রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ পার্থক্য কেন? উত্তর অনেক কিছুই হতে পারে। কী কারণে এ তারতম্য তা মুখে মুখে বলা সম্ভব নয়। গবেষণার মাধ্যমে এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে হয়তো বলবেন, ‘বাংলাদেশে সংক্রমণ পরীক্ষা কম হয়েছে বলে শনাক্ত  রোগীর সংখ্যাও কম।’ চীনে তো পরীক্ষা কম হয়নি, সেখানে কেন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অনেক দেশ থেকে  রোগীর সংখ্যা কম। তাই দেশ থেকে দেশে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তবে বাংলাদেশে পরীক্ষা যদি বৃদ্ধি পায় তবে রোগীর সংখ্যা  বেড়েও যেতে পারে। এ সময়ে কোনো কিছু অনুমান করা সহজ নয়। আবার উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ আছে যারা টিকা ও ওষুধ আবিষ্কারের জন্য কাজ করছে তারা যখন সফলতা পাবে তখন তা যে সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যাবে এমন নয়। বাংলাদেশে এর প্রয়োগ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে। তাহলে দেখা যায়, হালকাভাবে  কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত নয়। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা।

অন্যদিকে এ দেশের মানুষের জীবিকা নিয়ে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে ভাবতে হবে এই বিশাল জনসমষ্টিকে নিয়ে করোনোত্তর সময়ে কী করা হবে? দীর্ঘ সময় আয়ের সংস্থানমূলক কাজ থেকে দূরে থাকায় দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশের কতজন লোক চাকরি হারিয়েছেন তা আমরা জানি না। আবার কতজন মানুষ ব্যবসা ও উত্পাদন নতুন করে শুরু করতে পারবেন তা-ও আমাদের জানা নেই। একইভাবে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসায় কী ক্ষতি হয়েছে তা আমরা স্পষ্টভাবে জানি না। এ ধরনের অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তরে কিছু তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে, যা মূলত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া। এর পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে মুখ্য তা হচ্ছে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা, যা জনগণ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলেই অর্জন করতে হবে। রাতারাতি কোনো গবেষণা করা যায় না। এর জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। তাই প্রয়োজনীয় গবেষণা এখনই শুরু করে দেওয়া উচিত।

কাজ শুরু করতে গেলে প্রয়োজন উপযুক্ত লোকবল ও অর্থের সংস্থান। কিন্তু বাংলাদেশে গবেষণার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও অবকাঠামোগত যে ব্যবস্থা রয়েছে তা এ সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। গবেষণার প্রয়োজনীয়তা নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে যদি উপলব্ধি করা না হয়, তখন গবেষণার চর্চা গড়ে না ওঠাই স্বাভাবিক। পেছনের দিকে তাকানোর সময় নেই। এখন প্রয়োজন গবেষণার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ দেওয়া এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োজিত বা উত্সাহিত করা।

সরকারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত কাজ হবে যেসব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবিশেষ আগে থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা করে আসছে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো। তবে অগ্রাধিকার দিতে হবে যাদের গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত দেশ-বিদেশে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে গবেষণার বিষয়, গবেষকের যোগ্যতার ধরন এবং কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে তা প্রাক্কলন করা উচিত। সব গবেষণা সরকারিভাবে করতে হবে এমন নয়। তবে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা দিতে হবে। তখন হয়তো দেখা যাবে সরকারের পাশাপাশি অনেক  বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেরাও অর্থের সংস্থান করে গবেষণাকর্মে নিয়োজিত হবে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া ও কাজের সমন্বয় সাধন করা, যাতে সহজে অগ্রগতি লাভ করা যায়।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন পরামর্শক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা