kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

কভিড-১৯ ও খাদ্য নিরাপত্তা

কৃষি প্রক্রিয়াকরণে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত

ড. শাহীন আকতার   

৩১ মে, ২০২০ ২১:৩৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কৃষি প্রক্রিয়াকরণে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত

কভিড-১৯ ইতিহাসে এক গণহত্যাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে পুরো পৃথিবী থমকে দাঁড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ঘাতক ভাইরাস খাদ্য নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলবে। খাদ্যের প্রাথমিক উৎস হচ্ছে কৃষি। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় এবং চাহিদার ঘাটতির কারণে সেই কৃষি পণ্য পঁচে যাচ্ছে। পচা সবজি, ফল-মূল ও শস্যের মধ্যে কৃষকের মর্মাহত চিত্র দৈনিক পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং টেলিভিশনের পর্দায় এখন ছয়লাব। লকডাউন ও পরিবহন বন্ধ থাকায় মূল্য বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কৃষকরা নজিরবিহীন ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাদের কষ্টের ফসল পচে যাওয়ায় তারা সেগুলো ফেলে দিচ্ছে। এটি খাদ্য সুরায় তাৎণিক এবং দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলবে।

ব্র্যাকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ২৩.৮ মিলিয়ন লোক অনাহারে ভুগছে, যেখানে কৃষিক্ষেত্র (ফসল, প্রাণী চাষ, বন ও মাছ ধরা), অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪০ শতাংশেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে (আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে এ জনবল প্রায় ৮০ শতাংশ)। কৃষি কেবল খাদ্য সুরক্ষাই দেয় না এটা বিশাল জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অবলম্বনও। কৃষকরা প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন মানুষের খাদ্য জোগান দিতে খুব চমৎকারভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মৌসুমি পণ্যের দাম ওঠানামা তাদের শক্তিশালী করে।
কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, কৃষকরা তাদের ফসলের দাম খুবই কম পান, বিশেষ  করে যারা ক্ষুদ্র কৃষক তারা ফসলের দাম পান না বললেই চলে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষি ক্ষেত্রের দুর্বলতা সবারই জানা।

যাই হোক, মৌসুমী দাম হ্রাস এবং প্রাসঙ্গিক কৃষি পণ্যের দাম হ্রাসসহ করোনার ক্ষতি অন্যান্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তারপরেও কৃষকরা কাজ করে যাচ্ছেন। তারা ফসল ফলানো এবং তা বাজারজাত করতে গিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। করোনা মহামারির প্রভাব সম্পূর্ণ না পড়লেও বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোতে যেখানে মৃতের সংখ্যা কম হলেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার সুবিধাবলীও অপর্যাপ্ত এবং নীতিমালাও একটা কাঠামোতে আবদ্ধ।

বাংলাদেশে লকডাউন শুরু হয় গত ২৬ মার্চ থেকে, যখন কৃষকরা শীতকালীন সবজি চাষাবাদ করছিলেন এবং বোরো ধানের বাম্পার ফলনের আশা করছিলেন (৫৪ শতাংশ চাল উৎপাদন হয় এই শীতকালীন বোরো থেকে) যে ফসল এপ্রিল-মে মাসে তোলা হয়। এর মধ্যেই কৃষিজাত পণ্য যেমন সবজির বাজার, বোরো চাষ এবং বাজারজাতকরণে প্রান্তিক, ছোট ও মধ্যম সারির কৃষকরা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। অর্থনীতির এ সাব সেক্টরগুলো খাদ্য সুরায় বিশাল প্রভাব ফেলবে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষভাবে প্রান্তিক পর্যায়ের ছোট কৃষকরা (তুলনামূলকভাবে যারা প্রায় ১৬.৬ মিলিয়ন কৃষকের ৮৫ শতাংশ) এবং কৃষিভিত্তিক ছোট ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে।

যদিও খাদ্য এমন একটি প্রয়োজনীয় আইটেম, যেখানে লকডাউন থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে তা সরবরাহে কাজ করা যায়। কিন্তু স্বাস্থ্য বিধি-নিষেধ কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে মধ্যস্তাতাকে বাধাগ্রস্ত করে। তারপরও করোনার ভয় এবং লকডাউনের মুখে শাক সবজি এবং পচনশীল কৃষিপণ্যের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বিক্রয়কেন্দ্রগুলো সঙ্কুচিত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। লকডাউনের সময় শহরের সঙ্গে সংযুক্ত স্থানগুলোতে, হোটেলের কাছাকাছি স্থানে, রেস্তোরা এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাদ্যের জায়গাগুলোতে হতাশাজনকভাবে বেচাকেনা কমে যায়।

দিনমজুরদের আয় রোজগার না থাকায় তারা শহর ছেড়ে চলে যায়। যদিও নির্দিষ্টভাবে কোনো পরিসংখ্যান বলা যাবে না তারপরেও মোটামুটি বলা যায় যে এ সময়ে অন্তত ১৫ মিলিয়ন লোক গ্রামে চলে গেছে। বেকারত্বের কারণে গ্রামেও চাহিদা হ্রাস পেয়েছে এবং র‌্যামিটেন্সও কমেছে। এভাবে কৃষকের সরবরাহ বেড়েছে এবং দামের দিকে না তাকিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার মতো সৌভাগ্য সবার হয় না। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন পরবর্তী মৌসুমের দিকে ধাবিত হবে কারণ কৃষকরা এই কঠিন পরিস্থিতিতে  শস্য উৎপাদনে বিনোয়োগ করতে সক্ষম নয়।
 
এদিকে হাওর এলাকায় এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে এ মৌসুমের বোরো ধান ঘরে তোলা শুরু হয়েছে। মে মাসে বোরো ধান বাজারজাতও শুরু হয়েছে। চলাচলে বাধা নিষেধ এবং শ্রমিক সংকটের কারণে হাওরের কৃষকরা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

আবহাওয়া ভালো থাকায় এ বছর রেকর্ড বাম্পার ফলন (২০ মিলিয়নের বেশি মেট্রিক টন) ফসলের আশা করা হয়েছে। কৃষকরা বড় ঝুঁকির মুখে পড়ে বোরো আবাদের পর চাষাবাদ এবং ফসল বাজারজাতকরণে। করোনাভাইরাস সংকটে টিকে থাকার জন্য চাল, শাক সবজি এবং প্রাণী সম্পদগুলো রায় প্রয়োজনীয় পদপে নেওয়া জরুরি। সৌভাগ্যক্রমে অনেক সরকারি সক্রিয় ব্যক্তি হাওর এলাকায় বোরো ধান ঘরে তুলতে সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন। বেসরকারি খাতও সরকার এবং জনগণকে সহযোগিতা করেছে। চ্যালেঞ্জও অনেক। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে রাখতে সৃজনশীল পদপে নিতে হবে।

কিছু নির্দিষ্ট পদপে এমন হতে পারে : বোরো ধান সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন জেলায় কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ যানবাহন এবং শ্রমিকের ব্যবস্থা করে দিতে পারে। কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে ২ বিলিয়ন টাকা দেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকের কাছ থেকে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে ফসল কেনা যায়। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে উৎসাহিত করেছেন যেন এক টুকরো জমিও অনাবাদি না থাকে। বোরো ধান আবাদের পর যেনো সব জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হয় সে ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রীকে যথাযথ পদপে নেওয়ার জন্যও তাগিদ দিয়েছেন।

গত ২৬ এপ্রিল থেকে সরকারিভাবে ১.১৫ মিলিয়ন চাল এবং ০.৬ মিলিয়ন ধান সংগ্রহের অভিযান শুরু হয়েছে। এ ছাড়া জন প্রশাসন কিছু স্থানে কৃষকের কাছ থেকে পন্য কিনেছেন (কৃষক যথাযথ দাম না পাওয়ার ব্যপারে অভিযোগ রয়েছে) এবং সেগুলো দুস্থ পরিবারগুলোতে বিতরণ করে দিয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে শাক সবজি, দুধ ও ডিম অর্ন্তভুক্ত নয়।

সরকারি উদ্দীপনা প্যাকেজগুলো হলো : কৃষির জন্য ৫০ বিলিয়ন টাকার পুনঃতফসীল প্রকল্প যা থেকে কৃষকরা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। তবে শস্য এবং শাকসবজি উৎপাদকরা তা থেকে বাদ পড়েছে। ৩০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্বিবেচনার প্রকল্পগুলো এবং এমআইএফগুলো নিম্ন আয়ের লোকদের ঋণ সরবরাহ করবে কিন্তু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা তা থেকে তেমন উপকৃত হবে না। এতকিছু সত্বেও কৃষি কাজ ও এ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আরো যা করা উচিত : স্বল্প মেয়াদে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে আরো অনেক কিছু করা দরকার। ব্র্যাকের তাৎক্ষণিক জরিপে দেখা গেছে, ২৩.৮ মিলিয়ন লোক এ সংকটে অনাহারে রয়েছে। কৃষকদের পন্যগুলো বিক্রি করার সক্ষমতা দেওয়া উচিত যাতে তারা ক্ষুধায় না ভোগে। কৃষিক্ষেত্র এবং কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য কৃষক এবং ভোক্তার সঙ্গে কয়েকটি সম্ভাব্য পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।

তাৎক্ষণিক কাজগুলো অন্তর্ভূক্ত করা উচিত : যেসব জনগণের ত্রাণ প্রয়োজন তাদেরকে সরকারের সহযোগিতা করা। সব সরকারি বিভাগ প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগণ, শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অংশীদার হয়ে খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। সরকারিভাবে ধান চাল যথাযথভাবে সংগ্রহ করা উচিত যাতে গুদামে সংগ্রহ করা পন্যের হ্রাস সর্বনিম্ন হয়। বোরো ধান চাল সংগ্রহে অভিযান অব্যাহত রাখা উচিত। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের বলে যে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ফসল কেনার উদ্যোগ তেমন সফল ছিল না। কৃষকরা কেবল উপকৃত হয় উচ্চমূল্য থেকে কিন্তু মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হয় যে তাদের উৎপাদন খরচও ওঠে না।

সুতরাং কৃষকের লাভের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যদি বেশিরভাগ লক্ষ্যমাত্রা সংগ্রহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে (মিলার) করা হয় তাহলে তা ওপেন মার্কেটে বিক্রয়ের (ওএমএস) মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে আরো বেশি বিক্রয় এবং দরিদ্রদের জন্য ত্রাণ কর্মসূচিসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণে তা সহায়তা করবে। কৃষক যদি সরাসরি সুবিধা না পায় তাহলে খাদ্য সুরক্ষার সকল উদ্যোগ অন্ধকারেই থেকে যাবে। ভালো সংবাদ হলো সরকার প্রান্তিক লেভেলের কৃষকের কাছ থেকে ধান চাল সংগ্রহের জন্য ’কৃষকের অ্যাপ’ তৈরি করেছে। যেখানে বাছাই করা কৃষকরা তাদের ধান চাল সরাসরি কেন্দ্রে বিক্রি করতে পারে।

যদিও কৃষির অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এ কৃষিসংশ্লিষ্ট খাত খুব দুর্বল। প্রায় ৪০ শতাংশ দুগ্ধ খামারি নারী কিন্তু  খুব কম জমির উদ্যোক্তা এই নারী। ডিম, দুধ এবং শাক সবজিসহ ছোট ছোট ব্যবসায়গুলো পরিচালনা করার জন্য তাদের কাছে তথ্য এবং পরিষেবার অভাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন সেবা তাদের পন্য উৎপাদন ও বেচা কেনায় সাহায্য করতে পারে। দেশে সীমাবদ্ধ ডিজিটাল পরিষেবা এবং ই- বাণিজ্য উদ্যোগগুলো সহজলভ্য। এই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন আউটলেটের সংযুক্তি গ্রামীণ বাজারগুলোকে প্রসারিত করতে পারে। পচনশীল পন্যেও ক্ষতি কমানোর জন্য কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রমগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং তা আরো বাড়াতে মনোযোগী হওয়া দরকার।

লেখক- কনসালটেন্ট ও গবেষণা সহযোগী অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইংল্যান্ড

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা