kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

গণমাধ্যম পুলিশের অপরিহার্য বন্ধু

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ মে, ২০২০ ২৩:৩৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গণমাধ্যম পুলিশের অপরিহার্য বন্ধু

কয়েকদিন ধরে লিখতে গেলেই কিবোর্ডে হাতের আঙ্গুল থমকে যাচ্ছে। লেখালেখিকে কখন ভালোবেসেছি টের পাইনি, তবে হাড়ে হাড়ে টের পাই কিছু বিষয়ের মুখোমুখি হলে ক্ষুদ্র লেখকসত্তা অসহায়ভাবে থমকে দাঁড়ায়। কিছু গল্প কাব্যের চেয়েও মোহনীয়-মহাকাব্যিক। কিছু উপাখ্যান প্রিয় মানুষের বিদায়ের মতোই বেদনাবিধুর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদ্য বিদায়ী উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান স্যারের কথাই বলা যাক। কিছু মানুষের নীরব কর্মযজ্ঞ তার প্রতিষ্ঠানকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায় কিন্তু কর্তাব্যক্তিরা পর্দার আড়ালেই থেকে যান চিরকাল। কিছু মানুষের কর্ম প্রতিষ্ঠানের সাথে সাথে ব্যক্তি সত্তাকেও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগ এমন একটি মেলবন্ধন যেখানে প্রতিনিয়ত পুলিশের হয়ে গণমাধ্যমের সাথে সংযোগ স্থাপন করে চলতে হয়। তথ্য আদান-প্রদান ও  আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজ প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সর্বদা শশব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে এখানকার কর্মকর্তাগণ চাইলেও সবসময় পর্দার অন্তরালে থাকতে পারেন না। কাজের ধরনে তারা একাধারে সাংবাদিক ও পুলিশ! কাজ করতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের সমান্তরালে তাই তৈরি হয় নিজস্বতাও। 

প্রতিষ্ঠান আর ব্যক্তি ইমেজ একই তলের ওপর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরকে আলোকিত করে বর্ণচ্ছটা বিকিরণ করে দিক্বিদিক। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদ্য বিদায়ী উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান এমনই আলোকিত একজন কর্মকর্তা যিনি তার সততা, কর্মদক্ষতা, আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে পুলিশের সাথে গণমাধ্যমের সম্পর্ককে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। এতে পুলিশ, গণমাধ্যম ও জনগণ-তিনপক্ষই সমানভাবে উপকৃত হয়েছে। 

নিজের ব্যাচমেট ও জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তারা যখন পুলিশ সুপার হিসেবে কয়েকটি জেলায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন দক্ষতার সাথে, তখনো মাসুদুর রহমান স্যার সরবে-নীরবে কাজ করে গেছেন ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস ডিভিশনে। বললে অত্যুক্তি হবে না যে তার হাত ধরে যাত্রা শুরু করে তার হাতেই পরিপূর্ণতা পেয়েছে ডিএমপির এই বিভাগটি। তিনিই এই ডিভিশনের প্রথম ডিসি। মিডিয়ায় পুলিশকে প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে তিনি পুলিশের যে অপরিমেয় সেবা করে গেছেন, সেটা রীতিমত শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

কানাডার বিখ্যাত যোগাযোগবিদ মার্শাল ম্যাকলুহান একটি বাক্যের জন্য বিখ্যাত। তিনি বলেছিলেন, মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ। সেটা ব্যক্তি জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। টেলিভিশনের  কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই মাসুদুর রহমান স্যারকে চিনতাম। আমার মতো আপনারাও অনেকে তাকে টেলিভিশনে ব্রিফিং করতে দেখেছেন। মিডিয়া এভাবে প্রতিনিয়ত অচেনা অজানা মানুষদের সাথে আমাদের যোগসূত্র স্থাপন করে চলেছে। এরপর লেখাপড়া শেষ করে, বিসিএস পরীক্ষা পাশ করে, সরদায় ট্রেনিং শেষে দুটো জেলায় চাকরি করে অবশেষে ডিএমপিতে যোগ দিয়ে বছর খানেক হতে চললো আমার। এখনো তিনি সেই মিডিয়ার হাল ধরে রেখেছেন ২০তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচের এই মেধাবী ও মানবিক কর্মকর্তা। ছাত্রজীবনে টিভিতে দেখা সেই সৌম্য, শান্ত, ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষটির সান্নিধ্য পাওয়া, তার বিরল অভিজ্ঞতা ভাণ্ডারের অংশ লাভ করা ও তারই সাথে একই বিভাগে চাকরি করার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য যুগপৎ রোমাঞ্চকর ও আবেগীয়। 

দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময়ে বুড়িগঙ্গার অগণিত ঢেউ শত সহস্র ইতিহাস রচনা করে নীরবে বয়ে চলেছে সাগরের দোটানায়। পুলিশেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। ডিএমপিতে চারজন কমিশনার এসেছেন। ডিভিশন-জোন ও থানার সংখ্যা বেড়েছে। অফিসার, ফোর্সের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক, অদলবদল হয়েছে কর্মকর্তাবৃন্দের দপ্তর, কত শত সংবাদকর্মী এলেন, গেলেন, তার চোখের সামনে কত মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হলো, শুধু কালের স্বাক্ষী হয়ে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো বিনেসুতোয় পুলিশকে বেঁধে চলেছেন মিডিয়ার মাধ্যমে জনতার হৃদয়ে হৃদয়ে। শ্রদ্ধেয় মাসুদুর রহমান স্যার তার কর্মজীবনের সেরা সময়টা পুলিশ ও গণমাধ্যমের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। সাদা চোখে মিডিয়ার কাজের ধরনকে অতি সরল মনে হলেও প্রতিনিয়ত কত শত জুতা সেলাই করতে হয়, কত শত চণ্ডিপাঠ করতে হয় এখানে কাজ না করলে বোঝানো মুশকিল। একটা শব্দ বা একটা বাক্যের অসতর্ক ব্যবহার যেকোনো মুহূর্তে সর্বনাশ করে দিতে পারে ব্যক্তি ও পুলিশের ইমেজের। এক যুগের বেশি সময় ধরে এমন নিরবিচ্ছিন্ন  সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে পুলিশের সেবায় আত্মনিয়োগ করায় বাংলাদেশ পুলিশের এই মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে ধন্যবাদ জানালেও তার অবদানের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। 

রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ বলে পরিচিত গণমাধ্যমের রসায়ন জটিল ও বহুমুখী। গণমাধ্যমের ক্ষমতা ও প্রভাব এত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী যে একটা নেতিবাচক সংবাদ পুরো বাহিনীর অর্জনকে মুহূর্তেই ধুলিস্মাত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে গণমাধ্যমের সংখ্যাও বেড়েছে কয়েকগুণ। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে অভিযোজিত করে নিজ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অক্ষুণ্ণ রেখে মিডিয়াকে সহযোগিতা করা বিরাট চ্যালেঞ্জের।

সদ্যবিদায়ী ডিসি মিডিয়া স্যার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করে পুলিশের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করার পেছনে অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছেন। যথাযথ প্রটোকল মেনে ও গেট কিপিং করে তথ্য, সংবাদ ও অন্যান্য কনটেন্ট সরবরাহ করার মাধ্যমে গণমাধ্যম কর্মীদেরও প্রভূত কল্যাণ সাধন করেছেন তিনি। আমার বিশ্বাস জনগণের তথ্য জানার অধিকার সমুন্নত রাখতে তিনি যা যা করেছেন বাংলাদেশ পুলিশ ও এদেশের গণমাধ্যম আজীবন তার এই অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। 

পুলিশে এমন একজন মাসুদুর রহমান আসবেন কি-না সেটা সময়সাপেক্ষ; যার নাম শুনলেই একটা বিভাগের প্রতিচ্ছবি মাথায় চলে আসে। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ করুক বাংলাদেশ পুলিশকে, গণমাধ্যম থাকুক পুলিশের অপরিহার্য বন্ধু হয়ে। ডিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার শ্রদ্ধাভাজন মাসুদুর রহমান স্যার একটা মহীরুহ হয়ে উঠেছিলেন মিডিয়া ও পুলিশের সেতুবন।

লেখক: মফিজুর রহমান পলাশ
সহকারী পুলিশ কমিশনার(এসি মিডিয়া)
মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস ডিভিশন। 
ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা