kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

'আমরা খারাপ মেয়ে মানুষ, কেউ ত্রাণ দেয় না, আবার ঈদ?'

মাহতাব হোসেন   

২৫ মে, ২০২০ ১২:১০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



'আমরা খারাপ মেয়ে মানুষ, কেউ ত্রাণ দেয় না, আবার ঈদ?'

গতকাল রাতে রমনা পার্কের নিকট থেকে তোলা ছবি

প্ল্যান করলাম এবারের ঈদে আমরা ভালো খাবো না। এই ঈদে অনেকেই ভালো খাবে না, তাই আমরা দৈনন্দিন যা খাই তাই খাবো। এছাড়া ঈদের তো কোন শপিং করবোই না, এমনকী একজোড়া চপ্পলও। তারচেয়ে বাজার খরচ, আর শপিং-এর এই টাকাটা কিছু মানুষকে দিয়ে দিলে ভালো হয়। সানজিদাকে এই প্রস্তাব দেওয়ায় সে সান্দন্দে রাজি। কারণ গত ঈদের চাঁদরাতে বাইকে ঘুরে ঘুরে এটিএম বুথের সিকিউরিটি আর সিটি করপোরেশনের কিছু পরিচ্ছন্ন কর্মীকে সহায়তা করেছিলাম। কিন্তু এবার ও থাকবে না, কিন্তু প্রস্তাবে রাজি। বলল-

'শুধু অন্তত আসার সময় একটু সেমাই কিনে নিয়ে এসো, সেমাই ছাড়া ঈদ কেমন হয়?'  

এবার চাঁদরাতে একাই বের হলাম। খুব সামান্য সহায়তা, সেটা দিয়ে হয়তো কিছুই হবে না তাদের। তারপরেও যদি কোনভাবে সেটা কাজে আসে সেসব মানুষদের।
এয়ারপোর্ট রোডে, রাস্তার দুই ধারে অনেকেই বসে আছে, একটু সাহায্যের জন্য বসে আছে। মগবাজার থেকে এয়ারপোর্ট রোডে, যেখানে যেভাবে পেরেছি কিছু কিছু করে সহায়তা করছি। কোথাও একজনকে দেখে থামলেই চারপাশ থেকে মানুষ এসে ঘিরে ধরে। তারপরেও মেইন্টেন করছি। সাতরাস্তার কাছে, ফ্লাইওভারটা যেখান থেকে ওঠা শুরু করেছে তার কয়েক গজ সামনে, এক পিতা তার তিন সন্তান নিয়ে বসে আছে। সাধারণত বাইক ধীরে ধীরে চালিয়ে যাওয়ার সময় যাদের প্রয়োজন তারা হাত পাতে। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। কিন্তু এই লোক হাত পাতলো না। নির্বিকার বসে আছে। মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে সবচেয়ে ছোট বাচ্চাটা বয়স দুই আড়াই হবে, বড়টা তাকে ধরতে যাচ্ছে। মেজ'টা নিজের খেয়াল মতো খেলছে। বাবা নির্বিকার। বললাম-
'বাড়ি কোথায়?'
'শরীয়তপুর'
'বাচ্চাদের মা কোথায়?'
'মারা গেছে।'
'কতদিন হলো?'
'দুই বছর'
'এই যে বসে আছেন, খাইছেন?'
'না।'
এমনভাবে কথা বলছেন যেন তার খাওয়া দাওয়া অন্য বিষয়ে আগ্রহ নেই। বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে মায়া লাগলো। আমার সর্বোচ্চ সামর্থটুকুর টাকা লোকটার হাতে দিয়ে চলে এলাম। যদিও বেশি সময় দাঁড়ানোর কারণে সেখানে আরো কয়েকজন ভবঘুরে চলে এলো।

মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর বেইলি রোড ঘুরলাম। অফিসার্স ক্লাব মোড় থেকে বেরিয়ে কাকরাইল মসজিদ পেরিয়ে শাহবাগের দিকে বাইক টার্ন করেছি। কিছুদূর যেতেই হাতের ডানদিকে চোখ পড়লো, রমনা পার্ক আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে সংযোগ দিয়েছে যে ওভার ব্রিজ, তার গোড়ায়।  

কয়েকজন নারী সারি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঢাকা ক্লাবের সামনে দিয়ে ফের বাইক টার্ন করে এলাম। সাথে সাথে হাত পেতে দিল সবাই। বললাম, 'আমি তো সাংবাদিক, পেপারে কাজ করি। আপনারা ত্রাণ, সাহায্য সহযোগিতা  পাচ্ছেন কি না বলেন। ঈদে সেমাই চিনি চাল পেয়েছেন?'

সবাই একসাথে হাসলেন। তুলনামূলক বয়স বেশি এক নারী বললেন, 'ভাই আর বইলেন না। আমরা খারাপ মেয়ে মানুষ, তাই আমাগো তো কেউ ত্রাণ দেয় না। দেইখা চইলা যায়। কেউ কিছু দেয় না, খাইয়া না খাইয়া আছি, কেমনে বাঁচমু আমরা? আর অদ্দিন এইভাবে চলমু'

কথা হচ্ছিল রমনা পার্কের ওভারব্রিজ থেকে নেমে যাওয়া সিঁড়ির গোড়ার-দিকে।তখন রাত সাড়ে নয়টা। দলের আরেক নারী বললেন, 'কেউ থামলেও খারাপ মেয়ে মানুষ বুইঝা চইলা যায়। আমাগো দিলে মনে করে সওয়াব হইবো না, তাই আমাগো দেয় না। মুখ ফিরাইয়া চইলা যায়।'

আমি একটা ছবি তুলতে পারি? ধরেন আপনাদের মুখ দেখা যাবে না। সাথে একজন বলে উঠলেন, 'ক্যান মুখ দেখা যাইবো না না, আমাগো মুখ দেখাইয়া ছবি তোলেন, পেপারে বড় কইরা লেইখা দিবেন আমাগো কোনো কাল নাই, এই কাল নাই, ওই কাল নাই। আমাগো শরীর ছাড়া কিচ্ছু নাই। এই শরীর ছাড়া কেউ আমাগো সাহায্য করে না। এখন এই সময় কাছেও কেউ আহে না। ত্রাণই পাই না আবার আমাগো ঈদ?'

প্রশ্নটা কার উদ্দেশ্যে ছিল, সেটা আমার অজানা। চলে আসার সময় তাদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে এসেছি। হাতে ঘুরপাক খাচ্ছিল নানা কথা, এই শহরে ভাসমান কত মানুষ, ভাসমান যৌনকর্মী, ভবঘুরে, মানিক ভারসাম্যহীন মানুষ- এদের দায়িত্ব কি সিটি করপরেশন নিতে পারে না?

যাই হোক, ফেরার সময় সেমাই কেনার কথা মনে ছিল না। বাসায় ফিরেই মনে পরলো, হায় আল্লাহ সেমাই কিনতে ভুলে গিয়েছি...। সানজিদাকে বললাম সেমাই কিনতে তো ভুলে গেছি।  সে হেসে বলল- 
'থাক সেমাই ছাড়াও চলে যাবে একটা ঈদ...'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা