kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

নজরুলচর্চা ও এর প্রাসঙ্গিকতা

ড. মইনুল খান   

২৩ মে, ২০২০ ১৭:৪৩ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



নজরুলচর্চা ও এর প্রাসঙ্গিকতা

কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯—১৯৭৬) এর আবির্ভাব হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন একদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ঔপনেবিশক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতে স্বাধীনতার জন্য তুমুল জনস্রোত তৈরি হয়েছিল, অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম দুটো পরস্পরবিরোধী সাম্প্রদায়িকতা পেছনে কুঠারাঘাত করছিল। একইসাথে রাশিয়াতে বলশেভিক বিপ্লব ও তুরস্কে জাতীয়তাবাদের উত্থানে স্বাধীনতাকামীদের অনুপ্রেরণার বাতাস ছড়িয়েছিল। নজরুলের সাহিত্যকর্মের মধ্যে তখনকার এসব বাস্তবতার একটা গভীর ছাপ লক্ষ করা যায়। নজরুল তাঁর সাহিত্যকর্মে অন্যায়, অবিচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ঝড় সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।
 
‘বিদ্রোহী’ (১৯২২) নামের এমনই একটি কবিতা লিখে তিনি ব্রিটিশ ভারতে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁর সাহিত্যে মানবতা, প্রেম ও সাম্যের বিষয়গুলোও সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে নজরুল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হচ্ছে তিনি তাঁর কর্মে সেক্যুলার মতাদর্শকে দৃঢ়ভাবে স্থান দিয়েছেন, যার প্রাসঙ্গিকতা এখনো অনুভূত। ব্রিটিশ ভারতের এই ধারার সাহিত্যকর্ম সময়ের আবর্তনে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত উপযোগী।
 
নজরুল নিজে একজন মুসলিম হয়েও তিনি নিজ ধর্মের কট্টর প্রথাকে সমালোচনা করেছেন ও কোন কোন ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছেন। একজন সাহিত্যিকের এই উদারতা নজরুলকে অনেক উচ্চে স্থান করে দিয়েছে। সৌদি আরবের জাজান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (২০১৫) দুবাইয়ে শিক্ষা সংক্রান্ত একটি কনফারেন্সে তাঁর গবেষণাপত্রে বলেছেন, অনেক গুণী সাহিত্যিকের মধ্যেও নজরুলের এই ধরনের উদারতা দৃশ্যমান হয়নি। তিনি উদাহরণ হিসেবে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘দি মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নামীয় নাটকের চরিত্র চিত্রায়নে নিজ ধর্মের প্রতি নাট্যকারের বিশেষ প্রীতির কথা উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে, কাজী নজরুল ইসলাম এই ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে থাকতে পেরেছেন মর্মে তিনি মনে করেন। ঐ গবেষকের মতে, মুসলিম কবি হয়েও ধর্মীয় বিভাজনের গন্ডি পেরিয়ে নজরুল সর্বদা সেক্যুলার ভাবধারাকে আঁঁকড়ে ধরেছেন এবং সার্বজনীনতার পরিচয় দিয়েছেন।
 
নজরুলের প্রায় ২৩ বছরের (১৯১৯—১৯৪২) সাহিত্যকর্ম পর্যালোচনায় কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে উঠে, যা সেক্যুলার ভাবাদর্শকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রথমত, নজরুলের সাহিত্যের অন্যতম দিক হচ্ছে হিন্দু—মুসলিমদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনা জাগ্রত করা। ব্রিটিশ ভারতে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক তিক্ততায় পৌঁছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দাঙ্গায় পরিণত হয়। নজরুল এতে অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি আনয়নের উপর জোর দেন। তিনি ‘পুতুলের বিয়ে’ (১৯৩৩) নাটিকায় লিখেন, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’ নজরুল হিন্দু—মুসলিম ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানবধর্মকে লালন করার কথা বলেছেন।‘ছুৎমার্গ’ (১৯২২) প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার মহাগগনতলের সীমাহারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া-মানব। তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদি-বাণী ফুটাও দেখি আমার মানুষ ধর্ম।’
 
এই প্রসঙ্গে তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবতাকে সবচেয়ে বড় করে দেখার জন্য বলেন। তিনি ‘সাম্যবাদী’ (১৯২৫)  কবিতায় বলেছেন, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।/ নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,/ সবদেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জাতি।’ তিনি ‘গণবাণী’ পত্রিকায় ‘হিন্দু-মুসলমান’ (১৯২২) প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘হিন্দুত্ব ও মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায়, কিন্তু তাদের টিকিত্ব, দাড়িত্ব অসহ্য, কেননা ঐ দুটোই মারামারি বাধায়। টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা পন্ডিত্ব। তেমনি দাড়িত্ব ইসলমাত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব। ... অবতার-পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানদের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমি মানুষের জন্য এসেছি— আলোর মত, সকলের জন্য।’ এর দ্বারা নজরুল সংকীর্ণ ধর্মীয় বিভেদ ভুলে বৃহপরিসরে মানবধর্মের জয়গান করার জন্য আহবান জানান।
 
অন্যদিকে, ‘নবযুগ’ (১৯২০) পত্রিকার এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘এস ভাই হিন্দু! এস মুসলমান! এস বৌদ্ধ! এস ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সব গন্ডী কাটাইয়া সব সংকীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না।’ তাঁর লেখনীতে নজরুল এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানকে বড় করে দেখতে চেয়েছেন। ১৯২৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পরে তিনি ‘কাণ্ডারি হুশিয়ার’ কবিতাটি লিখেন। এতে তিনি উভয় সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির চেতনা জাগ্রত করার কথা বলেছেন।
 
দ্বিতীয়ত, নজরুল তাঁর সাহিত্যে পারস্পারিক সাংস্কৃতিক সমন্বয় (সিনক্রেটিজম)-কে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এর ফলে দুই প্রধান সম্প্রদায়কে এক কাতারে আনা এবং সমাজে অধিকতর সহনশীলতা নিশ্চিত করা যাবে। তাই তিনি হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় বিভিন্ন চরিত্রকে সংমিশ্রণ করে ব্যবহার করেছেন। কখনো তিনি হিন্দু দেব-দেবীর প্রশংসায় মেতেছেন, কখনো তিনি মুসলিম ঐতিহ্যকে তুলে এনেছেন। এই সমন্বয়ের এক অপূর্ব সমাহার তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ (১৯২২) কবিতায় দেখা যায়। এখানে তিনি হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্য থেকে শব্দ, চিত্রকল্প, বাগভঙ্গি, রূপক এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, এটি কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের না হয়ে তিনি তা মানুষের শৃঙ্খলমুক্তির পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন, তিনি বলেছেন, ‘আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্নিশ।/আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,/ আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,/ আমি পিনাক-পাণির ডমরু ক্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড,/ আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!/ আমি খ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য, আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!’ তিনি অন্যান্য কবিতায়-গানেও একইসাথে আল্লাহ-ঈশ্বর, মসজিদ-মন্দির-গির্জা, মোহাম্মদ-কৃষ্ণ-খালেদ-অর্জুন, কোরআন-বেদ-বাইবেল ইত্যাদি অনুসঙ্গ, ব্যক্তি ও চরিত্রনামের উপমা দিয়েছেন। তিনি এই মিশ্রণের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে মিলনের প্রয়াস নিয়েছিলেন। অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ-র পত্রের এক জবাবে নজরুল তত্কালীন ‘সওগাত’ পত্রিকায় বাংলা ১৩৩৪ (১৯২৭) এর পৌষ সংখায় লিখেছেন, ‘আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এ সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেবদেবীর নাম নিই।’ এই মিশ্রণের পাশাপাশি তিনি হিন্দু-মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র সাহিত্যও রচনা করেছেন। হিন্দুদের জন্য শ্যামাসংগীত ও মুসলিমদের জন্য গজলগান রচনায় মৌলিকত্ব দেখিয়েছেন। এর দ্বারা তিনি উভয় সম্প্রদায়ের মনোবিকাশের ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছেন।
 
তৃতীয়ত, কোন কোন পশ্চিমাদের লেখায় ইসলাম ধর্মনুসারীদের মধ্যে নারীর মর্যাদা নেই বলে উচ্চারণ করলেও নজরুল তাঁর সাহিত্যকর্মে নারী—পুরুষকে সমানভাবে দেখেছেন। তিনি নারীকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হননি। তাঁর মতে, পৃথিবীতে সকল ‘কল্যানকর’ অবদানের অধিকারী হচ্ছে এই নারী। তিনি ‘নারী’ (১৯২৫) নামের কবিতায় বলেন, ‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমনীর কোনো ভেদাভেদ নাই।/বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এর মাধ্যমে তিনি নারীর ক্ষমতায়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন। নজরুল অন্যান্য লেখনীতেও নারীর প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করেছেন। যেমন ‘বারাঙ্গনা’ (১৯২১) কবিতায় সমাজের পতিত নারীদের অধিকারের কথা ও নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। নারীদের নিয়ে অন্যান্য সাহিত্যিকদের আগ্রহ প্রেম-সৌন্দর্য্যের মধ্যে সীমিত থাকলেও নজরুল নারীর সুখ-দুঃখ, মান-সম্মান, অধিকার, চেতনাবোধ ইত্যাদি জাগ্রতের প্রসঙ্গটি সামনে এনেছেন। ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ (১৯৩৬) নামের একটা গানে নজরুল নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার উপর জোর দেন।‘মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নী’-দের মুক্তির জন্য উদ্দীপ্ত করেছেন এই গানে। আরো অনেক গান ও কবিতায় তিনি নারী জাগরণের প্রসঙ্গটি এনেছেন।
 
চতুর্থত, নজরুলের এই অবস্থান তিনি শুধু লেখনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ব্যক্তিজীবনেও সংকীর্ণতার উর্ধ্বে থেকেছেন। পারিবারিকভাবে তিনি বিয়ে করেছেন প্রমীলা দেবী নামের এক নারীকে, যিনি ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তত্কালীন মুসলিম সমাজে হিন্দুদের সাথে মুসলিমদের বিয়ে করাটা অগ্রহণযোগ্য ছিল। নজরুল এই ধর্মীয় প্রথা ভেঙ্গে ও মানবতাকে উর্ধে রেখে ভিন্ন ধর্মের নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং তার সাথে আমৃত্যু সংসার করেন। এমনকি বিয়ের পর তিনি নিজের স্ত্রীকে নিজের হিন্দু ধর্ম পালনে কোন বাঁধার সৃষ্টি করেননি বা স্ত্রীকে ধর্মান্তরিত করতে কোন জোর করেননি। নিজের ছেলেমেয়ের নামও তিনি হিন্দু-মুসলিম মিশ্রণে রেখেছিলেন। যেমন, প্রথম পুত্রের নাম রেখেছিলেন ‘কৃষ্ণ (হিন্দু গড) মোহাম্মদ (মুসলিম নবী)’ এবং দ্বিতীয় ছেলের নাম ‘অরিন্দম (সংস্কৃতি শব্দ) খালেদ’ (মুসলিম শব্দ)। এর দ্বারা দুই ধর্মের প্রতি সমান সহনশীলতা ও সহাবস্থানকে তাঁর ব্যক্তিগত চর্চার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
 
পঞ্চমত, তুরস্কের খেলাফত আন্দোলনের বিপক্ষে গিয়ে তুরস্কের সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান নেন নজরুল। তখনকার ব্রিটিশ ভারতে ‘প্যান ইসলামিজম’ এর আদলে খেলাফত আন্দোলন চলছিল এবং ব্রিটিশ সরকার তুরস্কের ইসলামি খেলাফত রক্ষায় সমর্থন দেয়ার জন্য চাপের সম্মুখীন হয়। কিন্তু নজরুল তুরস্কের জাতীয়তাবাদী নেতা কামাল পাশা (১৮৮১—১৯৩৮)-র পক্ষের অবস্থান নেন। তিনি ইসলামের এই ধরনের বৈশ্বিক রূপের বিরোধী ছিলেন। ‘কামাল পাশা’ (১৯২৪) নামে তিনি এই সময়ে একটি কবিতাও লিখেন, ‘ঐ ক্ষেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,/অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল ভাই।/ কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!/ হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই।’ কামাল পাশার প্রতি এই সমর্থনের পেছনের মূল কারণ ছিল যে, তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক। কামাল পাশা কোন ধর্মকে কেন্দ্র করে তুরস্কের স্বাধীনতা আন্দোলন করেননি।
 
নজরুলের এই সেক্যুলার ধারণা পাকিস্তানি আমলেও নানা অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রাম ও প্রতিবাদে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে তখনকার ভাষার প্রশ্নে হিন্দু-মুসলিমদের ঐক্য সুদৃঢ় হয়। ধর্মীয় প্রভাব থেকে বের হয়ে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ রুখতে বাঙালিদের মুক্তির আন্দোলন সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী নজরুল দর্শন (১৯৯২) শীর্ষক বইতে লিখেছেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে নজরুলের বিদ্রোহী গান, কবিতা ও মূল্যবোধ বাঙালির মনোজগতের ভিতকে মজবুত করা ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। (পৃষ্ঠা ৪২)। ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট’, ‘চল চল চল, উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’, ‘বল বীর বল চির উন্নত মম শির’ ইত্যাদি গান ও কবিতা  মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাকামীদের উদ্দীপ্ত করতে পেরেছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয় সেখানে নজরুলের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যের ধারণা সংযোজিত হয়। ধর্মের আবরণ থেকে বের হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সেক্যুলার মূলবোধগুলো ধারণ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকরুদ্ধ (১৯৪২ সাল থেকে) কাজী নজরুল ইসলামকে ১৯৭২ সালে কোলকাতা থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আনতে সক্ষম হন। ঐসময়ে তাঁকে আনার ফলেই নজরুল ও তাঁর মতাদর্শ আজ বাংলাদেশের গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উপলব্ধি বঙ্গবন্ধু তখনই করতে পেরেছিলেন। নজরুলকে বালাদেশের মাটিতে আনার ক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় দেন। পরবর্তীতে নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা এবং একুশে পদকসহ অন্যান্য পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে নজরুল ইন্তেকাল করলে এই মাটিতেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
 
নজরুলের ভাবধারার সার্বিক মূল্যায়নে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘নজরুল ইসলামের বৈশ্বিক চিন্তা’ (কাজী নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০০) শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেন, কবি নজরুল ছিলেন ‘অগ্রসর, বহু-সম্প্রদায়কেন্দ্রিক, এবং এক বিশেষ অর্থে, বৈশ্বিক’, যেখানে কোন ধর্মীয় গোড়ামি নেই, আছে ‘চিত্তশুদ্ধি এবং জ্ঞান তাত্ত্বিক মহিমার সমন্বয়’ (পৃষ্ঠা ১৩২-১৩৪)। নজরুলের জন্ম ভারতীয় অংশে হলেও তাঁর মূল্যবোধগুলো তাই বাংলাদেশি। একারণেই নজরুল বাংলাদেশের প্রকৃত মুখশ্রী। এই উপলব্ধি নজরুলচর্চার প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়ার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। বৃহৎ অর্থে, নজরুলচর্চা সমাজের যে কোন ধর্মীয় অস্থিরতা ও চরমপন্থার পথ রুদ্ধ করতে অগ্রণি ভূমিকা রাখতে পারে।
 
লেখক : অস্ট্রেলিয়ার সেন্টার ফর পলিসিং, ইন্টেলিজেন্স ও কাউন্টার টেররিজম থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি কমিশনার অব কাস্টমস, এনবিআর, ও সাবেক মহাপরিচালক, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহপরিচালক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা