kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

নন-এমপিওভুক্ত-কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের দয়া করুন!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ মে, ২০২০ ০১:১৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নন-এমপিওভুক্ত-কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের দয়া করুন!

প্রাথমিক শিক্ষা একটি সমাজ ও জাতি গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে তা পরিচালনা করতে হয়। পর্যাপ্ত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনগুলো আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষার চাহিদা মেটাতে সচেষ্ট রয়েছে। 

জার্মান শিশু-শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল ১৮৩৭ সালে ব্যাড ব্ল্যাংকেনবার্গে শিশুদেরকে বাড়ি থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত গমন এবং খেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের ধারণাকে কেন্দ্র করে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। স্বাধীনতার পর থেকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব এবং ছোট শিশুদের উপযুক্ত যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। এর ফলস্বরূপ নার্সারি স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনের আদলে ছোট শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পায়।

১৯৭৪ সালে কুদরাত-ই-খুদা এবং ১৯৮৮ সালে মফিজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন শিক্ষা কমিশন শিশুদের শিক্ষার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং দেশে এর প্রচলনের জোর সুপারিশ করেছে। এই শিক্ষা কমিশন দুটি শহর ও শিল্প এলাকার সকল শিশুদের জন্য নার্সারি বা কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। ১৯৯৫ সালে গঠিত সবার জন্য শিক্ষা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি ‘সবার জন্য শিক্ষা’ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে ছোট শিশুদের শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করে এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সুপারিশ পেশ করে। 

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ১৯৯৭ সালে গঠিত কমিটির সুপারিশেও একই কথা বলা হয় এবং সেই সাথে শিশুদের শিক্ষা দানের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলা শিক্ষকদের নিয়োগ করারও পরামর্শ দেয়। অপর্যাপ্ত সরকারি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে উল্লেখিত শিক্ষা কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সরকারের পক্ষে কখনোই সম্ভব না। তাই ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্ডেনগুলো জাতীয় শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। 

বাংলাদেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬০১টি। এর বিপরীতে কিন্ডারগার্ডেন রয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার। দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র বেতনে শিক্ষকতা করে এক শ্রেণির শিক্ষিত যুবক দূর করছে নিজ নামের সাথে লেগে থাকা বেকার অপবাদটি। স্বীকৃতি না থাকার পরও চেষ্টার সবটুকু ঢেলে দিয়ে হাসিমুখে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতকে। আর জাাতি গঠনে গড়ে তুলছে আগামী প্রজম্মকে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ১৬ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কিন্ডারগার্টেনগুলো। সেই সাথে বন্ধ রয়েছে শিক্ষকদের আয়ের পথও। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বৈশাখী বোনাস, ঈদ বোনাসসহ ঘরে বসেই সকল সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। ডাক্তার, গার্মেন্টকর্মী, মসজিদের ঈমাম এমনকি কওমি মাদরাসাগুলোও সরকারি অনুদান পাচ্ছে। কিন্তু জাতি গঠনে বিশেষ অবদান রেখে চলা কিন্ডারগার্ডেনের শিক্ষক ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। 

সরকারি অনুদান বা সাহায্য ছাড়াই বছরের পর বছর প্রায় ৯৯ শতাংশ কিন্ডারগার্টেন ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হচ্ছে। গত দুই মাসের অধিক সময় ধরে বন্ধ থাকায় টিউশন ফি (শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন) পাচ্ছে না এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। বকেয়া হয়ে গেছে বাড়ি ভাড়া। মানবেতর জীবন যাপন করছেন শিক্ষকসহ এর সাথে সম্পৃক্ত সকল কর্মচারী ও তাদের পরিবার। মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপে পথে বসার আতঙ্কে রয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা পরিচালকবৃন্দ। কিভাবে এই করোনাত্তোর সময়ে নিজ প্রতিষ্ঠানকে আবার সচল করে তুলবেন তা ভেবে অনেকে দিশেহারা। এমতাবস্থায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ কিন্ডারগার্টেনগুলোকে এবং এর সাথে সম্পৃক্ত সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের এগিয়ে আসা উচিৎ। অন্যথায় প্রাথমিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটি মুখ থুবরে পড়বে। তখন ৫ লাখের অধিক শিক্ষক আর প্রায় কোটি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হুট করে জায়গা দেবার মতো সরকারের হাতে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় দেশের শিক্ষাঙ্গণে বিরাজ করবে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।

কিন্ডারগার্ডেনগুলো যদি না থাকতো তাহলে সরকারকে আরো ২৫ থেকে ৩০ হাজার বিদ্যালয় স্থাপন করে প্রতি মাসে শিক্ষক বেতন বাবদ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হতো। সেদিক থেকে চিন্তা করলে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের বিরাট রাজস্ব ব্যয় কমিয়ে দিয়েছি। আবার তারা পরোক্ষভাবে দেশের বেকার সমস্যা সমাধানেও কাজ করচ্ছে বলে দাবি করলে ভুল করবে না। তাই এই সঙ্কটময় সময় দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রের স্বার্থেই তাদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব সরকারের।

চাকরির নিশ্চিয়তা নাই, কোনো সার্ভিস রুলও নাই এবং সার্ভিস শেষে কোনো বেনিফিট না থাকা এসব কিন্ডারগার্টেন এবং নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ যাতে ভালোভাবে চলতে পারে, শিক্ষক-কর্মচারীদের সার্ভিস রুল তৈরি হয়, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান অনুষ্ঠিত হয়, শিক্ষকদের জবাবদিহির মধ্যে আনা যায়, সর্বোপরি ভবিষ্যৎ নাগরিকদের এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদান করা যায়; সে জন্য একটি কমিশন গঠন করে এই অসহায় শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। 

নিশ্চয় মমতাময়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানবেতন জীবন যাপন করা এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াবেন।

লেখক: হাফিজুর রহমান মিতু।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা