kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

প্রক্রিয়াজাতকৃত আমের তৈরি খাদ্য পণ্য হতে পারে অন্যতম আয় উপার্জনের পথ

ড. মো: গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী   

২২ মে, ২০২০ ১৬:২১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রক্রিয়াজাতকৃত আমের তৈরি খাদ্য পণ্য হতে পারে অন্যতম আয় উপার্জনের পথ

আম বাংলাদেশের অন্যতম একটি জনপ্রিয় ফল। এটি খেতে সুস্বাদু ও পুষ্টি সমৃদ্ধ বলে আমকে ফলের রাজা বলা হয়। আম পাঁকা ও কাঁচা দুই ভাবে খাওয়া হয় এবং প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে বিভিন্ন রকমের খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। আমের বহুমুখী প্রয়োগ পৃথিবীর অনেক দেশেই খাদ্য সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তা ব্যবহার করছে। ফলে আম উৎপাদনের সাথে জড়িত কৃষক, ব্যবসায়ী, উদ্যেক্তা ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান সকলেই লাভবান হচ্ছে। এতে করে কৃষক তার কষ্ট করে ফলানো পণ্য নিয়ে কোন উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকে না বরং এই ব্যবসার সম্প্রসারণ নিয়ে স্বপ্ন দেখে ও উৎসাহিত হয়ে থাকে। 

একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, তা হলো আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই কৃষি পণ্য উৎপাদনের সাথে কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি লিংকেজ বা সংযোগ থাকে যা দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না বা নেই বললেই চলে যদিও বর্তমান কৃষি বান্ধব সরকার এবং মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মহোদয় একজন কৃতি কৃষিবিদ হওয়ায় বিষয়টিকে বর্তমানে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বর্তমান কৃষি বান্ধব সরকারের বিভিন্ন প্রয়াস বা কৃষি পণ্য বাণিজ্যিকীকরণ করতে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন নিয়ে কাজ চলমান আছে যা কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা সকলেই লাভবান হবে বলে আশা করা যায় এবং এটি পৃথিবীর অনেক দেশেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক র্দুযোগ আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই বিভিন্ন ঝড়, অতি বৃষ্টি অথবা খড়া ও অন্যান্য মহামারি আমরা মোকাবিলা করছি এবং সরকার এ ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য এবং ন্যায্য মুল্য নিশ্চিত হওয়া নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েই গিয়েছে।

গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার ’আম্ফান’ নামক সুপার সাইক্লোন এর প্রভাবে অনেক কৃষি পণ্যের ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে খবরের শিরোনাম হয়েছে। বিশেষ করে এখন দেশের অন্যতম একটি উচ্চ মূল্যের ফসল আম যে ফলের স্বাদ নিতে দেশের ভোক্তা তথা প্রবাসী অনেক বাংলাদেশিও এ মধু মাসের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। স্বাদ, ঘ্রাণ ও পুষ্টি গুন অধিক পরিমাণে বিদ্যমান হওয়ায় দেশের আপামর প্রায় সকলেই আম খেতে অত্যন্ত পছন্দ করে। 

এই ফলটিতে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ উপাদান, ফ্ল্যাবোনয়েড, ফাইবারসহ অন্যান্য পুষ্টিগুন যথেস্ট পরিমাণে থাকে। আমাদের দেশে প্রতি বছর ঝরে, ঝড়ে ও শিলা বৃষ্টির ফলে অধিক পরিমাণে আম গাছ থেকে মাটিতে পড়ে যায়। অনেক সময় গাছ থেকে পড়া আম ফেটে যায়। ফলে বিভিন্ন দাগ বা কষ আমের গায়ে লেগে থাকায় আমের গুনগত মান (ফলের রং) দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় আম উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত কৃষক ও ব্যবসায়ী খুব অল্প মূল্যে বিশেষ করে কাঁচা আম বাজারে বিক্রয় করতে বাধ্য হয়ে থাকে কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আমের অপচয় বহুলাংশে কমানো যায়। আমের বহুমুখী ব্যবহার হিসেবে বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী তৈরি করা যায়।

আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের জেলাগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোর, রাজশাহী, চাপাঁইনবাবগঞ্জসহ অন্যান্য জেলাতে ’আমপান’ সুপার সাইক্লোন এর প্রভাবে গত দুই দিনে ব্যাপকভাবে আম ঝরে পড়ে।

পত্রিকার তথ্য মতে শুধু আম ফলটিরই ১৫০ কোটির সমপরিমাণ ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং বর্তমানে কৃষক ২ - ১০ টাকা কেজি দরে এই ঝরে পড়া আম বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। অধিকাংশ আমই (ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত ইত্যাদি) ছিল পরিপুষ্ঠ এবং হার্ভেস্টিং বা গাছ হতে ১ - ৪ সপ্তাহের মধ্যে পাড়ার উপযোগী বলে জানা যায়। এই ঝরে পড়া কাচাঁ বা পরিপ্ষ্ঠু আম প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অপচয় অনেকটা রোধ করা সম্ভব। 

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে আমের সংগ্রহোত্তর অপচয়ের পরিমান শতকরা ২৫ - ৪৪ ভাগ। অপচয় তথা ক্ষতি কমানোর অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাপনার প্রয়াগ করা।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, রকমারি খাদ্য সামগ্রী বা সহজ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হলে প্রক্রিয়াজাতকরণে যা বিনিয়োগ করা হয় রিটার্ন বা ফেরত হিসেবে তার ২ গুণ বা অনেক সময় ২.৫ - ৩ গুণ বা তারঁও অধিক পরিমাণ লাভ পাওয়া যায়। মৌসূমের শুরুতেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ব্যক্তি,গ্রুপ, উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান নিজেরাই স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সহজ প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী তৈরি করে বিপণন করতে সক্ষম হবে বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তা সরবরাহ করতে পারে।

অব্যশই এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনাসহ দেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ করে বিপণনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যা প্রস্তুতকৃত খাদ্য সামগ্রীটি নিজেকে ব্রান্ড হিসেবে পরিচিত করবে। ফলে ভোক্তার আস্থা উক্ত পণ্যের প্রতি যেমন অনেক বেড়ে যাবে তেমনি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে খুব সহজেই খাবারের টেবিলে আমের তৈরিকৃত পণ্যের স্বাদ সারা বছরই নেওয়া সম্ভব হবে। এতে করে এই ফলের অপচয় অনেকাংশে রোধ করা যাবে।  

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন গাজীপুরস্থ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএআরআই) এর পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ আমের পরিচর্যা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন বিজ্ঞান সম্মত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এই সব প্রযুক্তি খুব সহজেই ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কাচাঁ আম দীর্ঘ সময় (৬ - ৮ মাস পর্যন্ত) পরিমিত লবণ ও এসিটিক এসিড বা ভিনেগার মিশ্রিত দ্রবণে সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়াও এই সংরক্ষিত আম দিয়ে সারা বছর আমসত্ত্ব, আমচুর, ম্যাংগো বার, আমের জুস সহ রকমারী খাদ্য সামগ্রী তৈরি করা যাবে আবার বিভিন্ন খাবারের সাথে মিশিয়ে রান্না করে খাওয়া যাবে।  

অধিকন্ত পরিপক্ক বা পরিপুষ্ঠ আম দিয়ে আচার, চাটনী, জ্যাম, জেলী, ম্যাংগো জুস, নেকটার, বিভিন্ন ধরনের শুকনো খাদ্য সামগ্রী, মোরব্বা, অসমোটিক ডিহাইড্রেটেড পণ্য, আমকে পাউডারে রুপান্তরিত করার মাধ্যমে সারা বছর জুস তৈরিতে ব্যবহার করা, আমের পাল্প সংরক্ষণ, আমের ফ্রোজেন খাদ্য সামগ্রী, ফ্রেশকাট ইত্যাদি হিসেবে ব্যবহারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। 

উল্লেখ্য যে, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান, কোরিয়া, চীন, ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশেই আমের ক্যান প্রডাক্ট, ম্যাংগো বার, ম্যাংগো জুস, অসমোটিক ডিহাইড্রেটেড পণ্য ও আমের ফ্রেশকাট পণ্য খুবই জনপ্রিয়। সে সব দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান (ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়) নিজেরাই আমের বিভিন্ন খাদ্য পণ্য প্রস্তÍত করে ও বিদেশে রপ্তানী করে থাকে যা আমাদের দেশের অনেক সুপার শপেই এখন ভোক্তাকে ক্রয় করতে দেখা যায়। 

উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর মধ্যে ড্রাইড পণ্যগুলো কেজি প্রতি ১৫০০ টাকা হতে ২৫০০ টাকা দরে বিক্রয় হয়ে থাকে বলে বিভিন্ন সুপার শপ হতে জানা যায়। কাজেই আম বিভিন্ন পরিপক্কতায় গাছ হতে পাড়া বা ঝরে পড়া আমকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন খাদ্য পণ্য তৈরি করা গেলে এ ফলটি হতে পারে একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল।

ফলটি বেশ সুস্বাদু হওয়ায় বিদেশে তথা মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো (সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, সৌদিআরব), ইউরোপ, যুক্তরাস্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশে প্রস্তুতকৃত খাদ্য পণ্য হিসেবে রপ্তানীর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। 

লেখক : উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর


*** মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা