kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা মোকাবেলায় আমরা কি আরেকটু সতর্ক হতে পারি না!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ মে, ২০২০ ০৭:৫০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনা মোকাবেলায় আমরা কি আরেকটু সতর্ক হতে পারি না!

করোনায় এখন বিশ্ব একপ্রকার মৃত্যুপুরী। ১৯ মে ২০২০ তারিখের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় অর্ধকোটি এবং মৃত্যুর সংখ্যা তিন লাখ বিশ হাজার ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের এবং তারপরই হলো ইউরোপের অবস্থা। এ যেন এক কঠিন পরিস্থিতি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বলা যায় একমাত্র ইরান ছাড়া এশিয়ার অবস্থা এখনো তুলনামূলকভাবে এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেনি। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে এখন যেভাবে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে খারাপের দিকে যাচ্ছে তা একটি অশনি সংকেত ছাড়া আর কিছুই নয়।

অদ্য (১৯.০৫.২০২০) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পাওয়া তথ্যমতে, টেস্টকৃত নমুনা-৮,৪৪৯টি, করোনা শনাক্ত-১,২৫১ জন, অদ্যোবধি আক্রান্ত-২৫,১২১ জন এবং আজকের ২১ জনসহ মোট মৃতের সংখ্যা ৩৭০ জন। তার মানে হলো ৮ মার্চ ২০২০, ৩ জন রোগী শনাক্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ করোনা আক্রমণের খাতায় নাম লেখায়। মাত্র দু’মাস সময়ের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানে এমনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি মোটেও স্বাভাবিক নয়। আক্রান্তের স্থান এবং বৃদ্ধির পরিসংখ্যানগুলো একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে প্রকৃত অবস্থা।

যতই দিন যাচ্ছে টেস্টের পরিমাণ বাড়ছে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বাংলাদেশ সরকার সর্বপ্রথম জরুরি সার্ভিসসমূহ সীমিত আকারে চালু রেখে ১৮ মার্চ থেকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন ইত্যদি বন্ধ করে দেয়। তার আগে থেকেই ঢাকা হয়ে উঠে করোনা আক্রান্তের অন্যতম হটস্পট। তারপর ঢাকার অদূরবর্তী জেলা ও অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ। তখন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও প্রতিদিন এ বৃদ্ধির সংখ্যা ছিল দুই অংকের কোটায়। কিন্তু যখনই বিজিএমইএ’র ভুল বুঝাবোঝির কারণে গার্মেন্টস কারখানাসমূহ অপরিকল্পিতভাবে খুলে গেল। এতে পূর্বে যেসকল নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের নিজ নিজ এলাকায় চলে গিয়েছিল তারা পুনরায় কর্মস্থলে অর্থাৎ ঢাকা কিংবা নারায়ণগঞ্জ ফিরে আসে। তারা এসব হটস্পটে আসার পরপরই ব্যাপকহারে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রতিদিন দুই অংকের সংখ্যা থেকে তিন অংক এবং এখন চার অংকের সংখ্যায় এসে ঠেকেছে।

করোনার জন্য শাট ডাউন কিংবা লকডাউনের মতো নতুন নতুন শব্দ বা কনসেপ্টের সৃষ্টি হয়েছে । দেশের যেসব স্থানে এক বা একাধিক ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছে সেখানেই সরকারের তরফ থেকে সরকারি প্রশাসন লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে যে শুধু লকডাউনের ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে এমনটি নয়, বরং এ লকডাউনকে কার্যকর রাখার জন্য সম্মিলিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা চালানো হয়েছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। আমার নিজের বাসার সামনের একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরছি। আমার বাসার সামনে রয়েছে একটি কলেজের খেলার মাঠ। পাশের গলিতেই রয়েছে একটি মুদি দোকান। সকাল-বিকাল-দুপুর-রাত এমন কোন সময় নেই যে সেখানে শত শত মানুষের সমাগম নেই।

দেখা গেছে এসব মানুষ এখানে কোন কাজে আসে না। কেউ এসেছে খেলতে, কেউ এসেছে খেলা দেখতে, কেউ এসেছে আড্ডা দিতে। আবার যে বাজার আইটেম কয়েকটি মিলে একসাথে করে রাখা যায় সেগুলো না করে একেকটা সওদার জন্য প্রতিবার এসে দোকানে ভীড় করছে। তাদের নেই কোন ন্যূনতম স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নেই একটি মাস্কও। এমন জনসমাগম দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন টহল টিম এসে দৌড় দেওয়ানোর পর মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য অফ থাকছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই তারা আবার যেই-সেই।

সরকার ছুটি বাড়াতে বাড়াতে ঈদের পর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। সেইসাথে ছুটিতে গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারি আদেশে বলা হয়েছে ছুটিতেও যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন। গ্রামের বাড়িতে ছুটোছুটি করার দরকার নেই। কে শুনছে কার কথা।

রাতের অন্ধকারে, পায়ে হেঁটে, ব্যক্তিগতভাবে গাড়ির ব্যবস্থা করে যে যেভাবে পারছে সেভাবেই গ্রামের বাড়িতে পাড়ি জমাচ্ছে। কি লঞ্চ ঘাটে, কি বাস স্টপেজে কোথায়ও পা ফেলার জায়গাটিও নেই। লকডাউন কিছুটা শিথিল করার পর গত দুই-তিন দিন যাবৎ ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যামের পূর্বের মতোই যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে দেশে করোনা নামক আর কোন সমস্যা নেই।

সরকার একা কি করবে? সরকারের আন্তরিকতার কোন অভাব নেই। বরং লকডাউন কার্যকরে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাবের হাজার হাজার সদস্য আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারাও যাচ্ছেন অনেকে। চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যদি বাইরে বের হলে আমার নিজেরই স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে তাহলে আমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু সরকারের ওপরেই বর্তায় নাকি আমার নিজের, পরিবারের, প্রতিবেশি এবং এলাকার কথা চিন্তা করা প্রয়োজন। সেটি কি আমরা কখানো ভেবে দেখেছি! সরকারের গার্মেন্টস চালু রেখে যেমন তাদের বেতনের নিশ্চয়তা বিধান করা দরকার, সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের কথা, কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার কথা চিন্তা করে লকডাউন কিছুটা শিথিল করা দরকার। সেই সরকারেরই আবার করোনা যাতে আর না বাড়ে সেটিও দেখার দায়িত্ব। এত দায়িত্ব যদি সরকার একা নেয় তবে আমি নিজে আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের ঘরে থাকার দায়িত্ব নিতে পারিনা কেন! বিষয়টি সচেতনমহলকে ভেবে দেখার অনুরোধ রইল।

লেখক- ড. মো. হুমায়ুন কবীর, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা