kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

জাদুঘর কর্মকাণ্ডে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির সাম্য

মো. শওকত আলী   

১৯ মে, ২০২০ ১৩:২৭ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



জাদুঘর কর্মকাণ্ডে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির সাম্য

১৮ মে। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। জাদুঘরসমূহের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান International Council of Museums সংক্ষেপে ICOM ১৮ মে কে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ১৯৭৭ সালে। সেই থেকে বিশ্বের অধিকাংশ জাদুঘরে দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদ্যাপন করে আসছে। নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমণজনিত বৈশ্বিক মহামারির কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের এবারের আয়োজনটি ভার্চুয়াল মাধ্যমে উদ্যাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রতিবছর আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উদ্যাপনের জন্য ICOM একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে যা আন্তর্জাতিক জাদুঘর সম্প্রদায়ের পেশাগত কোন ভিত্তিকে প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০১৮-এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘Hyperconnected museum: New approaches, new publics’। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০১৯-এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো ‘Museums as Cultural Hubs: The Future of Traditions’। তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০২০ উদ্যাপনের জন্য প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Museums for Equality: Diversity and Inclusion’। বাংলায় আমরা বলতে পারি - ‘সাম্যের জন্য জাদুঘর: বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি’। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ক্ষেত্রে প্রতিপাদ্য বিষয়টির সম্পৃক্ততা আলোচনাই এ লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য। 

মূল আলোচনার শুরম্নতে Museum শব্দের উত্পত্তি বিষয়ে আলোকপাত করা যায়। অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান তার ‘জাদুঘর ও অবস্তুগত উত্তরাধিকার’ বইয়ে Museum শব্দের উত্পত্তি প্রসঙ্গে বলেছেন-

‘Muse শব্দটি গ্রিক পুরানের Muses থেকে নেয়া হয়েছে। Muses হলো প্রাচীন গ্রিক দেবতাশ্রেষ্ঠ জিয়ুস কন্যা। এরা শুধু গুণবতী, বিদুষীই ছিলেন না, জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্পকলার নানা শাখা যথা- ইতিহাস, মহাকাব্য, গণিত, কবিতা, ট্রাজেডি, কমেডি, নৃত্য, জ্যোতির্বিদ্যা এবং ধর্মসংগীত ইত্যাদি ক্ষেত্রে এরাই নেতৃত্ব দিতেন। এই Muses এর সার্বিক ধরণা থেকে গ্রিক ভাষায় Mouseion (অর্থাত্ জ্ঞান ও বিদ্যার দেবীদের আবাসস্থল) শব্দটির উত্পত্তি। এরই মর্মার্থ ও ভাবধারা নিয়ে ইংরেজি ভাষায় Museum শব্দটির প্রচলন হয়েছে। তাহলে Museum এর মৌলিক ধারণাগত অর্থ হলো সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিবিধ কলাবিদ্যার আবাসগৃহ’। 

এবার আমরা Museum বা জাদুঘরের সংজ্ঞার দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি। উইকিপিডিয়ায় জাদুঘরের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- ‘A museum is an institution that cares for a collection of artifacts and other objects of artistic, cultural, historical, or scientific importance’.
২০০৭ সালের ২৪ আগস্ট অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ICOM-এর ২২তম বার্ষিক সম্মেলনে জাদুঘরের একটি সংজ্ঞা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। ICOM-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে-‘A museum is a non-profit, permanent institution in the service of society and its development, open to the public, which acquires, conserves, researches, communicates and exhibits the tangible and intangible heritage of humanity and its environment for the purposes of education, study and enjoyment’. 

উপরের সংজ্ঞা থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায় কোন একটি দেশের জন্য জাতীয় জাদুঘরের গুরম্নত্ব বা প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক প্যাট্রিক জে বয়লান (Professor Patrick J. Boylan) ১৯৯২ সালে মিউজিয়াম অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলনে ‘Museums and Cultural Identity’ শীর্ষক ভাষণে একটি দেশে জাতীয় জাদুঘরের গুরম্নত্ব সম্পর্কে চমত্কারভাবে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, `I am quite convinced in my own mind that many of the independence leaders decided that the four most vital symbols of independence nationhood and most vital instruments for trying to keep the people together and create a true nation have been in this order of priority:  (i) a national defence force (ii) a national broadcasting service (iii) a national museum and (iv) a national university.

Professor Patrick J. Boylan জাতীয় সংহতি, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে একাত্মবোধ সৃষ্টি এবং স্বাধীন জাতীয় সত্তার প্রতীক হিসেবে জাতীয় জাদুঘরের অনন্য ভূমিকার কথা উলেস্নখ করেছেন। কোন দেশের জাতীয় জাদুঘরের এই প্রধান দায়িত্বটি কিছুটা অবস্তুগত, এটা সংগঠিত হয় এমন এক প্রক্রিয়ায় যা সহজে চাক্ষুষ করা যায় না। এটা গভীরভাবে অনুভব করার বিষয়। মানবসভ্যতার ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, শিল্পকলা এমনকি নৃতাত্ত্বিক ক্রমবিবর্তনের ধারাও জাদুঘরে প্রস্ফুটিত হয়। একটি জাতীয় জাদুঘরের জন্য নিরেট দৃষ্টিগ্রাহ্য মৌলিক মূল কাজটির কথা বলে দিয়েছে ব্রিটিশরা। তারা জাতীয় জাদুঘরের যে প্যারাডাইম (Paradigm) নির্ধারণ করে দিয়েছে তার একটি প্রধান বিষয় হলো: জাতীয় জাদুঘর হবে জ্ঞান, বিদ্যা ও সাংস্কৃতিক উত্কর্ষের কেন্দ্র। শুধু তাই নয় এ ধরণের কাজের মধ্য দিয়ে ছোট বা স্থানীয় জাদুঘরের সামনে নজির স্থাপনের দায়িত্বও জাতীয় জাদুঘরের। মানুষ জাতীয় জাদুঘরে আসবে জ্ঞান আহরণ  ও বিদ্যাশিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ, আনন্দ, বিনোদন, শিক্ষা, সামাজিক মেলামেশা ও কমিউনিটির বোধে উজ্জিবিত হতে, জাতীয় চেতনায় অনুপ্রাণিত এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শত সহস্র বছরের বিভায় আলোকিত হতে। 

বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয় জাদুঘর হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে এই মানদ্লে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে বিস্তৃত করতে হবে। জাদুঘরে দর্শক আকৃষ্ট করার জন্য নিদর্শন সংগ্রহে আধিক্য ও বৈচিত্র্যসহ এর পরিবেশ, প্রতিবেশের উন্নয়ন, এর বাগান ও পুকুরের সৌন্দর্য বর্ধন, দর্শকদের একটু শান্তিতে-স্বস্তিতে দেখবার, সময় কাটানোর এবং আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনা এবং উষ্ণ আন্তরিক ব্যবহার উপহার দিয়ে জাদুঘরের ‘Public Quality’ বাড়াতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘A good museum is one from which you go out feeling better than you came in’.

নিদর্শন হচ্ছে একটি জাদুঘরের প্রাণ। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে চারটি কিউরেটোরিয়াল বিভাগ। নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও নিদর্শনসংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা এই বিভাগগুলোর প্রধান কাজ। নিদর্শনের বৈচিত্র্য ও প্রকৃতি অনুযায়ী বিভাগগুলো তাদের সংগ্রহভা্লারে নতুন নতুন নিদর্শন অন্তর্ভুক্ত ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে থাকে। কিউরেটোরিয়াল বিভাগগুলোর এই কাজে যথেষ্ট বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন; ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা বিভাগ প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের মুর্তি, মুদ্রা, শিলালিপি, পাণ্ডুলিপি, টেরাকোটা এবং দেশের বরেণ্য ও কৃতী সন্তানদের স্মৃতি নিদর্শন, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান নিদর্শনসমূহ সংগ্রহ ও প্রদর্শন করে থাকে। জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগ  মানুষের নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি, কারম্নশিল্পীদের নান্দনিক শিল্পকর্ম, এদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যবহার্য বিভিন্ন সামগ্রী, সৌখিন সামগ্রী ও তৈজসপত্র ইত্যাদি সংগ্রহ প্রদর্শন করে থাকে। সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগ দেশের স্বনামধন্য শিল্পীদের পেইন্ক্ষিং ও অন্যান্য শিল্পকর্ম এবং বিশ্বসভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন সংগ্রহ ও প্রদর্শন করে থাকে। প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগ শিলা ও খনিজ, প্রস্তরীভূত কাঠ, প্রবাল, প্রাণীর জীবাশ্ম, দুর্লভ প্রজাতির শামুক ও ঝিনুক, বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি, তিমির কঙ্কাল ইত্যাদি সংগ্রহ ও প্রদর্শন করে থাকে। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে প্রত্যেকটি বিভাগের সামগ্রিক কর্মকা্ল এবং নিদর্শন অন্তর্ভুক্তি ও প্রদর্শনের বৈচিত্র্যের সমাহার রয়েছে। 

কিউরেটোরিয়াল বিভাগের প্রধান কাজ হলো- জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, কৃষ্টি ইত্যাদি সম্পকির্ত নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা এবং নিদর্শন সংক্রান্ত গবেষণা করা। জনশিক্ষা বিভাগের কাজ হলো- বয়স, শ্রেণি, শিক্ষা নির্বিশেষে দর্শকসেবা, প্রদর্শনী, গাইডসেবা, কীর্তিমানদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ, জাদুঘরের যাবতীয় প্রকাশনা, সমস্ত অনুষ্ঠানের স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র ধারণসহ জনসংযোগ সংক্রান্ত কার্য পরিচালনা করা।
জাদুঘরে সংগৃহীত নিদর্শনের ক্যাটাগরিতে যেমন বৈচিত্র্য রয়েছে তেমনি নিদর্শন সংরক্ষণ পদ্ধতিতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। মেটাল নিদর্শন সংরক্ষণে যে পদ্ধতি ও জ্ঞান  প্রয়োগ করা যায় তা পেপার বা টেক্সটাইল নিদর্শন সংরক্ষণ কাজে প্রয়োগ করা যায় না। যেমন; টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে সুতা ও সেলাই এর সঠিক কৌশলের অভাবে যাতে নিদর্শনটি তার প্রকৃত পরিচয় হারিয়ে না ফেলে সেদিকে দৃষ্টি রেখেই কাজটি সম্পন্ন করতে হয়। সংরক্ষণের পর নিদর্শনের স্বতন্ত্র পরিচিতি অক্ষুন্ন রাখা এ কাজের অন্যতম শর্ত। অন্যান্য নিদর্শনের সংরক্ষণ কাজের ক্ষেত্রেও নিদর্শনের প্রকৃতি অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতির প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়।  

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে জাদুঘর সংশিস্নষ্ট সভা, সেমিনার ও লেখনীতে EDI (ইডিআই) বারবার ধ্বনিত হলেও এবারই EDI (ইডিআই) কে জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্যে যুক্ত করা হয়েছে। EDI (ইডিআই) বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহূত শব্দসংক্ষেপ। এখানে E=Equality (সমতা/সাম্য), D=Diversity (বৈচিত্র্য) ্এবং I=Inclusion (অন্তর্ভুক্তি) এ বছরের জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্যের অন্তর্গত মূল তিনটি শব্দ Equality, Diversity and Inclusion অর্থাত্ EDI (ইডিআই)। 

নিদর্শন সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষণ পদ্ধতি, প্রদর্শন বা উপস্থাপন এমন সব বিষয়ে EDI (ইডিআই) বিবেচনাযোগ্য। জাদুঘরে নিদর্শন সংগ্রহের ক্ষেত্রে সকল ক্যাটাগরির নিদর্শনের সমান প্রাধান্য দেওয়া বাঞ্চনীয়।  নিদর্শন সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বা সমতার বিধান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও বিশ্বাস সংশিস্নষ্ট নিদর্শনকে অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। যেমন:  জাদুঘরে সংগৃহীত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডায়েরির কথা উলেস্নখ করা যায়। ডায়েরিটি পাকিস্তানি হানাদারের হলেও বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে এটি সংশিস্নষ্ট। এ নিদর্শনটি EDI (ইডিআই)-এর ভিত্তিতে সংরক্ষণ করা না হলে সংশিস্নষ্ট ইতিহাসটুকুও হারিয়ে যাবে। অনুরূপভাবে দিনাজপুর জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বলে সাাঁওতালদেরকে বাদ দেয়া যাবে না। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে Equality (সমতা), Diversity (বৈচিত্র্য) ও Inclusion (অন্তর্ভুক্তি)-এর অভাবে কোন নিদর্শন হারিয়ে গেলে ঐ নিদর্শন সংশিস্নষ্ট সংস্কৃতিও বর্তমান এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের নিকট হতে হারিয়ে যাবে।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (SDG) ১০-এ বলা হয়েছে ‘Reduced Inequality’ অর্থাৎ অসমতা হ্রাসকরণ। অপরদেক অভীষ্ট (Goal) ১১-এ বলা হয়েছে ‘Sustainable cities and communities’। অভীষ্ট ১১ পূরণের জন্য যে ৭টি লক্ষ্যমাত্রা (Target) অর্জনের কথা বলা হয়েছে তার ৪র্থ নম্বরে বলা হয়েছে ‘Strengthen efforts to protect and safeguard the world’s cultural and natural heritages’। অভীষ্ট ১১ পূরণের জন্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে সংশিস্নষ্ট রয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আর মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখানে জাতীয় জাদুঘরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খাত ১২-এ বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম অংশের বৈচিত্র্য, অর্ন্তভুক্তি ও সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশের উপর গুরম্নত্ব দেয়া হয়েছে।

অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সারা বিশ্বের আধুনিক জাদুঘরগুলো অসমতা হ্রাসকরণ ও সবার অর্ন্তভুক্তির উপরে জোর দিচ্ছে। সে ধারাবাহিকতায়  ২০২০-এর  আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারিত হয়েছে ‘সাম্যের জন্য জাদুঘর: বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি’ যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ জাতীয়  জাদুঘর নিদর্শন উপস্থাপন, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং প্রদর্শনীর আয়োজনে নানা জাতি-গোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সমতা ও বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। তবে জাদুঘরে সমতা, বৈচিত্র্য ও অর্ন্তভুক্তি কতটুকু সম্ভব হয়েছে তা পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। দেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র কয়েকটি নৃগোষ্ঠীর নিদর্শন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। স্থান সংকুলানের অভাবে দেশের আদি পেশাজীবীদের সঠিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের জন্য পরিসেবাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছে সাম্য, বৈচিত্র্য ও অর্ন্তভুক্তির বিষয়কে নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয় হল জাদুঘরকে শুধু প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, শিক্ষা এবং জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। মোটকথা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে সংস্কৃতি উপস্থাপন এবং বিকাশে নেতৃত্ব দিতে হবে। আর এই নেতৃত্ব যথাযথ হতে পারে সমতা, বৈচিত্র্য ও অর্ন্তভুক্তি নিশ্চিত করার  মাধ্যমে।  

সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা অব্যশই সহজ কোন বিষয় নয়। তবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামগ্রিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করা। এ বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা, জরিপ ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ও জাতি-গোষ্ঠীর সাথে মতবিনিময় করা প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। একইসাথে নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নীতিমালা প্রণয়ণের বিষয়টি যেহেতু কিছুটা সময় সাপেক্ষ বিষয় তাই প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগ তাদের  নিদর্শন উপস্থাপন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করে  সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য বিভাগভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
 
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা