kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

আনিসুজ্জামান স্যার ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর   

১৬ মে, ২০২০ ১৭:২৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আনিসুজ্জামান স্যার ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান

আনিসুজ্জামান স্যার আর নেই। ১৪ মে বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। বয়স হয়েছিল মাত্র ৮৩ বছর।  চির নতুন, তরুণ ও সজীব মানুষটির জন্য এ এমন কোনো বেশী বয়স নয়। বাংলাদেশের অসীম আকাশ থেকে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি সারাজীবনের জন্য হারিয়ে গেলো। সমগ্র বিশ্বে করোনা মহামারীর এই ক্রান্তিকালীন আমাদের সকল আশা-ভরসার বাতিঘরটি নিভে গেল। তাঁর মতো এমন নির্মোহ, নিরহংকার ও বিদ্বান মানুষের আবির্ভাব এই বাংলায় আর হয়তো কখনও ঘটবে না। তিনি আনিস থেকে প্রফেসর আনিসুজ্জামান হয়েছেন, ব্যক্তি থেকেপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সকলের প্রিয়, শ্রদ্ধাভাজন ও ভরসার আশ্রয়স্থল 'আনিস স্যার'।

আনিস স্যার আমাদের সকলের শিক্ষক ছিলেন। যদিও আমরা অনেকেই তাঁর ক্লাসরুমের ছাত্র ছিলাম না, এমনকি তাঁর দু’টো বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করিনি। তবু কেমন করে জানি স্বমহিমায় তিনি আমাদের সকলকে তাঁর ছাত্র করে নিয়েছিলেন। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা তাঁর সরাসরি ছাত্র ছিলেন বা ছাত্রজীবনে তাঁর সান্নিধ্যে আসতে পেরেছেন তাঁরা সৌভাগ্যবান। আমি পাশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার করার সময়ই তার নাম শুনেছি। কিংবদন্তী তূল্য ছিলেন তিনি। তবে ক্লাসে না হোক অন্যান্য সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে স্যারের সরব উপস্থিতি ও ভূমিকা দূর থেকে প্রত্যক্ষ করেছি এবং তাঁর কর্মস্পৃহা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি। 

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনটি ছিল এক উত্তাল সময়ে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে কেটেছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। সে সময়ে ও পরবর্তীতে গণতন্ত্র পূণঃরুদ্ধার, যুদ্ধোপরাধীদের বিচার, দেশে জঙ্গীবাদ ও মৌলবাদের উত্থান রোধ থেকে শুরু করে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্যারকে দেখেছি প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে। তিনি সবসময়ে ন্যায়ের পক্ষে ছিলেন, মানুষের কল্যাণের পক্ষে ছিলেন। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ষাটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং সর্বশেষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। তাই এদেশের  মাটি ও মানুষের  প্রতি তাঁর ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা। তিনি কখনও আপস করেননি। সময়মতো সঠিক ভূমিকা রাখতে কখনো দ্বিধা করেননি। তাইতো তাঁর চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও ভালোবাসার জায়গাটি প্রকাশে তাঁকে কখনও দ্বিধায় পড়তে হয়নি। সকল পরিবেশে তিনি নির্দ্বিধায় সত্য ওসুন্দরের সাথে ছিলেন। তাঁর দৃঢ়তা ছিল হিমালয়ের মতো অবিচল। যা সবাইকে সাহস যুগিয়েছে।তাইতো তিনি দুঃসময়ে এ জাতির বিবেকে পরিণত হয়ে সবার আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন।
 
একটা সময়ে এসে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিপুলা পৃথিবী’ পড়ার সুযোগ পেয়ে অনেক অজানা তথ্য পেয়ে আমি সত্যিই অভিভূত হয়েছি। কোনো বাড়তি কাহন নয়, অত্যন্ত পরিমিত বোধ রক্ষা করে তিনি নির্লিপ্তভাবে বলে গিয়েছেন অনেক না জানা কথা ও বিষয়। তাঁর দক্ষ লেখনীর এই বইটি পড়ে একটি বিষয় উপলব্ধি হয়েছে সাহিত্যের ছাত্র না হওয়ার কারণে, স্যারের লেখা মৌলিক বইগুলো না পড়তে পেরে, অনেক কিছু থেকেই আমি বঞ্চিত হয়েছি। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা, কাজের ধরন, পরিধি ও সীমাব্ধতার একটি অসাধারণ চিত্র ফুটে উঠেছে এই বইতে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয় অর্জনের পর কলকাতা থেকে স্যারের দেশে ফিরে আসা, বাংলায় সংবিধান লেখার কাজে সংম্পৃক্ত থাকা, শিক্ষা কমিশনের কাজে সম্পৃক্ত থাকা, উচ্চ শিক্ষার্থে লন্ডন চলে যাওয়া, বঙ্গবন্ধুর সাথে চলে যাবার আগে কথাবার্তা, সবকিছুই অনেক সাবলীল ভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে । বাংলাদেশের সংবিধানটি বাংলায় লিখতে গিয়ে কি নিদারুণ শ্রমই না তিনি দিয়েছিলেন। জাতি তাঁর অবদানসবসময় স্মরণ করবে।

আনিস স্যার ছিলেন সবার শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয়। তিনি ছিলেন সবার আপনজন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বত্র। সকল ভালো কাজে তাঁকে সহজে পাওয়া যেত। সময় ও শারীরিক সমস্যা না থাকলে তিনি কাউকে ফেরাতেন না। সত্যভাষণে তাঁর কোন দ্বিধা ছিল না।তিনি ছিলেন জাতির বিবেক ও বাতিঘর। বিভিন্ন সময়ে, সংকটকালে মানুষ তাঁর কাছে গিয়ে আলোর সন্ধান পেতেন। তাঁর মতামত ও বিবৃতি দিশাহীন দেশ, জাতি, সমাজ বা ব্যক্তিকে সঠিক পথটি দেখতো। তিনি ছিলেন ধ্রুবতারা। সবাইকে তিনি আলোর পথে চালিত করেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি অস্মপ্রাদায়িক ও উদারনৈতকি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশর। এটাই ছিল তাঁর একমাত্র ব্রত। এমন আধুনিক মানুষ পাওয়া সত্যিই এই জাতির জন্য ছিল একটি বিরল ঘটনা। আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি লালনে তাঁর ভূমিকা তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করেছে। আধুনিকতার আড়ালে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কারণে আমরা লালন করতে পেরেছি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে।বাংলা সাহিত্য ও বাঙ্গালী সংস্কৃতির তিনি ছিলেন একজন ভ্যানগার্ড।    
 
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য এবং এর আগে টানা আট বছর দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকার সুবাদে স্যারের কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিত্ব অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে মানুষ ছিলেন এবং যেকোনো পরিবেশে সাচ্ছন্দবোধ করতেন।যেমন ছিলেন মৃদুভাষী তেমনি ছিল তাঁর পরিমিত বোধ। তাঁর জীবনে বাহুল্যের কোনও স্থান ছিলনা। কথা বলার চাইতে, শুনতে বেশি পছন্দ করতেন। সবাইকে সম্মান করতেন। যেকোনো আসরে তাঁর কথা-বার্তা, পান্ডিত্য ও ব্যক্তিত্বে একটি চমৎকার আবহ তৈরি হতো। তিনি হয়ে উঠতেন সবার আস্থার প্রতীক। আমরা সবসময় চাইতাম তিনি আরও কিছু কথা বলুক, মন দিয়ে শুনি, অজানা বিষয়ে জানতে পেরে আলোকিত হই। আনিসুজ্জামান স্যার জাতীয় অধ্যাপক হয়েছিলেন এক বছরও হয়নি। এই জাতি সবচেয়ে বড় আলোর মশালটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিল, আমরা তাঁকে হারালেও তাঁর কর্ম সেই মশালটিকে সবসময়ে প্রজ্বলিত করে রাখবে এবং অবিরতভাবে আলোকিত করে যাবে আমাদেরকে। এতো মৃত্যু নয়, প্রস্থান মাত্র।

লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা