kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

করোনাভাইরাস ও বিশ্বরাজনীতি

আবু তাহের খান   

৯ মে, ২০২০ ১৫:০১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনাভাইরাস ও বিশ্বরাজনীতি

এটি খুবই জনপ্রিয় মানবিক উপলব্ধি যে যুদ্ধে কেউ জিতে না। কিন্তু কেউই কি জিতে না? পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোর ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় জেতার যে কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে জর্জ বুশ ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করেছিলেন, বলা যায় সেসব ব্যক্তিগত লক্ষ্যের প্রায় পুরোটাই সফল হয়েছিল। ফলে সে যুদ্ধে ইরাকের ২০ হাজার সৈন্য ও ১.৮২ লাখ বেসামরিক মানুষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে ৪ হাজার সাধারণ সৈনিক প্রাণ হারালেও উল্লসিত হয়েছিলেন বুশ ও তাঁর কট্টর সমর্থকেরা, যারা তাঁকে ২০০৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী করেছিল। একইভাবে স্প্যানিস ফ্লু নামে পরিচিত ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে ১০ কোটি মানুষের মৃত্যুজনিত সংকটের আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে চার কোটি মানুষের প্রাণ হারানোর রাজনৈতিক দায়। উপমহাদেশের ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও ওই দুর্ভিক্ষকে পুঁজি করেই রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিল এ দেশের কিছু ধূর্ত লোভী মানুষ। অতএব দেখাই যাচ্ছে যুদ্ধ, মহামারি বা দুর্ভিক্ষের মতো ঘটনায় মানবতা গুমরে কাঁদলেও এসব থেকেই যুগে যুগে রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক ফায়দা লুটেছে স্বার্থান্বেষী মহল। আর চলতি করোনাভাইরাসেও পৃথিবী সে ধারা থেকে মুক্তি পাবে বলে মনে হচ্ছে না।

আগামী ৩ নভেম্বর ৫৯তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। করোনাভাইরাসকে ‘চায়নিজ ভাইরাস’ নাম দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে তাঁর ভোটারদের অনেকখানি মাতিয়ে তুলেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) বিরুদ্ধে চীনের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে ডাব্লিউএইচওকে চাঁদা না দেওয়ার ঘোষণায় সে উন্মত্ততা আরো চাঙ্গা হয়েছে বলেই জানা যায়। এরই মধ্যে তিনি আরো একটি নতুন ঘোষণা দিয়েছেন যে করোনাভাইরাস ছড়ানোর দায়ে চীনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে এবং মার্কিন গোয়েন্দারা তাদের কার্যক্রম তদন্ত করবে। ধারণা করা যায়, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প হয়তো এ ধরনের স্ট্যান্ট আরো ছাড়বেন, যা অবধারিতভাবেই তাঁর জনপ্রিয়তাকে বাড়িয়ে তুলবে এবং করোনার হাত ধরেই হয়তো জিতে যাবেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈতরণি।       

ভারতের বহুল বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী অ্যাক্ট-২০১৯ যখন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলেছে, তখন করোনাভাইরাসই তাঁর জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে রক্ষাকবচ। নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সারা ভারতে বিক্ষোভ-প্রতিবাদের ধারায় হতাহতের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছিল, তাতে করোনার প্রকোপ দেখা না দিলে তিনি সেটি কিভাবে সামাল দিতেন বা আদৌ দিতে পারতেন কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আর সাম্প্রতিক তত্পরতা দেখে এখন তো বোঝাই যাচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে করোনা-হাতিয়ার ব্যবহার করে বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব সংশোধনী অ্যাক্ট তিনি বেশ কঠোরভাবেই প্রয়োগ করতে সমর্থ হবেন।     

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য গত ১০ মার্চ ঢাকায় আসার কথা ছিল নরেন্দ্র মোদির। ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মোদি তখন বাংলাদেশে এলে তা অবধারিতভাবেই এ দেশের জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করত এবং সরকারকেও এ নিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো। এরূপ পরিস্থিতিতে দুপক্ষকেই রক্ষা করেছে করোনাভাইরাস।  
গত ২৩ জানুয়ারি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) বার্মার (আইসিজে তার রুলিংয়ে বার্মা নামটিই ব্যবহার করেছে) প্রতি জারীকৃত এক রুলিংয়ে সে দেশের রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা থেকে রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। বার্মা আইসিজের এ নির্দেশনা অনুসরণে তাত্ক্ষণিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও এটি যে তাদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছিল, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই; এবং বলা যায় সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সংকটে বার্মার ওপর এটিই ছিল এ পর্যন্ত সময়ে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় চাপ। কিন্তু সে চাপ ঘনীভূত হওয়ার আগেই করোনা এসে বিশ্বকে এমন ধাক্কাই দিল যে বর্মী জান্তা রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা কমালো নাকি আরো বাড়িয়ে দিল, সেসব কথা মানুষ বেমালুম ভুলেই গেল। অর্থাত্ বর্মী জান্তার জন্য করোনা বস্তুত এক আশীর্বাদ হয়েই দেখা দিয়েছে। (এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলব, করোনার এ দুঃসময়েও রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক তত্পরতায় যেন বড় ধরনের ঘাটতি দেখা না দেয়)।              

বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতের জন্য সরকার এরই মধ্যে বিরাট অঙ্কের প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, সরকারের শত সতর্কতা সত্ত্বেও এ তহবিলের একটি বড় অংশ এরূপ অনেকের হাতে চলে যাচ্ছে, পরিস্থিতির সার্বিক ও ন্যায়সংগত বিবেচনায় যাঁদের তা না হলেও চলত। এমনকি এখানেই এঁরা থেমে নেই। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার নতুন কোনো ফাঁকফোকর খুঁজে আরো বেশি পরিমাণ সম্পদ কিভাবে কুক্ষিগত করা যায়, সে চেষ্টাও নাকি অব্যাহত আছে এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও এখন তাঁদের শিল্প ও ব্যবসায় মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে বলেও কেউ কেউ ধারণা করছেন। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক দুরবস্থার নাম করে তাঁরা যদি আরো বেশি করে শ্রমিক ঠকান, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বরং সেটি ঘটার সম্ভাবনাই  বেশি। উদাহরণস্বরূপ বলি, করোনার কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল না। তা সত্ত্বেও বহু কারখানা করোনার অজুহাত দিয়ে সে সময়ের শ্রমিক-বেতন এখনো পরিশোধ করেনি। অতএব  বোঝাই যাচ্ছে, করোনা তাঁদের জন্য আবির্ভূত হয়েছে এক আশীর্বাদ হয়ে, যা কাজে লাগিয়ে এ সময়ে তাঁদের শ্রমশোষণ আরো বাড়বে বৈ কমবে না।                     

করোনা সংকট কেটে যাওয়ার পর সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আসার পরও হয়তো এ থেকে সুবিধাবাদীদের ফায়দা লোটার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তাঁরা তখন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কথা বলে বাড়তি প্রণোদনা চাইবেন, আগের নগদ প্রণোদনার হার আরো বাড়াতে বলবেন, বিনা সুদে ঋণ চাইবেন, খেলাপি ঋণের পুরোটাই মাফ চাইবেন, যানবাহন থেকে বাড়তি চাঁদা দাবি করবেন। এমনকি প্রয়োজনে করোনা ফিরে আসার জন্য মনে মনে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করবেন, যাতে বাকি জীবনটাও প্রণোদনা ও অন্য সুযোগ-সুবিধার ওপর ভরসা করে কাটিয়ে দেওয়া যায়। আর ট্রাম্পও হয়তো এ কথাই বলবেন যে একমাত্র তাঁর পক্ষেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ ‘চীনা ভাইরাস’ মুখের এক ধমকেই বিদায় করে দেওয়া সম্ভব।    

সব মিলিয়ে তাই বলতেই হয়, যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি সাধারণ মানুষের জীবনে চরম অভিশাপ হয়ে দেখা দিলেও এক শ্রেণির লোভী ও নষ্ট মানুষের কাছে যুগে যুগে দেশে দেশে এগুলোই হচ্ছে ক্ষমতা ও বিত্ত দখলের হীন কৌশল। করোনার আকস্মিক ছোবলে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবন যখন আজ দিশাহারা, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যখন ক্রমেই এক মানবেতর জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনো শুনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রির জন্য গোপনে বৈঠক করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর দেশে হাড্ডিসার শ্রমিকের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে মুনাফার পরিমাণ কিভাবে আরো বাড়ানো যায়, তা নিয়ে ফন্দি আঁটছে এক শ্রেণির লোভী উদ্যোক্তা। এরা কি আসলেই মানুষ? এরা নিজেরা না হোক, এদের পরিবারের কোনো সদস্যই কি তলস্তয়ের 'How Much Land Does a Man Need?' গল্পটি থেকে তাঁদের পড়ে শোনায়নি যে শেষ পর্যন্ত সমাধিস্থ হওয়ার জন্য দরকারি জায়গাটুকু ছাড়া তার আর তেমন কিছুর প্রয়োজন নেই?     

লেখক : পরিচালক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা