kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

করোনায় আশরাফুন নাহার লিউজার কবিতা হৃদয় ছুঁয়েছে অনেকের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ এপ্রিল, ২০২০ ১৫:১৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় আশরাফুন নাহার লিউজার কবিতা হৃদয় ছুঁয়েছে অনেকের

নিউ ইয়র্ক প্রবাসী কবি, ইয়োগা আর্টিস্ট ও লাইফস্টাইল এক্সাপার্ট আশরাফুন নাহার লিউজার একটি কবিতা অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর এই সময়টায় "আমি মহাপৃথিবী বলছি" নামের কবিতাটিকে অনেকে খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন। কবিতায় উঠে এসেছে পৃথিবী নামক গ্রহে অনেক মানুষের দায়িত্বহীনতার কথা। বিশেষ করে কিভাবে তারা ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে আমাদের প্রাণ প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, এসেছে সেই কথা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করছে, ভোগ বিলাসে মেতে থাকছে মানুষ। মানুষে মানুষে, ধর্মে ধর্মে, ক্ষুদ্র স্বার্থে কিভাবে যুদ্ধ বেধে যাচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে সভ্যতা; সেই করুণ চিত্রের বর্ণনাও উঠে এসেছে কবিতায়।কিভাবে বেড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর উষ্ণতা, গলছে বরফ, দূষিত হচ্ছে সমুদ্র; কবি সে কথা বলতেও ভোলেননি। 

কবি বলতে চেয়েছেন, এই মহাপৃথিবীরও প্রাণ রয়েছে। এই পৃথিবী বলতে চায় শত সহস্রকালের বেদনার কথা। মানুষের দায়িত্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আশরাফুন নাহার লিউজা বলেন, "পৃথিবীর প্রতি যত্ন, মমতা আর ভালোবাসার বড় প্রয়োজন। আমরা যেন সেই কথা ভুলে না যাই।"

প্রাণ, প্রকৃতি ও মানবপ্রেম নিয়ে লিউজার দুটি বই রয়েছে। একটি ভ্রমণ ও লাইফস্টাল বিষয়ক। নাম "কংক্রিটের অরণ্যে স্রোতস্বিনী নদী"। অন্যটি কবিতার বই " নিবেদিতার নীল চোখ"। দুটোই প্রকাশিত হয়েছে অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে।

আমি মহাপৃথিবী বলছি

- আশরাফুন নাহার লিউজা

মানুষ, হে মানুষ!
ভোগবিলাসী মানুষ; একবার চোখ বুজে ভেবে দেখ
তুমি রোজ কতটা খাও, যতটা প্রয়োজন তার চেয়ে কত বেশি?
তোমার সংগ্রহে রেখেছ কত শত বস্ত্র, সাজসজ্জার সামগ্রী,
যতগুলো প্রয়োজন তার চেয়ে কত বেশি?
তুমি খ্যাতির মোহে কতটা অন্ধ,
যা নিঃশেষ করেছে তোমার হৃদয়ের শুদ্ধ ভালোবাসা!
তুমি হাত বাড়িয়ে রাখ মানুষের হাতে হাত,
কাঁধে মেলাও কাঁধ, কর আলিঙ্গন
তা কি অন্তর থেকে?
না কি ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’র মত শুধুই দায়সারা সামাজিক বন্ধন?!
হে মানুষ! সম্পদশালী, প্রাচুর্য্যময় মানুষ
তুমি ঠিক কতটুকু মানবিক? যতটুকু মানুষকে দেখানো যায়!
তুমি কতটা দানশীল? যা তোমার উচ্ছিষ্ট তাই কর দান!
তোমাকে আমি দিয়েছি অনেক...
তুমি ঘুরে বেড়াচ্ছ দেশ থেকে দেশান্তরে
আমার ভেতরের বাতাসকে ভেদ করে
তোমার যান্ত্রিক বাহনের অপ্রতিরোধ্য গতিতে তুমি নেশাগ্রস্ত!
আর পুঁজিবাদী সভ্যতার কলখানার কালো ধোঁয়ায়
আমার মেঘেরা উত্ত্যক্ত, ভীষণ ক্লান্ত।
আমি মহাপৃথিবী বলছি
আমারও প্রাণ আছে, আছে বাঁচার অধিকার!
হে শিক্ষিত সভ্য মানুষ
ব্যক্তিগত অধিকার প্রাপ্তির জন্য তোমাদের কত মিটিং মিছিল
কত হট্টগোল আর চিৎকার!
কিন্তু কেন ভাবছ না,
আমার বরফপুঞ্জ গলে যাচ্ছে ভীষণ, অসহনীয় গরমে,
আমার মহাসমুদ্রের পানিকে তোমরা করছ দূষিত প্রতিমূহুর্তে,
আমার ক্লান্ত মেঘেরা বৃষ্টি হয়ে ঝরতে পারছে না ছন্দে ও আনন্দে!
আমার ভেতরের তুষার প্রবাহকে করছ তোমরা বাঁধাগ্রস্ত,
শুভ্র তুষারে আমি সাজাতে পারছি না
আমার মৃত্তিকা আর বৃক্ষবন।
তোমাদের বিশৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য
আমার চন্দ্র-সূর্য আজ বড্ড বেশি অসহায়!
মানুষ, অতি আধুনিক মহাব্যস্ত মানুষ একটু শান্ত হও,
ভোগবিলাস আর অপচয়ের উন্মাদনায় মেতে থাকা মানুষ
একটু থামো, খুব বেশি ক্ষতি হবে না তোমাদের!
আমারও যে কথা আছে...
আমিও বলতে চাই শত সহস্রকালের বেদনার কথা।
মানুষে-মানুষে, ধর্মে-ধর্মে, দেশে-দেশে, যুদ্ধে-অযুদ্ধে রক্তপাত!
রাজনীতি আর আধিপত্য বিস্তারে ক্ষমতার বেহুঁশ লড়াই,
প্রতিহিংসার পারমানবিক বোমার আঘাতে
আমি দুর্বল হয়ে পড়ছি ক্রমাগত,
স্তব্ধ হয়ে কান পেতে দাও সময়ের কণ্ঠস্বরে
শুনতে পাবে আমার আর্তনাদ,
আমিও বাঁচতে চাই আমারও আছে প্রাণ, আছে নিজস্ব গতি।

করোনা মহামারীর এই সময়টায় যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তার মধ্যে নিউ ইয়র্ককে বলা হচ্ছে এপিসেন্টার। সেই নিউ ইয়র্কের মৃত্যুপুরীতে বসে লেখা কবিতাটি দিয়ে মানুষের বোধকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছেন এই কবি। কবিতাটির হৃদয়গ্রাহী পাঠ করেছেন লেখক ও সাংবাদিক শামীম আল আমিন। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি ভিডিওচিত্র। দারুণ কুশিলতায় যা সম্পাদনা করেছেন তানজির ইসলাম রানা। পাঠকদের জন্যে কবিতা ও ভিডিওটি তুলে দেয়া হলো।


সাতদিনের সেরা