kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

'প্রবাসীদের কটূক্তি নয়, তাদের ত্যাগের কারণেই দেশবাসীর মুখে হাসি'

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া   

৪ এপ্রিল, ২০২০ ২০:৩০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



'প্রবাসীদের কটূক্তি নয়, তাদের ত্যাগের কারণেই দেশবাসীর মুখে হাসি'

বর্তমান সময় নিয়ে লেখার কথা ভাবলে বুক কাঁপে ওঠে। ভাবতেই পারিনি আমার প্রিয় শহর কুলাউড়ার সকল যানবাহন বন্ধ হয়ে যাবে। প্রত্যেক দিন শহরের যে হোটেলগুলোতে আড্ডা দিতাম সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এখন চা খাওয়ার জন্য অনেক বেগ পেতে হয়। কিন্তু কলম সৈনিক হওয়ায় আমাকে বের হতে হচ্ছে। প্রতিদিন খবরের পেছনে ছুটে যাই। তবে এখনকার খবর ভিন্ন। যা আমার সাংবাদিকতা জীবনে কোনোদিন লিখিনি বা দেখিনি। কারো মৃত্যুর খবর শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে। খুব কাছের অনেক প্রবাসী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাই আজ চেষ্টা করছি প্রবাসীদের জীবনযুদ্ধের কিছু কথা লেখার।

আগে কিছু কথা আমার। আমি প্রবাসী নই। তবে আমি প্রবাসী পরিবারের সদস্য। বহু সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার সমারোহে জীবনের এই বেলায় শত যন্ত্রণার গ্যাড়াকলে পিষ্ট হতে দেখেছি অনেক প্রবাসীর স্বপ্ন। জীবন সংগ্রামের এই সময়টাতে প্রতিটা মুহূর্তে কতোই না উচ্চাকাঙ্খা ও উচ্চ স্বপ্ন নিয়ে পথ চলে একজন প্রবাসী। তারপরেও অনেক প্রবাসীর জীবন ডায়েরির পাতাগুলো শূন্যই থেকে যায় অথবা লেখা হয় না পাওয়ার যন্ত্রণার এক মহাকাব্য। সব আশা ভরসা হারিয়ে নিঃস্ব হয় কতো যুবক। সবকিছুর পরেও ওই প্রবাসীরাই আমাদের দেশের সম্পদ, রেমিট্যান্স যোদ্ধা, আমাদের অহংকার ও গৌরবের প্রতীক।

প্রবাসীরা আমাদের কারো ভাই, কারো পিতা, কারো স্বজন, কারো নিকটআত্মীয়, কারো বন্ধু ও কারো শুভাকাঙ্খী। এসব আত্মার সেতুবন্ধনের মধ্যেও যদি প্রবাসীদের কেউ হেয় করে কথা বলে স্বাভাবিক অর্থেই প্রবাসীদের মনে দুঃখ লাগার কথা। এটা মেনে নেওয়া যায় না। সম্প্রতি মহামারী করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে দেশে আসা কুলাউড়িয়ানসহ সকল প্রবাসী ভাইদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকই হেয় করে কটুক্তি করেছেন যা খুবই নিন্দনীয়। এহেন আচরণে প্রবাসীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে বলে মনে করি।

তাদের বলা যেতে পারতো, যে সকল প্রবাসী ভাই দেশে এসেছেন আপনারা সরকারি নির্দেশনা মেনে ১৪ দিন নিজ বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকুন। আপনারা সুরক্ষিত থাকলে সুরক্ষিত থাকবে আপনার পরিবারের সকল সদস্য, দেশ ও জাতি। কিন্তু সেই পরামর্শ না দিয়ে অনেকেই অতি উৎসাহী হয়ে সেই সকল রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিয়ে কটুক্তি করেছেন। এতে তাদের সাথে অবিচার করা হয়েছে। করোনাভাইরাস তো কোনো প্রবাসী তৈরি করেনি। এটা মহান আল্লাহর কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার সাথে মুখোমুখি হয়ে আমাদের সকলকেই জয়ী হতে হবে। বেশি দিন করোনা থাকবে না, আল্লাহ পাকের রহমতে করোনা একদিন চলে যাবে। কিন্তু প্রবাসী ভাইদের মনে রয়ে যাবে নানা দুঃখ কথা। এ থেকে আমাদের সকলকে পরিত্রাণ পেতে হবে। প্রবাসী ভাইদের শ্রদ্ধা ও সম্মানের আদরে রাখতে হবে।

আরেকটা কথা বলা খুবই দরকার। প্রবাসীদের নিয়ে যখন কেউ কিছু লিখে বা কটূ কথা বলে তখন প্রবাসীদের মতো আমারও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই প্রবাসীদের কটুক্তি করেছেন। যার জন্য প্রবাসীদের মনে কাঁটা তারের মতো বিঁধেছে। প্রতিবাদ করবেন ভালো কথা, কিন্তু সেটা যেন হয় মার্জিত। অশ্লীলতা দিয়ে কোনো কিছুর সমাধান হয় না। ৮-১০ জন প্রবাসীর এমন অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ প্রতিবাদ করার কারণে গোটা প্রবাসীদেরকে সমাজের সাধারণ মানুষের চোখে আপনারাই তো হেয় করে দিচ্ছেন? সেটা কি কখনো একবার নীরবে ভেবে দেখেছেন? তাই আপনাদের কাছে বিশেষ অনুরোধ আপনারা সাধারণ মানুষের কাছে হাসির পাত্র না হয়ে আপনাদের স্থান যেন আমাদের কাছে মর্যাদার ও সম্মানের হয়। সেই মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব কেবলই আপনাদের। 

আমি দেখেছি, অসহায়ত্বের জাঁতাকলে দুমড়ে-মুচড়ে যেতে মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা অনেক প্রবাসীর স্বপ্ন। অকালে চলে যেতে দেখেছি অনেক যুবকের তাজা প্রাণ। সাগরপথে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে সলিল সমাধি হয়েছে অনেক প্রবাসীর। অনেকেই প্রবাসে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। যাদের অনেক মৃত্যুর খবর পত্রিকার পাতায় ছেপেছি। যাদের বুকভরা স্বপ্ন ছিল একদিন তারা পরিবারকে টানাটানির সংসার থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেস্তে যায় সাগরের পানির ঢেউয়ের সাথে। দেশ ও পরিবারের সমৃদ্ধির জন্য সুদূর বিদেশের মাটিতে উপার্জন করেও তাদের মনে প্রতিনিয়ত বয়ে চলে বেদনার নীল স্রোত। সবাইকে সুখী রাখার প্রতিজ্ঞা নিয়ে যে ছেলেরা পাড়ি দিচ্ছে নিষ্ঠুর পৃথিবীর করুণার রঙ্গমঞ্চে, সেই প্রবাসীর না বলা কথাগুলো কেউ জানতে চায় না। কেউ জানার চেষ্টাও করে না।

প্রবাসীরা পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তিল তিল করে সব বিলিয়ে দেন অকাতরে। পরিবারের ওপর বিশ্বাস রেখে সবকিছু করে যান। জীবনের সব উপার্জন দিয়েও নিজের বা পরিবারের জন্য কোনো স্থায়ী সংস্থান করতে পারেন না ৯০ ভাগ প্রবাসী। প্রবাসের উপার্জন দিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে তারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। পরিবারের স্বচ্ছলতাসহ সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে নিজ মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটাতে হয় প্রবাসজীবন। হয়তো একেই বলে এক ধরনের দেয়ালবিহীন কারাগার। প্রবাসে সবাই ব্যস্ত যে যার কাজে। সবার একই চিন্তা কিভাবে বেশি উপার্জন করা যায়। অনেক প্রবাসীরা প্রবাসে একটি রুমে কষ্ট করে পর্যায়ক্রমে রাত্রি যাপন করেন। অনেকে আছেন যারা ঘরে কোনোদিন এক গ্লাস পানিও হাতে নিয়ে খাননি। অথচও সেখানে গিয়ে রান্না করে কোনোমতে দিনযাপন করছেন। শুধু সংসার এবং দেশের দিকে চেয়ে।

মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানদের মান অভিমান পূরণ করতে গিয়ে তারা ভুলে যান নিজের শখ। আর প্রবাসীদের তার আপনজন বা প্রিয়জন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-শুভাকাঙ্খিরা কষ্ট দিলে সেটা সহ্য করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে। আমাদের দুটি চোখ একটুখানি সুখ দেখার জন্য অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। দুঃখ নিয়ে বিলাসিতা করার সুযোগ তাদের নেই। তাদের দুঃখের কথা শুনুন এবং জেনে রাখুন যারা প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার লড়াই করে। যারা সুখের তরে সুখ হারায় ওদের কথা জেনে রাখা খুবই জরুরি কারণ ওদের ত্যাগ তিতিক্ষার ফসল হলো দেশবাসী আপনজনের মুখের নির্মল হাসি।

সত্যি কথা বলতে কি, প্রবাসীর কষ্ট প্রবাসী ছাড়া আর কেউ বোঝে না। আমি এসব কেন লিখছি? কেন প্রবাসীদের প্রতি আমার এই দুর্বলতা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো আমি তাদের পরিবারের একজন সদস্য। কারণ আমার পরিবারের তিনভাই প্রবাসে রয়েছেন। অন্যদিকে আজ প্রবাসীরা বিপদে পড়েছেন বলে তাদেরকে বিভিন্ন উপায়ে আরো নিগৃহীত করা হচ্ছে। অথচও আমাদের দেশে যে সময়গুলোতে দুর্যোগ আসে তখন আমরাই বারবার বিভিন্ন দুর্যোগের ছবি দিয়ে স্ট্যাটাসে লিখে তাদের সাহায্য কামনা করি। এবং অকপটেই তারাও হাত বাড়িয়ে দেন মানবতার কল্যাণে। অথচও আজ যখন তারাই বিপদগ্রস্ত তখন আমরাও তাদেরকে বিভিন্নভাবে অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করছি। অন্যথায় তাদেরই বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে করছি। আমরা অনেকেই অভিযোগ করছি, তারা করোনা আক্রান্ত। অথচও প্রবাসীদের আসার ১৪ দিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বেশিরভাগ জায়গাতেই কোনো সংক্রমণ হয়নি।

অন্যদিকে আমরা সবাই জানি, প্রবাসীরা ছুটি পান না। এখন যখন বিশ্বের সবকটি দেশ লকডাউন অবস্থায় তখন আমাদের এই যোদ্ধারা লম্বা একটি ছুটি পেয়েছেন। জীবনকে ঝুঁকি রেখেই বিদেশ থেকে দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বিদেশের এয়ারপোর্ট যেন সংক্রমিত না হয়। এজন্যই তাদেরকে পরীক্ষা করেই এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ বহির্গমন প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। এক্ষেত্রে আমাদেরও বুঝতে হবে, ওই দেশে থাকলেই আমাদের ভাইয়েরা সংক্রমিত নন। কিন্তু দেশের কথা ভেবে তারা সঙ্গরোধ (হোম কোয়ারেন্টিন) মানছেন। তবে এক্ষেত্রে তো কিছু ব্যতিক্রম থাকবেই।

এজন্য একতরফা কাউকে দোষারোপ না করে বরং বিষয়টি সহানুভূতির সাথে দেখলে আমি যেমন উপকৃত হবো আপনি তেমনি উপকৃত হবেন এবং দেশের রেমিট্যান্সের গতিও ঠিক থাকবে। অন্যদিকে আমাদের দুর্যোগে যেমন তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আসুন আমরাও তাদের এই বিপদের সময় অন্তত মুখের কথা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াই। তারা আমাদের কাছে অর্থ চান না। বরং শুধু একটু ভালোবাসা চান তাদের এই বিপদকালীন সময়ে।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই আমাদের অর্থনীতির চাকা হয় বেগবান। আমরা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছি। শ্রদ্ধা ও সম্মান করা উচিত সকল প্রবাসী ভাইদের। করোনা নামক ভাইরাসের কারণে আজ সমগ্র পৃথিবী নিরব ও নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। এ যেন চারিদিকে কবরের নিস্তব্ধতা। দিন দিন মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। এ থেকে মহান আল্লাহ পাক যেন আমাদের সকলকে ও প্রবাসী ভাইদেরকে হেফাজত করেন। আমরা কামনা করি, ভালো থাকুক প্রবাসীর জীবন এবং ভালো থাকুক প্রবাসের মাটিতে আমাদের সকল প্রবাসীরা। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা