kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

কৃষ্ণপক্ষের দিন

মিনহাজ আল দিন, বার্লিন (জার্মানি) থেকে   

২৭ মার্চ, ২০২০ ০৯:৩৪ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



কৃষ্ণপক্ষের দিন

সবচেয়ে জরুরি দূরত্ব বজায় রাখা

একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর যেন বেঁচে আছি আমরা, অপেক্ষা করছি ঘুম ভাঙার। বার্লিনের মতো দিনরাত এক করে জীবনকে উদযাপন করতে পারার মতো শহরে আজ যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। এই যুদ্ধ এক অদেখা শিকারির সাথে, যার শিকার হবার ভয়ে খোদ জার্মান চ্যান্সেলর কোরেন্টিন হয়ে আছেন, আইসোলেশনে আছেন বিটেনের প্রিন্স চার্লস। জার্মানিতে করোনায় মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। যে কিনা দুনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা অনুপাতে সর্বনিম্ন মৃত্যুহার (মাত্র ০.৪%)। এখানে বলে রাখা উচিত, এই সাফল্য এসেছে ৬০০০ ইতালীয়র জীবনের মূল্যে। তারা ভুল করেছে, আমরা সেই ভুল দেখে শিখেছি। এই ভুলটা ইতালিও করতোনা যদি চীন থেকে সঠিক তথ্য সারাবিশ্বে সরবরাহ করা হতো। মৃত্যুহার নিয়ে লুকোচুরি না করা হলে সারা দুনিয়া এটাকে শুরুতেই সিরিয়াসলি নিতো এতে কোনো সন্দেহ নেই। স্বাধীন মত প্রকাশের দেশে আর দমনমূলক শাসনব্যবস্থায় করোনায় মৃত্যুহার দূরকম দেখা যাচ্ছে, যাতে এটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে কখনো কখনো তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করার মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে।   

এখানে আমি স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে আছি আজ অষ্টম দিন। আট দিন আগে আমার এক পর্তুগীজ বন্ধু আমার বাসায় আসে, যাকে পরদিনই কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়। কারণ তার এক সহপাঠীর শরীরে ভাইরাস মিলেছে। জার্মানির কোভিড-১৯ মোকাবেলায় এ যাবত যেটুকু সাফল্য মিলেছে তার রহস্য হলো ব্যাপক টেস্ট আর দ্রুত তদন্ত করে রোগীর সংস্পর্শে আসা সবাইকে ট্র্যাক করে ফেলা। এরপর শুরু হয় ১৫ দিনের কোয়ারেন্টিন। আমাকে কেউ কোনো বিধি-নিষেধে না ফেললেও উদ্ভুত পরিস্থিতিতে শুধু সুপারশপে যাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজে বেরুচ্ছিনা। রাস্তা-ঘাট সব ফাঁকা, তাই বেরুলেও মনে হয় অচেনা কোনো গ্রহে এসে পড়েছি। কোথাও কোনো পুলিশও নজরে আসে না আর। এখানে এখন প্রযুক্তি করছে পুলিশের কাজ। এই সংকটে সবাই সবাইকে দারুণভাবে সাহায্য করছে, নিজ ঘরে থেকে। একটা জাতি কতটা কেয়ার করলে অন্যের অসুবিধার কথা ভেবে নিজেদের ঘরে বন্দী করে ফেলতে পারে ভাবা যায়! 

আমার চোখে সবার আগে চোখে পড়ে বাসের ড্রাইভারদের সাথে যাত্রিদের দূরত্ব তৈরি করার প্রয়াস। এখানে প্রতিটি বাসে ২-৩ টি দরজা থাকে। এর ভেতর বাসে ওঠার জন্য সাধারণত প্রথম দরোজাটি ব্যবহার হতো যেন ড্রাইভার টিকেট চেক করতে পারেন। সাবধানতা অবলম্বনের জন্যে প্রথম দরজায় ব্যবহার করা বন্ধ ছাড়াও ড্রাইভারের সাথে সুস্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে কিছু বাসে প্রথম সারিতেও যাত্রী পরিবহন না করে একটি লাল টেপ দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। কারণ একজন ড্রাইভার আক্রান্ত হওয়া মানে তার মাধ্যমে আরো বহু যাত্রী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবে। কাজেই জার্মানি সবার আগে যাদের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে, তাদের সুরক্ষিত করছে। কোনো বাস-ট্রেনে টিকেট চেকিং করছে না কেউ। কোনো পুলিশ অভিযোগ না পেলে রাস্তায় টহলে নামছে না। কেননা এদের সমাজে দশ যায়গায় যাওয়া লাগে পেশাগত কারণে, তাই এরাই হবে ভাইরাসের বাহক! সাবওয়ে ট্রেনে দেখলাম হাতের ছোঁয়া ছাড়াই সব ট্রেনের দরজা খুলে যাচ্ছে, যেন এক সুইচ বার বার স্পর্শ না করে মানুষ। 


বাসের সামনের দরজাটি বন্ধ

রাষ্ট্র এখানে শুধু মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখছে না, বরং সামাজিক নিরাপত্তার চাদরে আগলে রাখছে। যেন এক টাইম মেশিনের চাবি ঘুরিয়ে যাবতীয় বিল, দায়-দেনা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-অ্যাসাইনমেন্ট সব পিছিয়ে দিয়েছে ১-২ মাস। ক্ষতিগ্রস্থ সকল কম্পানিকে দেয়া হবে আর্থিক সহায়তা। এমনকি শিক্ষার্থী ও সমাজের সব স্তরের মানুষ সংকট মোকাবেলায় বিনা জামানতে স্বল্প সুদে পাচ্ছে ঋণ! সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসার জন্য তৈরি রয়েছে ২৬ হাজারের বেশি আইসিইউ ইউনিট। ডাক্তার আর নার্সদের নিরাপত্তাকে দেয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব। তাদের প্রোটেকটিভ স্যুটের পাশাপাশি অতিরিক্ত বেতন ভাতা দেয়া হচ্ছে এবং তাদের জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত ফ্রী করে দেয়া হয়েছে রাজধানী বার্লিনে। 

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সকল ক্লাব, বার, রেঁস্তোরা, গির্জা, মসজিদ, মন্দিরসহ ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটেও যে কোনো জমায়েত নিষেধ। শুধু তাই নয়, দুজনের বেশি একসাথে দেখা গেলে ২৫ হাজার ইউরো বা টাকার অংকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন জারি করা হয়েছে। শুধুমাত্র জরুরি পরিষেবা এবং সুপারশপগুলো খোলা রয়েছে মানবিক দিক বিবেচনায়। তবে সেখানেও দূরত্ব বজায় রাখতে নির্দিষ্ট দূরত্বে লালটেপ দিয়ে দাগ দিয়ে দেয়া হয়েছে। যেন কেউ কারো খুব কাছে সে অন্যকে ঝুঁকিতে না ফেলেন। প্রতিটি পণ্য একজন ক্রেতা একের অধিক যেন কিনতে না পারেন সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। এছাড়াও জরুরি ও অপরিহার্য পণ্য দেয়া হচ্ছে বিশেষ মূল্যছাড়। অন্যের বিপদকে নিজের উন্নতির সিঁড়ি না বানিয়ে, অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মতো সদাচারন এখানে না আসলে হয়তো দেখার সৌভাগ্য হতো না। 

এমন ক্রান্তিকালেও সব সমাজেই কিছু মানুষ থাকে যারা দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করে। ব্যাপারটা কষ্টের হলেও সত্যি যে জার্মানিতে সেই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আমি দেখেছি আমাদের মতো অভিবাসী বিশেষ করে মুসলিম কমিউনিটির কিছু মানুষের ভেতর। আমরা আমাদের বিশ্বাস নিয়ে অতি উৎসাহি হয়ে শুরুতেই গ্লোবালি বিষয়টাকে চীনাদের ওপর একপ্রকার স্রষ্টার শাস্তি হিসেবে দেখেছি অনেকে। ফলাফল হলো- এমন এক কুসংস্কারে আমরা আটকে গেছি অনেকে যে, ন্যুনতম প্রোটেকশন হিসেবে মাস্ক বা হাঁচি-কাশির সময় সাবধানতা অনেকে অবলম্বন করছি না। ভাবটা এমন যেন ভাইরাস আমরা মুসলিম দেখে আমাদের গায়ে আসবে না। এমনকি বাসে ট্রেনে দুজনের বেশি জমায়েতের নিয়মটাও অনেকে ভুলে যাচ্ছেন এবং আগের মতোই দেখা হবার পর কোলাকুলির রীতি অব্যাহত রাখছেন! 

বার্লিনে শুধুমাত্র টার্কিশ কম্যুনিটির সদস্য আছেন ৩ লাখের ওপর। বাকি সব দেশ থেকে আসা মুসলিমদের কথা না হয় বাদই দিলাম। আমি যে কয়দিন বেরিয়েছি সাম্প্রতিক সময়ে, প্রতিদিন সাবওয়েতে মুসলিমদের দেখেছি জটলা পাকিয়ে আড্ডা দিতে এবং ভয়ংকরভাবে মাস্ক বা হাত দিয়ে মুখ না ঢেকে হাচি দিতে। পুরো ট্রেনের মানুষসহ আমরা তটস্থ হয়ে যাই সেই হাঁচি দেখলে। কিন্তু এদের কোনো বিকার নেই! আমার সামনে এক জার্মান মহিলা একজনকে খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বললেন এভাবে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে অন্যদের ঝুঁকিতে না ফেলতে। ভদ্রলোক বিষয়টা বুঝতে পেরে নেমে পড়লেন পরের স্টেশনে। এখানে আক্রান্ত কারো ব্যক্তিগত তথ্য জানা না গেলেও বিটেনে আক্রান্তদের ভেতর ২৫% মুসলিম যাদের অধিকাংশ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন মসজিদ থেকে, যদিও বিটেনের জনসংখ্যার মাত্র ৪% মুসলিম!  


কেউ চাইলেই যত ইচ্ছা পণ্য নিতে পারবেন না, নোটিশ সাঁটিয়ে দেয়া হয়েছে

এরপর আসি বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যাপারে আমাদের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা। আটা-ডিম-দুধ সবই পাওয়া যায় সুপারশপে। কিন্তু চালের তাকে চাল খুঁজে পাই না গত এক সপ্তাহ। বলাবাহুল্য এদেশের খাদ্যাভ্যাসে ভাতের চল নেই খুব একটা। আমরা এশীয়রাই ভাত খাই বেশি। আর দেশে মজুতদারীর দূরাবস্থা দেখে সন্দেহের তীরটা স্বদেশীদের দিকেই চলে যাচ্ছে মন না চাইলেও। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ যেখানেই যায়, দেশের সুরভী ছড়ায়। সেই সুরভীতে এই ক্রান্তিকালে যেন আমাদের টেকা দায়! আমরা নিজেরাই নিজেদের কম্যুনিটিকে বিপদে ফেলছি আমাদের দরকারি খাবার-পণ্য মজুত করে।  

পুরো জার্মানি সারা দুনিয়ার সাথে এক হয়ে ঘরে বসে অপেক্ষা করছে এই কৃষ্ণপক্ষের দিন পার করার জন্য। ভুলে গেলে চলবে না, মুখে মাস্ক পরা মানেই আমরা সুরক্ষিত নই। সুরক্ষার পূর্বশর্ত হলো দূরত্ব! সারা দুনিয়াকে কাছে টেনে আনার প্রচলিত ব্যবস্থায় এক ভূমিকম্প যেন এই করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাস দেখিয়ে দিয়েছে শুধু একটি জাতিও যদি এর কবলে পড়ে, তবে সারা দুনিয়া এর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই আমাদের চীন, ইতালির ভুলগুলো থেকে শিখতে হবে, শিখতে হবে জার্মানি-বিটেন ও আমেরিকার সাফল্য থেকে। চীনের কঠোর লকডাউন পদ্ধতি থেকেও শেখার আছে আমাদের। এই পদ্ধতি অবলম্বন করেই তারা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্যখাতে আরো গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও নৈতিকতা আর সামাজিক আচার-ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। করোনা আক্রান্তের সাথে যারা যারা মেলামেশা করেছেন বা যোগাযোগ হয়েছে সরাসরি, এদের সবাইকে ট্র্যাক-ডাউন করতে হবে এমনভাবে যেন এরা 'শীর্ষসন্ত্রাসী'। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা নয়, কোয়ারেন্টিন করতে হবে রোগীর সাথে সংস্পর্শ হলেই! এই ভাইরাস যদি বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়ায় তবে তার দায় শুধু বিদেশ ফেরত মানুষের নয়, এই দায় তাদেরও যারা শহর ছেড়ে দলে দলে গ্রামে গেছেন । 

সমগ্র মানবজাতির এখন ঘরে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। ছক্কার গুটি এখন প্রকৃতির হাতে, আর সেটা আমাদের হাতে আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, একটি ভ্যাকসিন যতদিন বিজ্ঞানীরা বের না করতে পারে ততদিন পর্যন্ত। ততদিনে এই দূষিত গ্রহকে আবার দাবি করবে প্রকৃতি। মানুষ বুঝবে, এই গ্রহটিকে সে যেভাবে তছনছ করে দিচ্ছিল, আসলে এর কোনো অধিকারই তার ছিলো না। মানুষ কেবল বাস্তসংস্থানে তার ভূমিকা পালন করে মাত্র। সেই বাস্তুসংস্থানের অন্য সদস্যরাও এই গ্রহের মালিক। এখন মানুষ হিসেবে দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই যারা আছি, আমরা কেবলই অপেক্ষা করতে পারি এই কৃষ্ণপক্ষ পার হবার জন্য। দুই সপ্তাহে হয় এক কৃষ্ণপক্ষ, এরপর প্রকৃতির নিয়মেই এই আঁধার ফুঁড়ে বাঁধ ভাঙবে চাদের হাসি। শর্ত একটাই, যদি আমরা একে অন্য থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে সবাই সবার পাশে দাঁড়াতে পারি।  ভালো থেকো বাংলাদেশ, ভালো থাকুক পৃথিবী। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা