kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মা সরস্বতীর ল্যাপটপ ও এক টুকরো শাহবাগ

নিবেদিতা রায়   

১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ১৪:০৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মা সরস্বতীর ল্যাপটপ ও এক টুকরো শাহবাগ

সেদিন বীণার তারে অনেকটা সময় ধরে মা সরস্বতী অনুশীলন শেষে ভাবলেন, আর মাত্র কিছুদিন পরেই মর্ত্যে পুজো নিতে যাবার সময় হয়ে এসেছে। এই সময়টা মায়ের খুব পছন্দের। প্র্রায় সারা বছর তিনি এই বিশেষ তিথি ও ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করেন। প্রত্যেক বছরে নির্দিষ্ট তারিখে পুজো হবার তো সুযোগ নেই, সবকিছুই গ্রহ নক্ষত্রের ওপরে নির্ভর করে। আসলে তিনি কিংবা তার মতো দেবতাদের যতোই ক্ষমতা থাক না কেন, এই ব্যাপারগুলো অন্য বিভাগের হাতে নির্ধারিত হয়। যেমন আকাশের গায়ে এক ফালি বাঁকা চাঁদের হাসি দেখবে বলে প্রতীক্ষায় থাকা মানুষরাও জানে না চাঁদ মামার আজ উঁকি দেবার কথা থাকলেও সবসময় উঁকি দেবে কিনা। তাই অনেক সময় পরের দিন ঈদ হবে কি না সে জন্য টেলিস্কোপের আশ্রয় নিতে হয়। 

যাকগে সেসব, মাতা সরস্বতী তাঁর বাহন রাজহংসকে ডেকে পাঠালেন, এই শ্বেতশুভ্র বিচক্ষণ প্রাণিটিকে তিনি বড় ভালোবাসেন। অবশ্য অনেকেই মুখ বেঁকিয়ে বলে থাকেন বিদ্যার দেবী আর কোনো প্রাণীকে বাহন করতে পারতেন! কেন যে, প্যাঁক প্যাঁক করতে থাকা এই হংসই তাঁর বাহন হলো কে জানে বাবা! মা ভাবেন, এই মহাত্ম যদি জানতে রে মূর্খের দল, তবে কি এমন কথা বলতে পারতে তোমরা! হংস হলো একমাত্র সেই প্রাণী যে জলে ও ডাঙায় সমানভাবে ভাসতে-চলতে পারে। অর্থাৎ জলে থাকা অবস্থায় হংস জলের ওপরে শরীরের অর্ধেক আর নীচে অর্ধেক নিয়ে বিচরণ করে। শুধু তাই নয়, দুধ আর জল মিশিয়ে দিলে সে শুধু দুধটুকুই টেনে নেয় জল নয়। সমাজের শিক্ষিত, বিদ্বান, বিবেকবান ব্যক্তিমাত্র মন্দ-ভালোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে জানেন, হংসের ন্যায়। আশা করা হয় শিক্ষিত ব্যক্তি খারাপটুকু ত্যাগ করে দুধের মতোই ভালো নির্যাসটুকু আস্বাদন করে। এসব চিন্তা করতে করতে কখন যে রাজহংস কক্ষে উপস্থিত হয়েছে মাতা টেরই পেলেন না।

রাজহংসের ডাকে মা সরস্বতী চিন্তা থেকে বাস্তবে ফিরে এলেন। রাজহংসকে দেখে বললেন, প্রস্তুত হও প্রিয়, মর্ত্যে যাবার সময় হয়েছে। রাজহংস প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে বললো, এবার বাপু আমাকে নয় পঙ্খিরাজকে বাহন করে মর্ত্যে যাও মা। রাজপথে বড় বিপদ, পথে পথে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। নদী পথে যে যাবো তারও কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদী হয় মরে গেছে, নয়তো দূষণে কালো নর্দমায় পরিণত হয়েছে। ওই সব কুৎসিত নোংরা জলে আমি তোমাকে নিয়ে সাঁতার দিতে পারবো না, আমায় ক্ষমা করো এবারের মতো। মাতা সরস্বতী অবাক হয়ে বললেন, ১৪৪ ধারা জারি করেছে মানে? তারা কী জানে না সেদিন আমার পুজো। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওই একদিনই আমি অবস্থান করি। বিশেষত আমার প্রিয় জগন্নাথ হল এবং তিলত্তমা ঢাকার প্রতিযোগিতামুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেদিন আমার বড়ো ভালো লাগে। সকাল থেকে সমস্ত প্রতিযোগিতা ছেড়ে, পিঠে বইয়ের পাহাড় ছেড়ে মা-বাবারা সাদা-হলদে পোশাক পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়েদের হাত ধরে আমার সাক্ষাৎ করতে আসে। জগন্নাথ হলের কথা কি আর বলবো! কি হিন্দু কি মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ছোট, বড়, সাবেক, বর্তমানের ভিড়ে সকাল থেকে রাত অবধি এমন সর্বজনীন উৎসব নববর্ষের পরে আর ক’টা আছে? কিন্তু হংস, কোন বেরসিক সেদিন ১৪৪ ধারা জারি করেছে, কোন অশিক্ষিত সেদিন এই আয়োজনের পেছনে বলো, আমায় বলো। হংস বললো এই হলো তোমায় নিয়ে আমার সমস্যা। মা, লেখাপড়া আর গবেষণা নিয়ে তুমি এতো ব্যস্ত থাকো যে, নিজের ল্যাপটপ আজকাল খুলবার সময় তোমার নেই। তোমার ফেসবুক, ইউটিউবে, মেইলে মর্ত্যে থেকে কতো অনুরোধ, চিঠি এসে জমা পড়েছে। ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ জনতা, ভক্ত, অভক্ত, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবিরা তোমার কৃপা পেতে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

মাতা সরস্বতী ততক্ষণাৎ ল্যাপটপ খুলে দেখলেন অবিশ্বাস্য সব দৃশ্য। উত্তর ঢাকা ও দক্ষিণ ঢাকার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সরস্বতী পুজোর দিন অনুষ্ঠিত না করার দাবিতে ছেলেমেয়েরা শাহাবাগ, রাজু মঞ্চে আমরণ অনশন করছে। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তবু বোকা ছেলেমেয়েরা খাবার মুখে নেয়নি, হাসপাতালে যায়নি। অগত্যা সেখানেই স্যালাইন লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সহমত পোষণ করেছে। কিছু গণমাধ্যমে, টিভির পর্দায় বিভিন্ন তর্কবাগিশ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বিভিন্ন পেশার মানুষেরা নির্বাচন ও পুজো একদিনে হবার যৌক্তিকতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আক্কেলের দফা রফা করছে। কিন্তু কী এক আজব একগুঁয়ে জিদের কারণে পাথর সমান অনঢ় নির্বাচন কমিশন। হাইকোর্টের রায় হয়তো তাকে আরো শক্ত হয়ে থাকার উৎসাহ যুগিয়েছে। মাতা সরস্বতী হঠাৎ আরো একবার অবাক হয়ে দেখলেন টিভি পর্দায় একজন একপেশে সহমত পোষণকারী সংবিধানের বিভিন্ন ধারা উপধারার ব্যাখা দিয়ে ইসির বিরোধিতা করছেন। মাতা আরো বিস্মিত হলেন যখন দেখলেন দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দৌড়ে নিজেদের নাম লেখানো দৌড়বিদেরাও বলছে নির্বাচন আগে কিংবা পরে হলে সমস্যা নাই, এই কথামালা আর সহমত চা বিক্রি করার থেকেও আকর্ষণীয় লাগছে। 

মাতা সরস্বতী অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন, সব সহমত পোষণকারীরা আজ এক কাতারে সহমত দেখাচ্ছে। এটি কি প্রথম সর্বভারতীয় আন্দোলন সিপাহী বিদ্রোহের মতো নতুন কোন চেতনার আন্দোলন! কিন্তু এই চিন্তার শেষে তিনি পরিণত কোন ব্যাখা পেলেন না। কারন বহুদিন ধরে তিনি লক্ষ্য করেছেন, সব রাজনীতির মধ্যে 'পলিটিক্স' ঢুকে যাচ্ছে। সব থেকে বুদ্ধিমান, বিদ্বান মানুষগুলো অত্যন্ত অবিবেচক এবং অন্যায় কাজগুলো করে। হংসতত্ত্ব সেখানে পরাস্ত। মা ভাবছেন, কি করা যায়! বছরে একদিন মর্ত্যের মাটিতে তিনি আর আসবেন কি না! অতঃপর মা সরস্বতী ভাবলেন আগামীকাল তিনি পংঙ্খিরাজে শাহাবাগ, রাজুমঞ্চ, জগন্নাথ হল প্রাঙ্গন স্বচক্ষে প্রদক্ষিণ করবেন।

লেখক: শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা