kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

যখন বন্দি ছিলাম

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:২১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যখন বন্দি ছিলাম

স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত আকাশ দেখছেন মিয়াজী

একাত্তরে চার মাস যশোর ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যুদ্ধবন্দি থাকার পর অর্ধমৃত অবস্থায় মুক্তি পান মঈনুদ্দিন মিয়াজী। তাঁর সেসব দুঃসহ দিনের কথা শুনে এসেছেন ফখরে আলম

মঈনুদ্দিন মিয়াজী বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর ছিলেন। একাত্তরে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তরুণ যুবকদের সংগঠিত করেছেন। বিভিন্ন জনসমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। এ কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর ওপর চালায় নির্মম অত্যাচার।

বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন
অ্যাডভোকেট মঈনুদ্দিন মিয়াজী ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে বিপুল ভোটে বৃহত্তর যশোর জেলার ঝিনাইদহ-মহেশপুর আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন। তিনি যশোর শহরের রেলগেট এলাকায় বাস করতেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেডিওতে মিয়াজী বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনেন। ৮ মার্চ তিনি মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর থানায় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। এই পতাকা তিনি আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী আ. রহিমের মাধ্যমে ঢাকা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এরপর তিনি যশোর শহরে এসে বেনাপোলসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার পক্ষে বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য দেন। ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করেন। যশোরের বিক্ষুব্ধ মানুষ ক্যান্টনমেন্টের পানি ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মঈনুদ্দিন মিয়াজীকে বাসা থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। তাঁরই বুকে মাথা রেখে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান আরেক যুদ্ধবন্দি অ্যাডভোকেট মশিয়ূর রহমান (এমএনএ)। মিয়াজীর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী চাঁদ সুলতানাও বিহারি আর পাকিস্তানিদের নির্যাতনে ২৩ এপ্রিল দুটি শিশুসন্তান রেখে মারা যান। মিয়াজীর শরীর থেকেও রক্ত ঝরেছে, পুঁজও পড়েছে। হাজার ওয়াটের আলো তাঁর চোখে ধরে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা করে দেওয়া হয়।

এখন তাঁর বয়স ৮৪ বছর। দুঃসহ সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মঈনুদ্দিন মিয়াজী ভারী চশমা খুলে চোখ মুছলেন। কাঁদলেনও। বললেন, ‘২৬শে মার্চ ভোর ৫টার দিকে যশোর ক্যান্টনমেন্টের কর্নেল তোফায়েলের নেতৃত্বে কয়েক গাড়ি পাকিস্তানি সেনা আমার বাড়ি ঘিরে ফেলে। কোনো সময় না দিয়ে চোখ বেঁধে আমাকে গাড়িতে তোলে। আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী চাঁদ সুলতানা গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েন। আমার পাঁচ বছরের শিশুকন্যা মেরী, সাত বছরের ছেলে সালাউদ্দিন খুবই কান্নাকাটি করে। কিন্তু কোনো কান্নায়ই হানাদারদের মন গলেনি। গাড়ির সামনে শুয়ে থাকা আমার স্ত্রীকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে আমাকে ষষ্ঠীতলা পাড়ায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেককে আটক করে আমার মতো তাঁরও চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলা হয়। এরপর আমাদের দুজনকেই ক্যান্টনমেন্টের দাউদ পাবলিক স্কুলের ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে রাখা হয়। এই বন্দিশালায় আমার সঙ্গে অ্যাডভোকেট মশিয়ূর রহমানের দেখা হয়। মশিয়ূর ভাই বলেন, রাত সাড়ে ৩টায় ওরা আমাকে জজ কোর্টের পাশে আমার বাসা থেকে ধরে এনেছে।

ভয়াবহ নির্যাতন
২৭ মার্চ আমাদের চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্ট প্রাইমারি স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ৪ এপ্রিল থেকে আমাদের ওপর শুরু হয় নির্যাতন। আমাদের সকালে পাশের খড়বাগানে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সেনারা ক্রলিং করায়। তারা বলত, ‘বাঙালি গাদ্দার হ্যায়। পানি, খাবার বন্ধ।’ ক্রলিং করতে করতে হাঁপিয়ে গেলে তখন জানোয়াররা আমাকে ও মশিয়ূর ভাইকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত বুট দিয়ে লাথি মারত। মোটা লাঠি দিয়ে পেটাত। রক্তে আমাদের জামাকাপড় ভিজে যেত। আমরা মলমূত্র ত্যাগ করে দিতাম। কিন্তু আমাদের ওরা পানি খরচেরও কোনো সুযোগ দিত না। জামাকাপড়ের রক্ত শুকিয়ে যেত। তা-ও ধুতে দিত না। নির্যাতনে আমার পিঠের তিনটি হাড় ভেঙে যায়। মশিয়ূর ভাই খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নিজ হাতে ভাত খাওয়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। আমিই তাঁকে ভাত খাইয়ে দিতাম। তাঁর মুখ দিয়ে প্রায় সময়ই রক্ত বের হতো। আর আমার শরীর দিয়ে বের হতো পুঁজ। মনে হতো, যেকোনো সময় মারা যাব। একপর্যায়ে ২৩ এপ্রিল রাত ৮টার সময় মশিয়ূর ভাই আমার কোলে মাথা রেখে মারা যান। হানাদাররা আমার কক্ষ থেকে অজ্ঞাত স্থানে মশিয়ূর ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে যায়।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে
‘আমাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয় ১৪ মে। সেখানে আমাকে পাকিস্তানি সেনাধ্যক্ষ রাও ফরমান আলির সামনে হাজির করা হয়। এখানে আমার সঙ্গে হাজি গোলাম মোর্শেদের দেখা হয়। তিনি বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর ও ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। আগারগাঁও ক্যাম্পে আমার ওপর ফের নির্যাতন শুরু হয়। আমি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ি। হানাদাররা আমার ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ও বাঙালিদের খুব গালাগাল করত, দম্ভ দেখাত। ২ জুলাই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়।’ মুক্তি পেয়ে মঈনুদ্দিন মিয়াজী পাবনায় গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু একপর্যায়ে তাঁর নাম প্রকাশ পেয়ে যায়। তিনি জানতে পারেন, হানাদাররা তাঁকে আটক করার জন্য খুঁজছে। মিয়াজী তখন পাবনার ভাঙ্গুড়ায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করেন। কয়েক দিন পর সেনাবাহিনী ভাঙ্গুড়ার বাড়িতেও হামলা চালায়। মিয়াজী সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে যান। তাঁর হাটার শক্তি ছিল না। তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে তাঁর পীর খেতাবউদ্দিন আহমেদের রংপুুরের বাড়ি গিয়ে ওঠেন। পীরের একজন মুরিদ হিসেবে তাঁর বাড়িতে কৃষকের ছদ্মবেশে দিন কাটাতে থাকেন। এ সময় তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। এ প্রসঙ্গে মিয়াজী বললেন, ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমার স্ত্রীকে আটকের জন্য কয়েকবার অভিযান চালিয়েছে। বিহারিরা আমার স্ত্রীকে নানাভাবে নির্যাতন করেছে। তিনি রেলস্টেশন মাদরাসার মুহাদ্দিস হাসান যশোরীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ৪ এপ্রিল হানাদাররা রেলস্টেশন মাদরাসায় হামলা চালিয়ে ২৩ জন নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে। আমার স্ত্রী কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে সেখান থেকে পালিয়ে কেশবপুরে গিয়ে আশ্রয় নেন। ২৩ এপ্রিল সেখানে তিনি মারা যান। এদিকে আমার স্ত্রী ও সন্তানরা জানত, হানাদাররা আমাকে মেরে ফেলেছে।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর
দেশ স্বাধীন হলে আওয়ামী লীগের নেতারা মঈনুদ্দিন মিয়াজীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকায় নিয়ে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করেন। ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি  সেখানে ভর্তি ছিলেন। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর আসার খবর পেয়ে তিনি রেসকোর্স ময়দানে যান। মঈনুদ্দিন মিয়াজী বললেন, ‘রেসকোর্স মাঠে গিয়ে দেখি হাজার হাজার উত্ফুল্ল জনতা। আমি মঞ্চে গিয়ে উঠি। বঙ্গবন্ধু আমাকে তাঁর কাছে ডেকে নেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘আমি তোর খবর পেয়েছি। তোর ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। তোর বউ মারা গেছে। আমাদের এই স্বাধীনতা অনেক কষ্টের।’ ১২ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন মনসুর আলী হেলিকপ্টারযোগে আমাকে পাবনা নিয়ে আসেন। ১৫ জানুয়ারি আমি যশোর আসি। ছেলে-মেয়ে কোথায় তা জানি না। কয়েক দিন পর আমার সাত বছর বয়সী ছেলে সালাউদ্দিন (এখন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মুন্নুজান মেরীকে কেশবপুরের এক আত্মীয়বাড়িতে খুঁজে পাই।’ মঈনুদ্দিন মিয়াজীর একাত্তরের ওই দুঃসহ বন্দিজীবন সম্পর্কে তাঁর ছেলে মেজর জেনারেল (অব.) সালাউদ্দিন বললেন, ‘একাত্তরে সাত বছর বয়সে আমি মাকে হারিয়েছি। আমার মা বাংলাদেশের জন্য জীবন উত্সর্গ করেছেন। আমরা ভেবেছিলাম, হানাদাররা বাবাকেও মেরে ফেলেছে। আমি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তাম। কোরআন পাঠ করে বাবার জন্য দোয়া করতাম। অত্যাচারের শিকার অসুস্থ বাবাকে ফিরে পেয়ে কেঁদেছি। বাবা এখনো অসুস্থ। পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচারে তিনি ঠিকমতো চোখে দেখতে পান না। আমরা তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতি চাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা