kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

পঞ্চগড়ে বসেই দেখুন কাঞ্চনজঙ্ঘা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৮:১৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পঞ্চগড়ে বসেই দেখুন কাঞ্চনজঙ্ঘা

ছবি : কালের কণ্ঠ

পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই দেশের গণ্ডিতেই দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের দ্বিতীয় উচ্চতম ও পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বত শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। দেশের একমাত্র হিমালয় কন্যা পঞ্চগড় থেকেই ছবির মতো চোখের সামনে সবুজের মাঝে ভেসে উঠা শ্বেত শুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য দেখার সুযোগ মিলছে। প্রতিবছর শীতের এই সময়টিতে হিমালয়ের এই পর্বত চূড়া দেখা গেলেও তাতে প্রকৃতি কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। শর্ত হলো মেঘমুক্ত, কুয়াশামুক্ত গাঢ় নীল আকাশ। এমন আবহাওয়াতেই চমৎকার ভাবে ভেসে উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা। সেই সাথে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি অঞ্চলও কালো পাহাড়ের মতো ভেসে উঠে। দেশের চৌকাঠ পেরিয়ে পাসপোর্ট ভিসা করে যাদের এই পর্বতটাকে দেখার সৌভাগ্য হয় না তারা শীত এলেই পঞ্চগড়ে ছুটে আসেন এক পলক এই কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোহর দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। তবে কুয়াশাযুক্ত আকাশ আর ভাগ্য সহায় না থাকলে অনেককে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়।

প্রকৃতিতে চলছে হেমন্তকাল। হেমন্তের এই সময়টিতেই পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থান দেখে খালি চোখেই হিমালয় পর্বতমালার দ্বিতীয় উচ্চতম ও পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বত শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তাই পঞ্চগড়কে হিমালয় কন্যা বলা হয়ে থাকে। পঞ্চগড়ের প্রায় সব জায়গা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলেও সবচেয়ে ভাল করে উপভোগ করা যায় তেঁতুলিয়ার মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত জেলা পরিষদের ঐতিহাসিক ডাকবাংলো থেকে। মাউন্ট এভারেস্ট ও কে-২ এর পরেই কাঞ্চনজঙ্ঘার অবস্থান। পর্বত চূড়াটির কিছু অংশ ভারতের সিকিম ও কিছু অংশ নেপালে অবস্থিত। 

স্থানীয়রা জানান, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হালকা শীতে পরিষ্কার আকাশে এই পর্বত চূড়া দেখা যায়। উত্তরে চোখ গেলেই দেখতে পাবেন খোলা মাঠের ফাঁক দিয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্বেত শুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্যের আলোর সাথে সাথে কখনো শুভ্র, কখনো গোলাপি, আবার কখনো লাল রঙ নিয়ে হাজির হয় বরফে আচ্ছাদিত এই পর্বত চূড়া। কাঞ্চনজঙ্ঘার বিস্ময়কর এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে শীত এলেই ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমিরা। এ বছরের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার (৫, ৬ ও ৭ ডিসেম্বর) সবচেয়ে ভালো করে দেখা গেছে হিমালয়ের এই চূড়া। 

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, তেঁতুলিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক ডাকবাংলোতে অনেক পর্যটকের ভিড়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকেই বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে পঞ্চগড়ে ঘুরতে এসেছেন। ডাকবাংলোটি মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। নদীটির ওপারেই ভারত। এপার থেকেই তারা কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য উপভোগ করছেন। কেউবা পর্বত চূড়ার সাথে নিজেকে ছবিবন্দি করছেন। কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্চ এই চুড়া দেখতে সামর্থ্যবানরা ছুটেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা শহরের টাইগার হিল। দার্জিলিং-এর টাইগার হিলই কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া দেখার সবচেয়ে আদর্শ জায়গা। আবার কেউ কেউ যান সান্দাকপু বা ফালুট। আবার কেউ কেউ সরাসরি নেপালে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশে নিজের মতো করে দেখা সুযোগ কেবল পঞ্চগড় থেকেই মিলছে। 

স্থানীয়রা জানান, পাহাড়টির সৌন্দর্য উপভোগ করার মোক্ষম সময় ভোর এবং বিকেল বেলা। ভোরে আলো ফুটতেই তা গিয়ে পড়ে ঠিক কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় গিয়ে। এদিকে চারপাশে তখনে আবছা অন্ধকার থাকলেও চকচক করে চূড়াটি। ভোরের আলোয় এবং বিকেলে পর্বত চূড়াটি পোড়া মাটির রঙ নেয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে কিছু ঝাপসা হয়ে আসে। তখন রং হয় সাদা। দূর থেকে মনে হয় এ যেন আকাশের গায়ে এক খন্ড বরফ। পর্বত চূড়াটির নিচ দিয়েই কালো রঙে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি এলাকা দেখা যায়। সন্ধ্যায় দার্জিলিংয়ের জ¦লে উঠা বাতিগুলোও এখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। পাহাড়টি উপভোগ করতে তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসন একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করেছে। 

এছাড়া পঞ্চগড়ের নানা পর্যটন কেন্দ্রগুলো প্রকৃতিপ্রেমিদের বাড়তি খোরাক জোগায়। পুণ্ড, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলিম শাসনামলের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জনপদ। সেই সঙ্গে রয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দেশের সর্ব উত্তরের শেষ সীমান্ত বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, জিরো পয়েন্টের জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনি, সমতল ভ‚মির চা বাগান, মোগল স্থাপনা মির্জাপুর শাহী মসজিদ, বোদেশ^রী পীঠ মন্দির, দেড় হাজার বছরের পুরনো মহারাজা দিঘি, ভিতরগড় দুর্গ নগরী ও দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর পঞ্চগড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলো মধ্যে অন্যতম। পর্যটনের সব উপাদান মিলে অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে দিন দিন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পঞ্চগড়ের কদর বাড়ছে। 

ঢাকা উত্তরা থেকে ঘুরতে আসা সোহরাব হোসেন বলেন, সত্যিই চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা ভেসে আছে ভাবতেই পরছিনা। একদিকে সীমান্ত নদী মহানন্দা আর মহানন্দার তীরে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা উপভোগ করার মজাই আদালা। 

বগুড়া থেকে আসা আব্দুল রশিদ বলেন, শীতের এই সময়টিতে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় এই খবর শুনে পরিবার নিয়ে এসেছি। খুব ভালো লাগলো পবর্ত চূড়ার অপরূপ সৌন্দর্য দেখে। সেই সাথে আমরা পঞ্চগড়ের সমতলের চা বাগান, বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট, মহারাজার দীঘিসহ সকল পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখেছি। সব মিলে পঞ্চগড়ের অপরূপ প্রকৃতি আমাদের মুগ্ধ করেছে।  

পাবনা থেকে আসা হাবিবুর রহমান বলেন, এমন বিস্ময়কর সৌন্দর্য আমি আগে কখনো দেখিনি। গত কয়েকদিন আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় পর্বত চূড়াটি দেখা যায়নি। আমরা ভাগ্যবান যে এমন দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছি। 

তেঁতুলিয়া বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, পরিষ্কার মেঘমুক্ত আকাশেই কেবল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তাই অনেক সময় খুব আগ্রহ নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এসে অনেককেই নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। তবে এবার অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অনেক বার চমৎকারভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেছে। 

ঠাকুরগাঁও থেকে আসা মুশরাত জাহান নিলা বলেন, পঞ্চগড়ের বিশেষত্ব হলো এখান থেকেই হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। এজন্যই বোধহয় পঞ্চগড়কে হিমালয় কন্যা বলা হয়ে থাকে। মজার বিষয় হলো অনেকেই পাসপোর্ট ভিসা করে ভারতে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে আসে। কিন্তু আমরা আমাদের দেশের ভেতর থেকেই এই পর্বত চূড়ার সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পেলাম।   

জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, শীতের এই সময়ে দূর দূরান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। এই সময়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা চমৎকারভাবে দেখা যায়। সেই সাথে পঞ্চগড়ের সমতলের চা শিল্পসহ অনেক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। পর্যটকরা যেন নির্বিঘ্নে তাদের ভ্রমণ উপভোগ করতে পারে আমরা সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এছাড়া পর্যটকদের থাকার জন্য তেঁতুলিয়া ডাক বাংলোতে পুরনো দুটি ভবনের পাশাপাশি বেরং কমপ্লেক্স নামে নতুন আরেকটি বাংলো নির্মাণ করা হয়েছে। আশা করি পর্যটকরা পঞ্চগড়ে তাদের ভ্রমণ উপভোগ করতে পারবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা