kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

টিন তারকা

দেখিয়ে দিল তাম্মাত

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:৪১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেখিয়ে দিল তাম্মাত

তাম্মাত বিল খয়ের। বয়স ১৮ ছুঁই ছুঁই। সাইকেলে চেপে ভ্রমণ করেছে ৬৪ জেলা। এখানেই শেষ নয়, পায়ে হেঁটে গেছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। তার সঙ্গে কথা বলেছেন জুনায়েদ হাবীব

বয়স তখন ১২ বছর, বিটিভির পর্দায় ইত্যাদির এক আয়োজনে দেখল এক বৃদ্ধ সাইকেলে চেপে ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেছেন। সেই থেকে এমন একটা কিছু করার চিন্তা তাম্মাতের মাথায় এলো। একদিন বাবার কাছে বায়না ধরল, তারও একটি সাইকেল চাই। ছেলের পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে সাইকেল কিনে দেননি বাবা। শেষ পর্যন্ত সাইকেল কিনতে পারল ২০১৬ সালে। ওটা নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে শুরু করে। যোগ দেয় বন্দরনগরীর এক সাইক্লিং কমিউনিটিতে। এভাবেই সাইক্লিং জগতে প্রবেশ তাম্মাত বিল খয়েরের। 

২০১৭ সালের ৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত মাত্র ২৪ দিনে ৬৪ জেলায় সাইকেল চালিয়ে সবাইকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেয় চট্টগ্রামের এ তরুণ। বলা হয়, এটাই সবচেয়ে কম সময়ে সাইকেলে গোটা বাংলাদেশ ভ্রমণের রেকর্ড। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছে। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন অর্জনের অর্ধশতাধিক সম্মাননা তাম্মাতের বাসার দেয়ালে ঝুলছে। 

তাম্মাত জানাল, ৬৪ জেলা ভ্রমণের সময় বাসার কাউকেই না জানিয়ে মধ্যরাতে সাইকেল ও ভ্রমণের রসদ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। কারণ ও জানত, পরিবারের লোকজন কিছুতেই সম্মতি দেবে না। শুরুতে সবাই বেশ রাগ করলেও এখন অবশ্য তাম্মাতকে নিয়ে গর্বই করে।

‘যখন রেকর্ডটা হয়ে যায়, তখন বাসায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তবে আমার মনে হয়, এত কম বয়সে কারোরই ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। আমি একটু বেশিই উৎসাহী ছিলাম কি না!’

এদিকে গত ৮ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ৬৪ জেলা মাত্র ১৫ দিনে সাইকেলে ভ্রমণ করে নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙেছে তাম্মাত। তাম্মাতের সার্বিক সহযোগিতার জন্য ৬৪ জেলা ভ্রমণের সময় একটি বাইকে করে তার পেছনে সাপোর্ট টিমও ছিল। ওই সময়কার সাইক্লিং রাইডগুলো তাম্মাত তার নিজের নামের ফেসবুক পেজটিতে সরাসরি সম্প্রচার করেছিল। সেখানে গেলে পাওয়া যাবে ভিডিওগুলো।

অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তাম্মাত বলল, ‘যখন আমি ৬৪ জেলা ভ্রমণে ছিলাম, বিভিন্ন জেলার মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করেছে। অনেকে আমাকে আপ্যায়ন করেছে। তাদের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ। অনেকে আমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

হেঁটে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
মুক্তিযোদ্ধা নানা খলিলুর রহমান ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ হেঁটেই এসেছিলেন, সেই গল্পটা একবার তাম্মাত বিল খায়ের তার মায়ের মুখ থেকে শোনে। তাম্মাত সেটিও শোনার মধ্যে আবদ্ধ রাখল না। ভাবতে লাগল, কিভাবে এমনভাবে হেঁটে ভ্রমণ করা যায়? অবশেষে একদিন নিজেই ঠিক করল, সে-ও যাবে এমন ভ্রমণে।

তাম্মাত দেশের দক্ষিণের সর্বশেষ ভূখণ্ড টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে প্রায় ১০০০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে উত্তরের সর্বশেষ ভূখণ্ড তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট (টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া) হেঁটে পৌঁছে মাত্র ২৪ দিনে। যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালের ১৮ জুন আর শেষ হয় ১১ জুলাই। এত বিস্তর পথ মাত্র ২৪ দিনে পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাম্মাত বলে, ‘হেঁটে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যাওয়াটা যে সহজ হবে না, সেটা আমি আগেই জানতাম। তবু আমার মনোবল ছিল শক্ত। সফরের প্রথম ছয় দিনে পায়ের অবস্থা এত খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে রীতিমতো ভয় পেয়ে যাই, যাত্রা শেষ করতে পারব তো! তবু নিজের পায়ের দিকে না তাকিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটেছি।’

এ সফরে একা থাকলেও মানসিকভাবে হাজারো মানুষ তাম্মাতকে সহযোগিতা করেছে। একটি ঘটনা তাম্মাতের বেশ মনে পড়ে, ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় হেঁটে সফর করার সময় ২২তম দিনে পঞ্চগড়  পৌঁছি। তার আগের দিন আমার সফর নিয়ে দু-তিনটি পত্রিকায় নিউজ করা হয়। সেটা আমি জানতাম না। হঠাৎ এক ভদ্রলোক আমাকে রাস্তায় দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন। প্রথমে তাঁকে খেয়াল না করে মহাসড়কে হাঁটতে থাকি। পেছনের দিকে তাকাতেই দেখি দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি আমার কাছে আসছেন! জানালেন, গতকালই আমার ব্যাপারে পত্রিকায় পড়েছেন। তিনি একজন শিক্ষক। সড়কে দাঁড়িয়ে কথা হলো কিছুক্ষণ। কথা শেষে তিনি আমাকে ছাড়তে নারাজ! তাঁর ঘরে নিয়ে যাবেন। পরে তাঁর বাসায় গিয়ে দেখি চমৎকার একটি বাগান গড়েছেন, যেখানে আছে প্রায় ২৫ প্রজাতির আমসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। স্যার জোর করে তাঁর বাসায় দুপুরের খাবার খাওয়ান। সেই মুহূর্তটা অনেক আনন্দদায়ক ছিল।’

‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া হেঁটে যাত্রা করার  উদ্দেশ্য ছিল আমার নানার গল্পটি তরুণ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেওয়া ও হাঁটাহাঁটির প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করা। আমাদের সবার প্রতিদিন অন্তত তিন-চার কিলোমিটার হাঁটা উচিত।’ জানায় তাম্মাত।

সচেতনতা
সাইক্লিং কিংবা নানা রেকর্ড গড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধতা রাখেনি তাম্মাত। তার প্রতিটি ভ্রমণে কোনো না কোনো সচেতনতার বার্তা নিয়ে পৌঁছেছে প্রতিটি জেলার দ্বারে দ্বারে। ২০১৮ সালে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া হেঁটে ভ্রমণের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষকে নিয়মিত দুই কিমি হাঁটায় উদ্বুদ্ধ করাসহ বাল্যবিয়ে রোধে সাইকেলে চেপে ক্যাম্পেইন ও ২০১৯ সালে ৬৪ জেলায় ভ্রমণের মধ্য দিয়ে দেশের প্রতিটি স্কুলে ইমার্জেন্সি স্যানিটারি নেপকিন বক্স স্থাপনে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে তাম্মাত।

লক্ষ্য এবার আয়রনম্যান!
অসংখ্য অর্জন আর সাফল্যের পর এবার ২০২০ সালে মালেশিয়ায় আয়রনম্যান নামের আন্তর্জাতিক এক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার লক্ষ্য ঠিক করেছে। এ প্রতিযোগিতায় ১৭ ঘণ্টার মধ্যে ৩.৮ কিমি সাঁতার, ১৮০ কিমি সাইক্লিং ও ৪২.২ কিমি দৌড় সম্পন্ন করতে পারলেই আয়রনম্যান খেতাব পাওয়া যায় বলে জানাল তাম্মাত। তার ইচ্ছা, বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বদরবারে একজন অ্যাথলেট হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। তবে এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এ কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে তার অংশগ্রহণের বিষয়টি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা