kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

বায়োনিক চাইল্ড : ঘুম-খিদে পায় না, চোট-আঘাতেও ব্যথা লাগে না তার!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ১৬:২৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বায়োনিক চাইল্ড : ঘুম-খিদে পায় না, চোট-আঘাতেও ব্যথা লাগে না তার!

১০ বছর বয়সী অলিভিয়া ফ্রান্সওয়ার্থ এক বিস্ময়বালিকার নাম। জন্মের পর থেকেই একের পর এক চমক নিয়ে যেন অপেক্ষা করে আছে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের হাডার্সফিল্ডের এই খুদে বাসিন্দা। রহস্য যে কিছু আছে, অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন অলিভিয়ার মা নিকি ট্রেপাক। যখন তিনি দেখেছিলেন তার ৯ মাস বয়সি মেয়ে আদৌ ঘুমোয় না। খিদে-তৃষ্ণা-ঘুম বা ক্লান্তি; কোনো বোধই তার নেই। 

ভারতের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ৩৫ বছর বয়সী নিকির আরো চার সন্তান আছে। তাদের সবার বয়স এখন সাত থেকে পনেরো বছর। কিন্তু সবার থেকে আলাদা তার চতুর্থ সন্তান অলিভিয়া। মায়ের মনে হতো, অলিভিয়া যেন ইস্পাত দিয়ে তৈরি। তার খিদে পায় না। ঘুমের জন্য বায়না নেই। এমনকি, ব্যথা পেয়েও কাঁদে না। চলছিল এভাবেই। কারণ, আর যাই হোক, মেয়ের কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছিল না। একদিন নিকির কাছে ফোন এল স্কুল থেকে। অলিভিয়া তখন নার্সারির পড়ুয়া। স্কুল থেকে জানাল, সে পড়ে গিয়েছে। তার দাঁত ঠোঁটের মধ্যে ঢুকে গেঁথে রয়েছে। আহত ও রক্তাক্ত অলিভিয়াকে ডাক্তার বোঝাতে বসলেন, কাকে বলে প্লাস্টিক সার্জারি। কারণ সে যাত্রা ওই অস্ত্রোপচার ছাড়া তার গতি ছিল না। কিন্তু ডাক্তারের সামনেই অলিভিয়া তার ঠোঁটের ছিন্ন অংশ ধরে টানতে লাগল! ডাক্তার অলিভিয়ার মাকে বললেন, তার শিশুর মধ্যে অবশ্যই কোনো অস্বাভাবিকতা আছে।

এরপরেও যে চমক অপেক্ষো করে ছিল, তার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না নিকি। একদিন তার চোখের সামনে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হল ছোট্ট অলিভিয়া। প্রথমে গাড়ির ধাক্কা, তারপর ওই গাড়িই তাকে টেনে নিয়ে গেল বেশ খানিকটা দূরে। আতঙ্কে দিশেহারা নিকি এবং তার বাকি সন্তানরা তখন চিত্কার করে কাঁদছে। কিন্তু তাদের হতভম্ব করে কিছুক্ষণ পরে নির্বিকারভাবে ফিরে এল অলিভিয়া! দেহে আঘাতের চিহ্ন আছে। কিন্তু চোখমুখে কষ্ট বা ব্যথার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। দুর্ঘটনায় অলিভিয়ার মারাত্মক আঘাত লেগেছিল। পায়ের পাতা এবং পশ্চাদ্দেশে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সে কিছু টেরই পায়নি! ডাক্তারও হতভম্ব! জানালেন, অলিভিয়া যদি ভয় বা ব্যথা পেত, তা হলে আঘাতের মাত্রা আরও অনেকগুণ বেশি হত।

এই ঘটনার পর চিকিৎসায় জানা যায়, অলিভিয়া বিরল জিনগঠিত অসুখে আক্রান্ত। ক্রোমোজোমের সেই অবস্থার জন্য তার ব্যথার অনুভূতি, খিদে-তৃষ্ণা বা ঘুমের অনুভূতি কিছুই নেই। ডাক্তারি ভাষায় এ অসুখের নাম ‘ক্রোমোজোম সিক্স ডিলেশন’। আর এই বিরল অসুখের শিকার বলে অলিভিয়া হল ‘বায়োনিক চাইল্ড’। বিশ্বে প্রতি দু’শ জন শিশুর মধ্যে একজন এই বিরল রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু তার মধ্যেও রকমফের আছে। কারো কারো মধ্যে বিরলতার মাত্রা অতিরিক্ত হয়। অলিভিয়া সে রকমই একজন। সে কার্যত একজন অতিমানবীয় শিশুতে পরিণত হয়েছে।

অলিভিয়ার মা নিকি জানান, অলিভিয়া টানা তিন দিন না ঘুমিয়ে থাকতে পারে। স্কুলে যাওয়ার পরে অলিভিয়াকে প্রথম হাই তুলতে দেখেছেন নিকি। খিদা-তৃষ্ণা বোধও তার বিশেষ নেই। মা নিকিই নির্দিষ্ট সময় অন্তর তাকে খাবার দেন। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে অলিভিয়ার বায়নার শেষ নেই। মিল্ক শেক, চিকেন নুডলস খেতে একটু আধটু ভালোবাসে।

অলিভিয়ার ঘটনাকে বিরলের মধ্যে বিরলতম বলতে চান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স’র বিভাগীয় প্রধান মৈনাক সেনগুপ্ত। তার কথায়, এক সঙ্গে খিদে-তৃষ্ণা-ঘুম-ব্যথা, সব অনুভূতি লোপ পেয়েছে, এমন ঘটনা বিশ্বে আর কারো মধ্যে দেখা যায়নি। অলিভিয়ার অদ্ভুত শারীরিক অবস্থার কারণ অনুসন্ধান এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা বলে জানিয়েছেন তিনি। মানবদেহের ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের প্রত্যেকটির দু’টি অংশ। ‘পি’ আর্ম ও ‘কিউ’ আর্ম। এর মধ্যে একটিতে কোনো বিচ্যুতি হলেই দেখা দেয় জিনগত জটিলতা।

এখনো পর্যন্ত বিশ্বে ১৫ হাজারের বেশি জিনগত জটিলতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। তার মধ্যে মাত্র একশো জন ‘সিক্স পি ডিলেশন’র শিকার। অর্থাৎ, ক্রোমোজোমের ছয় নম্বর জোড়ার পি বাহু অসম্পূর্ণ। কিন্তু তাদের মধ্যে একমাত্র অলিভিয়া খিদে-তৃষ্ণা-ঘুম-ব্যথার অনুভূতিহীন। তা ছাড়া, আমাদের দেহে ব্যথার অনুভূতি বোধ করা নির্ধারণ করে মূলত ক্রোমোজম দুই। সে ক্ষেত্রে কিন্তু অলিভিয়ার সমস্যা নেই। তারপরেও তার দেহে যন্ত্রণার বোধ নেই। অসঙ্গতি আছে অন্যত্রও। মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্রোমোজোম ছয়ের এমএইচসি যৌগ। অলিভিয়ার দেহে এই ক্রোমোজোমের গঠন ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু সে অস্বাভাবিক হলেও অসুস্থ নয়। অর্থাৎ তার দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েনি। ফলে জিন-রহস্যের অনেকটাই যে এখনও রহস্যাবৃত, সেটাই প্রমাণ করছে অলিভিয়া। সেরকমই ধারণা মৈনাক সেনগুপ্তর।

অলিভিয়াকে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরাতে চেষ্টা করছেন তার মা। এরই মধ্যে চিকিৎসায় কিছুটা সাড়াও দিয়েছে সে। ধীরে ধীরে তার মধ্যে ফিরছে শ্রান্তির অনুভূতি। বাড়ছে ঘুমনোর সময়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা