kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

আগামী বছর মহালয়ার ৩৬ দিন পর দুর্গাপূজা!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:১৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আগামী বছর মহালয়ার ৩৬ দিন পর দুর্গাপূজা!

প্রতি বছরই মহালয়ার সাত দিনের মাথায় মহাসপ্তমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু আগামী বছর এই নিয়মের ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে। মহাসপ্তমীর তিথি এক মাসেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত হবে সপ্তমীর পূজা। বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। এমন আবার হয় নাকি? একেবারেই যে হয় না, সেটা কিন্তু ঠিক নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২০ সালে মহালয়া হবে ১৭ সেপ্টেম্বর ভোরে। ওই দিনই পিতৃপক্ষ শেষ হয়ে শুরু হয়ে যাবে দেবীপক্ষ। আর অক্টোবরের ২৩ তারিখে হবে মহাসপ্তমী।

তাহলে প্রশ্ন এসেই যাচ্ছে, কেন এই ঘটনা হবে? এটা কোনো দৈবিক ঘটনা কিংবা অলৌকিক ব্যাপার স্যাপার নয়। একেবারেই প্রাকৃতিক কারণে এটা হতে যাচ্ছে, যার কারণ বের করেছে বিজ্ঞান। সৌর ও চন্দ্র বছরের দৈর্ঘের ব্যবধানকে মিলিয়ে দেওয়ার কারণেই ঘটে এই ঘটনা। আর পূজা-পার্বণের দিনক্ষণ, তিথি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু মিলে থাকে ধর্মবিশ্বাস, কিছু সংস্কার আর দীর্ঘ দিনের চালু প্রথা; তাই সেগুলি সহায়ক হয়ে ওঠে এই ঘটনাগুলি ঘটানোর জন্য।

কেন এই ঘটনা ঘটতে চলেছে?

২০২০ সালে মল চন্দ্র আশ্বিন মাস শুরু হচ্ছে মহালয়ার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে। সেই মল চন্দ্র আশ্বিন মাস শেষ হবে অক্টোবরের ১৬ তারিখে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, মল মাসে বিয়ে, উপনয়ন, জমি কেনা কিংবা কোনো পূজা, পার্বন বা উৎসব সবই নিষিদ্ধ। দুর্গা পূজা হয় মল চন্দ্র আশ্বিনে কখনই হতে পারে না। শুদ্ধ চন্দ্র আশ্বিন মাসেই দেবীকে নাইওর আনতে হবে। 

পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টারের প্রধান সঞ্জীব সেন বলেছেন, 'চলতি শতাব্দীতে এই ঘটনা এর আগে একবারই ঘটেছিল। আজ থেকে ১৮ বছর আগে। ২০০১ সালে। সে বারও মহালয়ার দিনটি ছিল ১৭ সেপ্টেম্বর। আর মহাসপ্তমীর দিনটি ছিল ২৩ অক্টোবর। ব্যবধানটা ছিল সেই ৩৬ দিনের। এই শতাব্দীতে এই ঘটনা আবার কবে ঘটবে, তা জানতে হিসাব নিয়ে বসতে হবে। তবে গত শতকে এমন ঘটনা ঘটেছে কিনা তা নিশ্চিত না।'

হিন্দু শাস্ত্রে মল মাস বলতে কী বোঝায়?

এটা বোঝার জন্য আগে জানা দরকার, অমাবস্যা আর পূর্ণিমা কখন হয় আর কীভাবে হয়? অমাবস্যার দিন প্রদক্ষিণ করতে করতে সূর্য আর পৃথিবীর মাঝে চলে আসে চাঁদ। অমাবস্যার সময় চাঁদ আর সূর্য একই সঙ্গে ওঠে আর ডোবে। ফলে, দিনে সূর্যের চোখ ঝলসে দেওয়া আলোয় চাঁদ যেমন হারিয়ে যায়, তেমনই রাতে একই সঙ্গে ডুবে যাওয়ার ফলে সূর্যের আলো চাঁদের পিঠে প্রতিফলিত হলেও রাতের আকাশে চাঁদ দৃশ্যমান হয় না। তাই, আমাদের রাতের আকাশে নেমে আসে জমজমাট অন্ধকার।

পূর্ণিমার দিন ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে। পৃথিবী চলে আসে চাঁদ আর সূর্যের মাঝখানে। সে ক্ষেত্রে সূর্য ডুবলে চাঁদ ওঠে। পরের দিন সূর্য ওঠার সঙ্গ‌ে সঙ্গেই চাঁদ ডোবে। তাই সারা রাত চাঁদের আলোয় ঝকমকিয়ে ওঠে। একটি সৌর মাসে সাধারণত, একটি অমাবস্যা আর একটি পূর্ণিমা হয়। একটি অমাবস্যা থেকে পরের মাসের অমাবস্যার দিনটিতে পৌঁছতে সময় লাগে গড়ে সাড়ে ২৯ দিন। একই সময় লাগে একটি পূর্ণিমার তিথি থেকে পরের মাসের পূর্ণিমার দিনটিতে পৌঁছতে।

সৌর ও চন্দ্র বছরের দৈর্ঘের পার্থক্য ১১ দিনের

এই সময়টাকে ধরে পার্থিব মাসের হিসাব কষা হলে আমরা তাকে বলি, 'চন্দ্র মাস'। তার মানে, চন্দ্র মাসের দৈর্ঘ গড়ে সাড়ে ২৯ দিন। ফলে, এক চন্দ্র বছরে হয় ১২x২৯.৫ দিন = ৩৫৪ দিন। এটাই বিজ্ঞানের পরিভাষায়, 'লুনার ইয়ার'। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর বছরের হিসাব কষা হচ্ছে চাঁদ ও পৃথিবীর অবস্থানের নিরিখে। পৃথিবীকে চাঁদের প্রদক্ষিণের নিরিখে।

আরও এক ভাবে পার্থিব বছরের হিসাব কষা হয়। তাকে বলা হয় সৌর বছর বা 'সোলার ইয়ার'। সূর্যকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ করতে যে সময় লাগে, তার ভিত্তিতে। সেই সময়টা কিন্তু ৩৬৫ দিন। ফলে, চন্দ্র বছরের দৈর্ঘের সঙ্গে সৌর বছরের দৈর্ঘের পার্থক্যটা থেকে যায় ১১ দিনের। এই সৌর বছরের হিসাবের ভিত্তিতেই ইংরেজি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে সংশোধন করে চালু হয়েছিল গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। সেই ক্যালেন্ডারে 'লিপ ইয়ার'-এর বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেটা ১৫৮২ সাল। সেই ক্যালেন্ডার ফের সংশোধিত হয় ১৭৫২ সালে। সেটাই আধুনিক ইংরেজি ক্যালেন্ডার।

সৌর মাসের সুবিধা আর চন্দ্র মাসের অসুবিধা

সৌর বছরের হিসাবে একটা সুবিধা রয়েছে যা চন্দ্র বছরের হিসাবে নেই। কোনো সৌর বছরে যদি জানুয়ারিকে শীতের মাস বলে ধরা হয়, তাহলে ৫০০ বছর পরেও শীত আসবে জানুয়ারিতেই। যার মানে, বিভিন্ন মৌসুমের সঙ্গে সৌর বছরের মাসের হিসাব মিলে যায়।কিন্তু চন্দ্র বছরের সঙ্গে তা মিলে না। সৌর বছরের তুলনায় চন্দ্র বছরে ১১টি দিন কম হয়। ফলে তিন বছরে সেই পার্থক্যটা দাঁড়ায় ৩৩ দিনের। তিন বছর অন্তর সৌর বছরের তুলনায় চন্দ্র বছরে দিনের সংখ্যা এক মাসের কিছু বেশি সময় করে কমে যাচ্ছে। তাই চন্দ্র মাসের হিসাবের সঙ্গে মৌসুমের হিসাব মেলে না।

পৃথিবীর বিভিন্ন মৌসুমের সঙ্গে মাসের সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য হিসাব করে দেখা গেছে, ১৯ বছরে যদি ৭টা করে বাড়তি মাস যোগ করা দেওয়া যায়, তাহলে সৌর ও চন্দ্র বছরের মধ্যে দৈর্ঘের ব্যবধানটা আর থাকে না। তার ভিত্তিতে যে ক্যালেন্ডার বানানো হয়, তাকে বলা হয়, 'লুনি-সোলার ক্যালেন্ডার' বা 'চন্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডার'। তার মানে, গড়ে ২.৭ বছর পর একটা করে মাস যোগ করলে সৌর ও চন্দ্র বছরের দৈর্ঘের ব্যবধানটাকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়।

১৯ বছরে এমন ঘটনা ঘটে ৭টি

মহাজাগতিক এই ঘটনা ১৯ বছরে ৭টি ঘটে। আর তাতে সৌর ও চন্দ্র বছরের দৈর্ঘের ভেদাভেদ আপনা আপনিই মিটে যায়। তার জন্য গড়ে ২.৭ বছরে একটা করে বাড়তি মাস যোগ করতে হয় না। তাই আগামী বছরের মহাসপ্তমীর দিনটি পড়বে শুদ্ধ চন্দ্র আশ্বিন মাসে। ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়া  কারণ ওই দিনটি ভাদ্রের কৃষ্ণ অমাবস্যা। তাই ওই দিনই পালিত হয় মহালয়া। আর মহালয়া থেকে ৩৬ দিনের মাথায় ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে আশ্বিন শুক্ল সপ্তমীর পূজা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা