kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

পানি, বাঁশ আর ‘লম্বা গলা’র চনবুরি

চনবুরি থেকে প্রতিনিধি    

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১১:১২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পানি, বাঁশ আর ‘লম্বা গলা’র চনবুরি

চনবুরি। সংস্কৃত থেকে আসা দুটি শব্দ। চন মানে পানি আর বুরি হচ্ছে শহর। মানে জলের শহর। নামটা যে এমনি এমনি হয়নি তা বোঝা গেল ব্যাংকক থেকে চনবুরি আসার পথেই। পুরো শহরটাই সমুদ্রের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা। চনবুরিতে রয়েছে ছোট-বড় অনেক দ্বীপও। ব্যাংকক সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের এই শহর। এখানেই বসেছে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বের আসর। ২০১৭ সালে গত টুর্নামেন্টটাও হয়েছিল চনবুরিতে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ হকি দল এখানে খেলে গেছে ইনডোর হকি এশিয়া কাপ।

শহর থেকে কিছুটা ভেতরে গেলেই পাওয়া যাবে গ্রামের আবহ। মাইলের পর মাইল আখক্ষেত ও বাঁশঝাড় দেখে মনে হতে পারে বাংলাদেশের কোনো গ্রামের কথা। আছে প্রচুর রাবারগাছ। উৎপাদন হয় কাসাভাও। আর নামই যেহেতু ‘সিটি অব ওয়াটার’ বা জলের শহর, তাই স্বাভাবিকভাবে মাছ শিকার এ প্রদেশের মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস।

চনবুরির সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার ‘কাহো লাম’। প্রথমবার কোনো বাঙালির পাতে এই খাবার পড়লে চমকে ওঠার কথা। এটা পরিবেশন করা হয় বাঁশের খোলে। আঠালো ভাতের সঙ্গে লাল মটরশুঁটি, নারকেল কুচি, নারকেল তেল দিয়ে মাখানো অসাধারণ স্বাদের খাবার। খাবারই থাকে যখন বাঁশের ভেতরে তখন বুঝে নিতে উপায় নেই বাঁশের তৈরি জিনিস কতটা জনপ্রিয় চনবুরিতে। স্বল্প আয়ের মানুষের বাড়ি, আসবাব, ফুলদানি, মেয়েদের হ্যান্ড পার্স পর্যন্ত তৈরি বাঁশ দিয়ে।

মেয়েদের জন্মের পর থেকে গলায় পরানো হয় সোনা কিংবা তামার তৈরি রিং। মেয়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেঁচিয়ে বাড়তে থাকে রিংয়ের আকারও! পূর্ণাঙ্গ বয়সে অনেকের পরে যায় ২০-২৫ প্যাঁচ। মানে লম্বায় হয়ে যায় আধাহাতের বেশি। এতে অস্বস্তি হলেও ঐতিহ্যটা ধরে রেখেছে গ্রামের মেয়েরা।

এই শহর থেকে কিছুটা দূরের গ্রাম ‘লং নেকড কারেন’। মেয়েদের জন্মের পর থেকে গলায় পরানো হয় সোনা কিংবা তামার তৈরি রিং। মেয়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেঁচিয়ে বাড়তে থাকে রিংয়ের আকারও! পূর্ণাঙ্গ বয়সে অনেকের পরে যায় ২০-২৫ প্যাঁচ। মানে লম্বায় হয়ে যায় আধাহাতের বেশি। এতে অস্বস্তি হলেও ঐতিহ্যটা ধরে রেখেছে গ্রামের মেয়েরা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ হওয়ায় তারা ইংরেজি তেমন বোঝে না। একজনের কাছে আকারে ইঙ্গিতে জানার চেষ্টা করলাম এমন ‘লম্বা গলায়’ থাকে কতক্ষণ। উত্তরে যেভাবে হাসল, মনে হলো রিং হয়তো ২৪ ঘণ্টাই থাকে গলায়!

গত কয়েক দিনে এলাকাটা ঘুরে দেখা গেল, নিজেদের বাড়ি যতটা সম্ভব আয়ের উৎস করে রেখেছে স্থানীয়রা। বাড়ির সীমানায় এক কোণে মোটর গ্যারেজ, পাশে খাবারের দোকান। থাইল্যান্ডজুড়ে বাহন হিসেবে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেশি। ছেলে-বুড়ো-নারী সবাই চালায় মোটরসাইকেল। বাংলাদেশের মতো কারো মাথায় অবশ্য হেলমেট পরার বাধ্যবাধকতা নেই। এ প্রচলনের জন্যই চনবুরির অনেক বাড়িতে গড়ে উঠেছে মোটর গ্যারেজ। বয়স্ক মহিলারা মূলত চালান খাবারের দোকান। আমাদের দেশের মতো খাবার তৈরি করা থাকে না আগে থেকে। অর্ডার দেওয়ার পর ক্রেতার সামনেই তৈরি করা হয় খাবার। পর্যটকদের ভাষাটা শুধু বোঝেন না তাঁরা, এটাই যা সমস্যা!

চনবুরির সবচেয়ে বিখ্যাত শহর পাতায়া। পর্যটকদের রীতিমতো ঢল নামে এখানে। তবে পাতায়ার জীবন যতটা উদ্দাম, চনবুরি ততটাই শান্ত। পাতায়া সারা রাত জেগে থাকলেও শান্ত চনবুরি। পাতায়ার মতো পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্র না হলেও চনবুরি ‘দি ইস্টার্ন ইকোনমিক করিডর’-এর অন্যতম অংশ। রায়ং, চেচয়েংসাও প্রদেশের সঙ্গে চনবুরিকে নিয়ে এই অঞ্চল। তারা থাইল্যান্ডের জিডিপিতে অবদান রাখে ১০ শতাংশ। এই তিন প্রদেশের অবকাঠামোর উন্নয়নে ৪৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে থাই সরকার। কৃষিপ্রধান চনবুরিতে এ জন্য শিল্পের ছোঁয়া। গড়ে উঠেছে বেশ কিছু কারখানাও। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শহুরে হাওয়া লাগতে শুরু করেছে তাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা