kalerkantho

পশ্চিমবঙ্গে আমানতি মসজিদের আমানতদার খুলনার এক হিন্দু পরিবার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৭:২৩ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পশ্চিমবঙ্গে আমানতি মসজিদের আমানতদার খুলনার এক হিন্দু পরিবার

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাতের পশ্চিম ইছাপুরের নবপল্লীর সেই 'আমানতি মসজিদ' এর কথা কে না জানে! এক হিন্দু পরিবার মসজিদটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তারা রমজানে নিয়মিত রোজা রাখেন, ইফতার করেন। রোজ সকাল-বিকেল মসজিদে যাওয়া চাই তাদের। তারা সকালে এসে মসজিদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেন। পানি ঢেলে মসজিদ মোছেন। পানির অভাব হলে তারা নিজে বালতি করে পানি এনে মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থা করেন। বারাসাতে দেশান্তরী খুলনার বসু পরিবার অবশ্য কল্পনাও করেনি, তাদের ভাগ্যের সঙ্গে এভাবে জড়িয়ে যাবে একটি মসজিদ। 

দীপক বসু। বয়স এখন ৭০। তার আদিবাস খুলনার ফুলতলার আলকা গ্রামে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাক যুদ্ধের সময় তিনি চলে যান পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাতে। তখন ওখানকার ওই জায়গার মালিক ছিলেন মোড়ল শেখ ওয়াজি উদ্দিন মোল্লা। তাঁর সঙ্গে জমি বিনিময় করেন দীপক বসুর বাবা নীরদ কৃষ্ণ বসু। তিনি একসময় চট্টগ্রামে সরকারি চাকরি করেছেন। তিনিই খুলনার গ্রামের ৭০ বিঘা জমির বিনিময়ে বারাসাতের ১৬ বিঘা জমি পান। আর এই জমিতেই ছিল শত বছরের পুরনো একটি মসজিদ। দীপক বসুর পরিবার মসজিদটি রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

বারাসাত ডাকবাংলোর মোড় থেকে মসজিদটি মিনিট দশেকের পথ। আশপাশে একঘর মুসলমানও নেই। মসজিদের পাশে চলতে-ফিরতে কপালে হাত ঠেকান অমুসলমানরা। কেউ কেউ মসজিদের পাশের পুরনো বাদামগাছটার বাঁধানো বেদিতে মোমবাতি জ্বালান। ইফতারের আগে রাস্তার কল থেকে পানি ভরে আনেন কেউ কেউ।

খুলনার ফুলতলার আলকাগ্রামের বোসেদের জীবনে গভীর ঘা রেখে গিয়েছিল তখনকার ঘটনা। নিজেদের বাঁচাতে টানা ১১ দিন দফায় দফায় পুকুরে ডুব দিয়ে মুখটুকু তুলে লুকিয়ে ছিলেন এ বাড়ির ছেলে মৃণালকান্তি। নীরদকৃষ্ণের সেজ ছেলে নারায়ণকৃষ্ণকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল রাজাকাররা। গলায় দড়ি দেন তাঁর স্ত্রী গৌরী। নীরদকৃষ্ণ ও তাঁর ভাই বিনোদবিহারীর সন্তানরা এর পরেই বারাসাতের ওয়াজুদ্দিন মোড়লের বিশাল সম্পত্তি পাল্টাপাল্টি করে এ পারে চলে আসেন।

বসুদের পারিবারিক সংস্কৃতির সঙ্গেও ক্রমে একাকার এ মসজিদ। এ বাড়ির কেউ মারা গেলে তাঁকে একবার ঠিক নিয়ে আসা হবে এখানে। শ্মশানে শেষযাত্রার আগে আজান দেবেন ইমাম সাহেব। বিয়ের পরে নতুন বউকেও শ্বশুরবাড়ি ঢোকার আগে মসজিদে প্রণাম করতে আসতে হবে। আর এ বাড়িতে নবজাতকের অন্নপ্রাশনের দস্তুর নেই। তার বদলে মসজিদে ইমাম সাহেবের হাতে একটু পায়েস মুখে দেওয়ার রীতি। সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষের উসকানির কাছে হার না-মানা পারিবারিক মূল্যবোধেরও আমানত এই মসজিদ-প্রাঙ্গণ।

দীপক বসুর পুত্র পার্থ সারথী বসু পিতার দেখানো পথে চলছেন। সেও দারুণ ভক্ত মসজিদটির। এবারও তিনি রোজা রেখেছেন। প্রতিবছরই রাখেন। প্রতি শুক্রবার হাজির থাকেন জুমার নামাজে। রমজানে সবার সঙ্গে ইফতারও করেন। মাথায় রুমাল বেঁধে যথারীতি প্রার্থনাও করেন আর সব রোজদারের সঙ্গে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা