kalerkantho

১৫ বছর বয়সে ধর্ষিতা, ১৪ হামলার শিকার, জীবন হাতে লড়ছেন সুনীতা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১০:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১৫ বছর বয়সে ধর্ষিতা, ১৪ হামলার শিকার, জীবন হাতে লড়ছেন সুনীতা

মাত্র ১৫ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু মনোবল ভাঙেনি একটুও। উচ্চতায় মাত্র সাড়ে চার ফুট। কিন্তু কাজে বাঘা বাঘা লোকদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। গড়ে তুলেছেন প্রজ্জ্বলা সংস্থা। পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও স্বীকৃতি। যৌন হয়রানি বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে থাকা এই কাণ্ডারির নাম সুনীতা কৃষ্ণন।

সুনীতার জন্ম ভারতের বেঙ্গালুরুতে, ১৯৭২ সালে। বাবা রাজু কৃষ্ণনের আদরের মেয়ে। সুনীতার ভাষায়, 'আমি ছোটখাটো মানুষ। নিজের উচ্চতা নিয়ে বেশ লজ্জা পেতাম। কিন্তু বাবা একদিন বলেছিলেন মানুষের বাইরেটা দেখে কোনোদিন বিচার করতে নেই। তোমার উচ্চতা কম হতে পারে, কিন্তু সে দিকে মন দিও না। মনের দিক থেকে বড় হওয়ার চেষ্টা কর।' 'বাবার এই কথাটা একদম গেঁথে গিয়েছিল মনের ভেতর', জানালেন সুনীতা।

এর পর থেকেই সমাজে বঞ্চিত, অবহেলিতদের জন্য কিছু করার কথা ভাবেন। মাত্র আট বছর বয়সেই মানসিক প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের নাচ শেখাতে শুরু করেন। ১২ বছর বয়সে বস্তিতে গিয়ে বাচ্চাদের পড়াতেন। ১৫ বছর বয়সে দলিত সম্প্রদায়কে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্য নিও লিটেরাসি ক্যাম্পেন-এর আয়োজন করেন। তাঁর এসব পদক্ষেপ সহ্য করতে পারেননি কিছু মানুষ। তাঁদের মনে হয়েছিল, একজন নারী হয়ে কৃষ্ণন কী করে এতটা পারেন। আট  বিকৃত মনের মানুষ নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে সুনীতাকে। ধর্ষণের পর  মারধর কারণে একটি কানে আজও ভালোভাবে শুনতে পান না সুনীতা।

'প্রথমে বুঝতেই পারিনি, আমার সঙ্গে কী হচ্ছে। যখন বুঝলাম, তখন খুব বিপন্ন বোধ করেছিলাম। একদম গুটিয়ে গিয়েছিলাম। বাবা-মাও আমার পরিস্থিতি বুঝতে পারেননি। আমি খুব সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। ফলে বাবা-মার মনে লোকলজ্জার ভয় সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁরা আমাকে খুব একটা মানসিকভাবে উদ্দীপ্ত করতে পারেননি',- বলেন সুনীতা। তবে এত কিছুর পরও থেমে যাননি। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলেন বাকি জীবনটা কীভাবে কাটাবেন।

প্রথমদিকে বাবা-মায়ের থেকে ভরসা না পেলেও পরে তাঁরা বুঝে গিয়েছিলেন এই মেয়েকে বাড়িতে বসিয়ে রাখা যাবে না। ওঁর মতাদর্শ থেকে টলানো যাবে না। তারপর আর তাঁরা বাধা দেননি।

সুনীতা বলেন, 'জানেন, ধর্ষণের মতো ঘটনা আমাক ভাঙতে পারেনি, বরং আরো বেশি মানসিক জোর দিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার রাস্তাটা ভুল নয়। আমার ভেতর এমন এক রাগ জন্মেছিল, যে তার আগুন এখনও দাউ দাউ করে জ্বলছে। তাই আমার এনজিও'র নাম রেখেছি প্রজ্জ্বলা। এই আগুন আমি কোনোদিনও নেভাতে দেব না।'

স্কুল শেষ করার পর ম্যাঙ্গালোর থেকে সোশ্যাল ওয়ার্ক নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। এর পরই শুরু হয় তাঁর আসল যুদ্ধ।

১৯৯৬ সাল থেকেই সুনীতা রীতিমতো সামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁর জন্য জেলেও যেতে হয়েছিল তাঁকে। সুনীতা বুঝে গিয়েছিলেন তাঁর এই জীবনযাপন বাবা-মা মেনে নিতে পারছেন না। তাই বেঙ্গালুরু ছেড়ে হায়দরাবাদ চলে যান তিনি। সুনীতা বলেন, 'বাবা-মার সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। ওঁরা আমাকে  সমর্থন যেমন করেননি, বাধাও দেননি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম আমি যে লড়াইটা শুরু করেছি, তাতে হয়তো পাশে পাব না তাঁদেরকে। হায়দরাবাদ চলে যাই। এখনো আমার বাবা-মা আমার কাছে থাকেন না। আমার মা মাঝেমধ্যে আসেন। আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করেন। কিন্তু মেনে নিয়েছেন এই একরোখা, জেদি মেয়েকে পাল্টানো যাবে না।'

১৯৯৬ সালেই হায়দরাবাদের রেড লাইট এরিয়া 'মেহবুব কি মেহেন্দি' থেকে সমস্ত বেশ্যাদের উৎখাত করে দেওয়া হয়। সুনীতা তাঁদের আশ্রয় দিতে সেখানেই একটি ট্র্যানসিজন স্কুল খোলেন, যাতে বেশ্যাদের পরবর্তী প্রজন্মের এই একই দশা না হয়। সেই থেকে প্রজ্জ্বলার পথ চলা শুরু।

'প্রথম দিকে প্রজ্জ্বলার খরচ চালাতে আমি নিজের সমস্ত গয়নাগাটি, বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে দিয়েছিলাম। এখন আমরা স্বনির্ভর হতে পেরেছি। তবে এখনো অনেক কিছু করার বাকি। প্রজ্জ্বলা আজ পর্যন্ত ১২ হাজারেরও বেশি মেয়েকে উদ্ধার করেছে নারী পাচারকারীদের হাত থেকে। তাঁদের সমস্ত আর্থিক, মানসিক, আইনি, সামাজিক সাহায্য দেয় প্রজ্জ্বলা। আমরা তাঁদের পড়োশানো শেখাই, হাতের কাজ শেখাই যাতে তাঁরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তবে সবচেয়ে কঠিন কাজ নারী পাচারের ভিক্টিমদের আবার নিজেদের জগতে ফিরিয়ে দেওয়া। তাঁরা যে মানসিক এবং শারীরিক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন, তার থেকে তাঁদের বের করে আনতে অনেক সময় লাগে। অনেকে আবার এই জীবন মেনে নিতে চান না। তাঁদের মনে হয় ওই জীবনই ভালো ছিল কারণ সেখানে তাঁরা আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল। এই মানসিকতা বদলাতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়।'

প্রজ্জ্বলায় এখন প্রায় ২০০ জন কাজ করেন। সুনীতা অবশ্য এর থেকে একটি টাকাও নেন না। ওঁর স্বামী রাজেশ সব সময় শক্ত থাকতে বলেন সুনীতাকে। রাজেশ পেশায় ফিল্মমেকার। প্রজ্জ্বলার জন্যও সিনেমা বানিয়েছেন। সুনীতা বলেন, 'রাজেশ আমার সবচেয়ে বড় চিয়ারলিডার। আমি যখনই দুর্বল হয়ে পড়ি, তখনই আমাকে সাহস জোগায়। একবার রাতারাতি প্রজ্জ্বলার এক ট্র্যানসিজন সেন্টারে এসে দুষ্কৃতকারীরা সবাইকে উৎখাত করে দেয়। এতগুলো মানুষ কোথায় যাবে ভেবেই পাচ্ছিলাম না। রাজেশই বলে জমি কিনে সেন্টার বানাতে। তা হলে আর কেউ যখন তখন আমাদের উঠিয়ে দিতে পারবে না'

সুনীতার ওপর আজ পর্যন্ত প্রায় ১৪ বার আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও সুনীতা তাঁর লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। পুরস্কার, সম্মান পেয়েছেন প্রচুর। পদ্মশ্রী পুরস্কার তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। বলেন, 'আমার পুরস্কার কিন্তু আসলে ওই বাচ্চা মেয়েগুলোর হাসি। ওঁরা যখন ধর্ষণের আতঙ্ক, ক্ষত, অপমান ভুলে, অন্ধকার জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে আবার নতুনভাবে বাঁচার আশ্বাস পায়, তখন মনে হয় এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় আর কিছু হতে পারে না।'  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা