kalerkantho

রিপোর্টারের ডায়েরি

আসেন ভাই, আসেন! আমাদের হীরামন, মানে হীরু আপার খবর!

লায়েকুজ্জামান   

২২ আগস্ট, ২০১৯ ১৮:২৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আসেন ভাই, আসেন! আমাদের হীরামন, মানে হীরু আপার খবর!

আলোচনার সূত্রপাত ঘটালেন মাঝ বয়েসী এক ভদ্রলোক। তার হাতে একখানা কালের কণ্ঠ। পত্রিকার পাতা মেলে ধরে বলে উঠলেন, হিরু আপার খবর-দেখছেননি। সিগারেটে সুখটানের ধোঁয়া ছেড়ে আরেকজনের জোর গলায় জবাব: "কন কি মাস্টার সাব! নিজে তিন খান পত্রিকা কিনেছি, কাজল একখান দিয়ে গেছে। নিউজটা কমপে সাতবার পড়েছি। খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছি। পড়েছি কি না?  মাস্টার সাব, পড়া নিয়ে দ্যাখেন- এ-প্লাস পাবো।" এ কথায় হাসির রোল পড়ে যায়। 

একসঙ্গে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন পনের-কুড়িজন। তাদের উচ্চস্বরে হাসির শব্দে, ‌'কি রে ভাই, কী হলো! আবার এত খুশী ক্যান' বলতে বলতে এগিয়ে এলেন আরো একজন, সঙ্গে আরো কয়েকজন আছে। পত্রিকা দেখে নবাগতদের একজন বলেন ‘ও. কালের কণ্ঠ? দেখেছি ভাই।' চায়ের দোকানি বললেন, "আসেন ভাই আসেন, আমাদের হীরামন মানে হীরু আপার খবর। চায়ের মত গরম খবর, এক্কেবারে পিপারের সামনের পাতার হেড লাইনে-লেখছে হালায়। পরানডা ভইরা লেখছে রে ভাই।" 

শ্যামল বরণ গায়ের রং হালকা-পাতলা গড়নের এক তরুণ চায়ের দোকানের বেঞ্চে জায়গা না পেয়ে দাড়িঁয়ে ছিলেন দোকানের ঝাপের লাঠিতে হেলান দিয়ে। তরুণটি সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিলেন। দোকানদার লোক গুনে দেখলেন ২৬ জন। জানতে চাইলেন- 'সবাইকে দেবো'? এবার তরুণটি আমার দিকে (কালের কণ্ঠ রিপোর্টার) তাকালেন। বুঝলাম মজলিসে একমাত্র আমি-ই তার অপরিচিত। জানতে চাইলেন, চা? মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম, অনুচ্চস্বরে শুধু বললাম, চিনি ছাড়া রং চা। দোকানি চা তৈরি শুরু করলেন। চায়ের অর্ডার দেয়া তরুনটি ফের আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ভাইয়াকে তো চিনলাম না'। গুটি-শুটি হয়ে বসেছিলাম এক কোণে। চায়ের অর্ডার দেয়া তরুণটি ফের তাকিয়ে বললেন, 'ভাইয়াকে তো চিনলাম না'। জবাব দিলাম, ‌'ভাইয়া আমার বাড়ি মানিকগঞ্জের গ্রামে। এই ‘আইচি’ হাসপাতালে রোগী আছে, সে জন্য আসছি'। সবাই আবার আলোচনায় ফিরলেন।

এ ঘটনা গত ২১ আগস্টের। রাত তখোন সাড়ে ন’টা কি পৌনে দশটা হবে। ওই দিনই  উত্তরার আবদুল্লাহপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে রাখা বিএনপি নেত্রী হীরামনকে নিয়ে ‘হীরামনের সাফকথা জায়গা দখল করে খাই’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে আমার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গত প্রায় দেড়মাস ওই দখলবাজি নিয়ে কাজ করেছি। সে জন্য নিজের ভেতর খুব কৌতহল হলো- হীরামনের এলাকায় গিয়ে গোপনে একটু মানুষের আলোচনা শুনে আসি। দেখে আসি আসলে কেউ পত্রিকা পড়েছে কি না, বা পড়ে থাকলে তাদের প্রতিক্রিয়া  ইতিবাচক না নেতিবাচক। এছাড়া আমার রিপোর্টে কোথাও ভুল থাকলে সেটাও জানতে পারবো।  এরপর চলে যাই আব্দুল্লাহপুর আইচি হাসপাতালের সামনে, একেবারে হীরামনের বাড়ির পাশে। জানা ছিলো রাতে আইচি হাসপাতালের সামনের ওই খোলামেলা চা দোকানে স্কুল-কলেজের কিছু শিক্ষক, চাকুরীজীবি ও সচেতন কিছু মানুষ নিয়মিত আড্ডা দেন গভীর রাত অবধি। নানা বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করেন। গিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম।

একজন বললেন,আচ্ছা বুঝলাম না, 'দখল-চাদাঁবাজীতে অভিজ্ঞ হীরামন আপা এমন ভুল করলেন কীভাবে'? তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আরেকজন বললেন, 'কী ভুল ভাই?' প্রথম ব্যক্তিটি তখন বলেন, ‌'আরে! আপা ওই সাংবাদিককে কিছু টাকা দিলেই তো লেখা বন্ধ হয়ে যেত'। একযোগে বেশ কয়েকজন বলে উঠলেন- হ্যা তিনি ঠিকই বলেছেন। কিছু টাকা দিলেই হতো। আরেকজন বললেন, 'হয়তো পাত্তাই দেয়নি, না হলে মনে হয় লাইন পায়নি। দেন-দরবার ঠিকমত হয়নি'। এবার আরেক পাশ থেকে একজন দ্বিমত পোষণ করে বললেন, 'ভাই এখন কালের কণ্ঠ অনেক বড় পত্রিকা, দিনদিন পত্রিকাটা দেখছি বাড়ছে। এছাড়া কালের কণ্ঠের মালিক বসুন্ধরা গ্রুপ।  কম টাকা বেতন দেয় না। আরে ভাই সব সাংবাদিক এক না, সবাই টাকা নেয় না'।

চায়ের অর্ডার দেয়া তরুণটি বললেন, 'ভাই হীরামন আপা আমাদের নেত্রী এলাকার গর্ব। তাকে নিয়ে এভাবে লেখা হয়েছে, আমাদের উচিত কালের কণ্ঠের বিরুদ্ধে একটি মানববন্ধন করা। এবার বেশিরভাগ লোকই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন। তরুণকে তিরস্কারের সুরে একজন বললেন, 'যান ভাই, আপনি এখনই একটা মানববন্ধন করুন। চাঁদার টাকার ভাগ কি গোপনে আপনাকেও দেয় নাকি?'

বিরামহীন আলোচনা চলছেই। এবার মাষ্টার নামে পরিচিত ব্যক্তিটি আরেক দফা চায়ের অর্ডার দিলেন। দোকানী মাথা গোণে দেখলেন। এবার তাকে চা তৈরি করতে হবে ৩১টি। লোক কিছু বেড়েছে। সবার বসার জায়গা নেই, কেউ কেউ দাড়িঁয়ে আছেন। 

দাড়িঁয়ে থাকা একজন বলছিলেন, 'আরে ভাই, পত্রিকায় লিখলে কী হবে? হীরু আপা আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডে কিছু মাল দিয়ে আসবে, সব ঠিক হয়ে যাবে'। বসে থাকা একজন এ কথার বেশ কড়া জবাব দিয়ে বললেন, 'আপনি কি এটাকে উত্তরার ফাপরবাজ সাংবাদিক পাইছেন? রিপোর্টটা দেখেছেন? সাংবাদিক মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন, বিদ্যুত বিভাগে কথা বলেছেন,পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজির সঙ্গে কথা বলেছেন, রেলমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আবার দেখুন হীরামন আপা যে তিতাস গ্যাসের জায়গায় নতুন বিল্ডিং নির্মান করছেন এতো আমরা দু’একজন ছাড়া কেউ জানে না। সাংবাদিক ব্যাটা তাও খুজেঁ বের করেছেন এবং তিতাস গ্যাসের এমডির সঙ্গে কথা বলেছেন। একেবারে যা-তা ভাবলে ঠিক হবে না'।
 
এবার একজন বললেন, ‌'তবে সাংবাদিক দু’তিনটা জায়গায় ভুল করেছেন'। আরেকজন জানতে চাইলেন-কোনটা? তখন ওই ব্যক্তি বলেন, ‌'যেমন কয়েকটি দোকানের ভাড়ার কথা বলেছেন ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার।  আসলে ভাড়াটা অত না। ওর মধ্যে একটা থেকে পায় ৬ হাজার, আ কয়েকটা থেকে ১১ হাজার করে। এটা সাংবাদিক বাড়িয়ে লিখেছেন'। এবার অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকা এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, 'হীরামনেরটা লিখেছে ভালো, মোহাম্মাদ আলী বাবুর দখল নিয়ে কি লিখবে? এই হালায় তো বড় দখলবাজ'। তার পাশ থেকে একজন বললেন, 'দ্যাখেন, অনেকেই বলে আওয়ামী লীগের লোকজন  সব খেয়ে ফেলছে। অথছ দেখুন, হীরামন করে বিএনপি; মোহাম্মাদ আলী বাবু করে জাতীয় পাটি। এরা দখল করে খাচ্ছে কয়েকশ কোটি টাকার সম্পত্তি।

এবার এক জন কথা বলার আগেই উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করলো। অন্যরা বলা শুরু করলো, 'ভাই হাসেন ক্যান বলেন। কি হৈছে'? লোকটি বললেন, ‌'সাংবাদিক লিখছে, হীরামনের কথায় নাকি সূর্য অস্ত যায়'। বলে তিনি আবারো হাসতে শুরু করলেন। এবার পত্রিকাটা বের করে এক ভদ্রলোক বললেন, ‌'কেরানী সাব আপনি ঠিক বুঝেননি, দ্যাখেন সাংবাদিক লিখেছে ‘হীরা মনের সূর্য কখোনো অস্ত যায় না’। তার মানে হচ্ছে, সাংবাদিক বুঝাতে চেয়েছেন হীরামনের  জামাই জাহাঙ্গীর যুব দলের নেতা,হীরামন নিজে করেন বিএনপি,তার ফুপাতো ভাই কুতুবউদ্দিন উত্তরা পূর্ব থানার সভাপতি।  আরেক ভাই বাবুল জাতীয় পাটির কেন্দ্রীয় নেতা। এ দেশে তো ঘুরে ফিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পাটিই ক্ষমতায় থাকে। এ তিন দলই যেহেতু হীরামনের হাতে সে জন্য ওই কথা লিখেছেন, বুঝলেন?' উত্তর এল, ‌'ও তাই। আমি ভুল বুঝেছিলাম'। রাত তখোন পৌনে ১২টা আলোচনা চলতেই থাকলো-কেউ কেউ নীরবে উঠতে শুরু করলেন,আমিও নীরবেই কেটে পড়লাম। 

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, কালের কণ্ঠ

পড়ুন : হীরামনের সাফ কথা আমি দখল করে খাই

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা