kalerkantho

২১ আগস্ট : বদলে যেতো বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ

গোলাম রাব্বানী   

২১ আগস্ট, ২০১৯ ১৪:৪১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



২১ আগস্ট : বদলে যেতো বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ

ফাইল ফটো

২১ আগস্ট। ২০০৪ সাল। প্রতিদিনের মতো সকালে পাখিরা নীড় ছেড়েছে, সন্ধ্যায় ফিরবে। এভাবেই প্রতিদিন সব পাখি নীড় ছাড়ে আর ফিরে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে পাখির কোলাহলেই শুরু হয়েছিলো ২১ আগস্টের সকাল। যথারীতি বিকালটাও মিষ্টি হবারই কথা। কিন্তু একটি পাখির ডানা কেটে দিয়ে তার বাড়ি ফেরা অনিশ্চিত করতে সচেষ্ট একদল ঘাতক। সে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী তাদের লক্ষ্যে সফল না হলেও বিষাদময় করেছিলো সে বিকেলটিকে। বাঙালির কপালে এঁটে দিয়েছে কালিমা।

বলছি, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বিকেলের কথা। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ। সারা ঢাকা থেকে নেতাকর্মীরা এসে জড়ো হয়েছে দলীয় কার্যালয়ের সামনে। নেতাকর্মীরা তখনো টের পাননি, এরই মধ্যে তাদের সঙ্গ মিশে গেছে বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঠণ্ডা মাথার খুনি। সঙ্গে তাজা গ্রেনেড, মূল টার্গেট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। অতিগোপনে সময় নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সাজানো হয়েছিলো ছক। তারা সেদিন তাদের অপারেশনের সাংকেতিক নাম দিয়েছিলো, শেখ হাসিনাকে নাস্তা করানো। যা সফল হলে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বদলে যেতো বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ।

হামলার একদিন আগে ২০ আগস্ট ঘটনাস্থল ও তার আশপাশ খুটিয়ে খুটিয়ে রেকি করা হয়। হরকাতুল জেহাদের সদস্য আহসান উল্লাহ কাজল ও আবু জান্দাল এ কাজটি সম্পন্ন করেন। সেদিন হোটেল রমনা ও পীর ইয়েমেনী মার্কেটেরর ওপর থেকে পুরো যায়গা ভালোভাবে দেখে নেয় তারা। পরদিন সকাল ১০টায় মেরুল বাড্ডায় মুফতি হান্নানের বাসায় হামলার পরিকল্পনা হয়। কারা সরাসরি এই হামলায় অংশ নেবে, তা ওখানেই ঠিক করা হয়। ১২ জনকে বাছাই করে তাদের হাতে ১৫টি গ্রেনেড তুলে দেয়া হয়। এরপর তারা সেখান থেকে রওয়ানা দিয়ে আসরের নামাজের আগে গোলাপশাহ মাজারের মসজিদে মিলিত হয়। সেখান থেকে ঢাকা বিভিন্ন যায়গা থেকে আসা মিছিলে মিশে গিয়ে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আসে ঘাতকরা। 

তাদের টার্গেট মঞ্চ। গুলিস্তান পার্টি অফিসের সামনে পশ্চিমমুখী ট্রাকেই তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। মঞ্চে যেনো সরাসরি গ্রেনেড ছোড়া যায়- সেজন্য তারা মঞ্চকে ঘিরে তিনটি টিমে ভাগ হয়ে যায়। প্রতি দলে চারজন করে। ঘাতক জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের সমন্বয়ে গড়া প্রথম দলটি অবস্থান নেয় দক্ষিণ পশ্চিম অংশে। শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে মঞ্চে গ্রেনেড ছোড়ার দায়িত্ব ছিল তাদেরই ওপর। আর সবুজ, জাহাঙ্গীর, মাসুদ এবং উজ্জলের সমন্বয়ে দ্বিতীয় টিম ছিল মঞ্চের পশ্চিম পাশে। মুত্তাকীন, মুরসালিন, আরিফ হাসান ও ইকবাল আহমেদের তৃতীয় টিম মঞ্চের পশ্চিম উত্তর দিকে। এই দুদলের টার্গেট ছিল সমাবেশে আসা নেতাকর্মীরা।

বিকেল সাড়ে ৫টার কাছাকাছি সময় শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হতেই প্রথম গ্রেনেডটি ছোড়ে ঘাতক জান্দাল। এরপর অন্যরাও গ্রেনেড ছোড়া শুরু করে। একে একে ১১টি গ্রেনেড এসে পড়ে সমাবেশের ওপর। প্রথম গ্রেনেড ছোড়ার পর কর্মীরা ছোটাছোটি শুরু করলে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের টার্গেট করে দ্বিতীয় গ্রেনেড মারার দায়িত্ব ছিল বুলবুলের। কিন্তু মানুষের ছোটাছুটিতে সে মাটিতে পড়ে যায়। ভয়ে আর দ্বিতীয় গ্রেনেডটি ছুড়তে পারেনি, গ্রেনেড মাটিতে ফেলে পালিয়ে যায় সে। ঘাতক জাহাঙ্গীরও তার নিজের হাতের প্রথমে গ্রেনেড ছোড়ার পর মানুষের ছোটাছোটি আর রক্ত দেখে সে আর পরেরটি ছুড়তে পারেনি। সেটিও মাটিতে ফেলে পালিয়ে যায়।

১৫টি গ্রেনেড নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ছক করলেও ১১টি বিস্ফোরণ হয়েছিলো। আর বাকি চারটি অবিস্ফোরিত থেকে যায়। ভয়ে দুজনে আর গ্রেনেড ছুড়তে পারেনি। এটিই হয়ত ঐশি রহমত শেখ হাসিনার প্রতি। আল্লাহ হয়ত তার জীবন রক্ষা করবেন বলে এটি করেছেন। কিন্তু ঘাতেকেরা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়, তাদের অপারেশন সফল। ফোনে মুফতি হান্নানকে ঘাতক কাজল তাই জানিয়েছে।

আল্লাহর রহমত আর নেতাকর্মীদের মানবঢাল সেদিন শেখ হাসিনাকে রক্ষা করলেও ঝরে যায় ২৪টি তাজা প্রাণ। পঙ্গুত্ব বরণসহ স্প্লিন্টারে আহত হয় কতশত! ২১ আগস্টের সে ভয়াবহ স্মৃতি বাংলাদেশের মানুষের মনে দাগ কাটে বার বার। বার বার মনে করিয়ে দেয় অন্যের মতকে গলাটিপে হত্যা করার রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার কথা। যে কারণে বিএনপি ও তাদের দোসর গোষ্ঠী গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। ধ্বংসলীলা আর নোংরা ল্যাং মারার রাজনীতি আজ তাদের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে।

১৯ বার হত্যা চেষ্টা হলেণও আঘাতে আঘাতে ভেঙ্গে পড়েননি বঙ্গবন্ধু কন্যা। দমে যাননি। বরং শক্তিশালী হয়েছেন কয়েকগুন। কারণ বাবার জীবন থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন। বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নিজেকে মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। দেশ ও মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। বাবার স্বপ্নে সোনার বাংলা গড়ার ব্রত নিয়ে অবিরাম কাজ করে চলেছেন। তাইতো নিজ কর্মগুণে আজ শেখ হাসিনা বিশ্বনন্দিত। চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ। দেশরত্ন থেকে বিশ্বরত্ন।

উইলিয়াম শেক্সপিয়র বলেছিলেন, ‘ভীরুরা মরার আগে বারে বারে মরে। সাহসীরা মৃত্যুর স্বাদ একবারই গ্রহণ করে।’ শেখ হাসিনা সেই সাহসীদের দলে। ১৯৮১ সালে দেশের আসার আগে ১১ মে বিশ্বখ্যাত ‘নিউজ উইক’পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন; এমনকি যে সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়। ’মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলেই শেখ হাসিনাকে মারতে পারে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মৃত্যুর জন্য প্রস্তত, কেউ তাকে মারতে পারে না।’ আসলে যিনি রাতের আধারে তাহাজ্জুদে প্রভুর সান্নিধ্যে ঈমানি মৃত্যু খুঁজেন, দিনের আলোয় মনবসেবায় প্রভূর সেবা নিশ্চিত করেন। Work is worship যাঁর জীবনের মূলমন্ত্র; তার মৃত্যু হতে পারে না। মানুষের কল্যাণে তাকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখবেন আল্লাহ নিজেই।

১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) চতুর্থ সম্মেলনে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি। তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমান। এভাবে আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতাই লাভ করলাম।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলা হয়, বঙ্গবন্ধুকেও ছাড়িয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার চরম শত্রুও বলবেন, শেখ হাসিনা সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম। আজকের বিশ্বে ফিদেল কাস্ত্রো বেঁচে থাকলে হয়ত নতুন কোনো উক্তি করতেন। তবে আমার বলতে দ্বিধা নেই, শেখ হাসিনার জীবন কর্মবহুল ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। এখন এটি শুধু একটি নামই নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো শেখ হাসিনা ‘উন্নয়ন সমৃদ্ধির কারিগর’ হিসেবে এই বাংলায় চির জাগরুক রবেন। এদেশের শতসহস্র মানুষের আকুতি শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

আমরা যারা দেশরত্ন শেখ হাসিনার অনুসারী তাদের মনে রাখা দরকার, এখনো যেকোনো ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে। এর জন্য প্রস্তুতি থাকা একান্ত প্রয়োজন। আামদের প্রত্যেক কর্মীকে মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার জীবন সবার আগে। ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়েছে, শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগ কতটা গতিহীন ও ছন্দবিহীন। যেহেতু দল ক্ষমতায়, দেশ সেবার সুযোগ আছে। আসুন, কে কী পেলাম সেটির হিসেব না করে শেখ হাসিনার জন্য মতো নিঃস্বার্থভাবে মানুষে পাশে থাকি। আমরা মানবিক হই। তৃণমূলের মানুষ শেখ হাসিনাকে দেখে না, আমাদেরে দেখে। আমরা যদি মানবিক হই, সেবার ব্রতে কাজ করি, মানুষ আমাদের মাঝে শেখ হাসিনাকে খুঁজে পাবেন। আমরা চাই, হাসু আপার জয় হোক, তার জয়েই বাংলাদেশের জয়। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও জিএস, ডাকসু।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা