kalerkantho

বামপন্থায় বিশ্বাসী তসলিমাকে বামপন্থীরাই কেন তাড়াতে চায়?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ আগস্ট, ২০১৯ ১৫:৩২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বামপন্থায় বিশ্বাসী তসলিমাকে বামপন্থীরাই কেন তাড়াতে চায়?

মৌলবাদীদের অত্যাচারে সেই কবেই বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের। এরপর কখনই দেশে ফিরতে পারেননি। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কাটছে তার জীবন। তিনি আজীবন বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরাই একসময় তসলিমাকে তাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। বামপন্থী সরকার তার বই নিষিদ্ধ করেছিল। এসব গল্পই এক দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসে তুলে ধরেছেন এই বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা। তার স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

আমি ডানপন্থী কখনও ছিলাম না। বাম ঘেঁষা চিন্তাভাবনা বরাবরই ছিল। কোনওদিন পার্টি করিনি। কৈশোর পার হওয়ার পর ময়মনসিংহ শহরে দুটো দল যা গড়েছিলাম তা নিতান্তই শিল্প সাহিত্য বিষয়ক। মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন 'শতাব্দি চক্র', তারপর 'সকাল কবিতা পরিষদ'। আরও একটা দল গড়েছিলাম সেটির নাম 'ধর্মমুক্ত মানববাদি মঞ্চ', সেটি কলকাতায় শিক্ষিত সচেতন ধর্ম মুক্ত মুসলমান সমাজের নারী পুরুষদের নিয়ে। এটি গড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু নেপথ্যে ছিলাম। ভারতে তখন নোংরা রাজনীতি চলছে আমাকে নিয়ে। বাম দল আমার বাম ঘেঁষা বই নিষিদ্ধ করেছে, হাইকোর্ট আবার বইকে মুক্তি দিয়েছে। ৩৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা দল আবার মুসলমানদের মানুষ বানাচ্ছি এই অভিযোগে গুম করে ফেলে কিনা।

আমাকে ভারত বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দলই কখনই পছন্দ করেনি। যে আমি বাম ঘেঁষা বা বাম পন্থী, সেই আমার সবচেয়ে বেশি সর্বনাশ করেছে বাম দলই। বাম দলের জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য , বিমান বসুর সংগে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। তাঁদের সহানুভূতি সাহচর্যও পেয়েছি। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আমার বই নিষিদ্ধ করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমার মুখ দেখা বন্ধ করলেন। হাইকোর্ট বই মুক্তি দেওয়ার পর শুরু হলো তাঁর আমার ৭ নম্বর রওডন স্ট্রিটের বাড়িতে ঘন ঘন পুলিশের ফোন, পুলিশের বড়কর্তার সশরীরে আসা, আমাকে রাজ্য ছাড়ার আদেশ দেওয়া, নিরাপত্তা উঠিয়ে দেওয়ার হুমকি।

আদেশ মানিনি বলে গৃহবন্দি করা হলো আমাকে। চার মাস গৃহবন্দি থাকার পর বাম নেতারা আয়োজন করলেন চোর ছ্যাচড়দের পথে নামানো, 'তসলিমা গো ব্যাক' নামের হাতে লেখা একটা কাগজ টেলিভিশনের সামনে ধরে রাখা, আর্মি নামানোর নাটক, বিমান বসু বললেন, আমাকে যদি ওই চোর ছ্যাঁচড়গুলো পছন্দ না করে, তা হলে আমি চলে যাই না কেন রাজ্য ছেড়ে। রাস্তায় নাটক চলার ৬ মাস আগে থেকে কিন্তু আমার বাড়িতে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন মূখ্যমন্ত্রীর বাহক প্রসূন মুখার্জি , বিনিত গোয়েল।

৭ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে আমাকে নিরাপত্তা পুলিশেরা উঠিয়ে গিয়ে খোলা একটি বাড়িতে রেখে চলে গেলেন। বলে গেলেন সিদিকুল্লাহ মিছিল নিয়ে আমাকে মারতে আসছে, বলে গেলেন মুসলিম একটা টেররিস্ট দল আমাকে মেরে ফেলার প্ল্যান করেছে। সারাদিন আমি নিরাপত্তাহীন বাড়িটিতে বসে রইলাম। এই হচ্ছে বাম রাজনীতি, আমাকে ভয় পাওয়াতে বাধ্য করাতে চাইছেন, যেন নিজে থেকে চলে চাই। আমাকে লোকে চেনে বলে আমাকে মেরে ফেলেননি। নাহলে মেরেই ফেলতেন। যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, সে বাড়ির মালিককে দিয়ে বলালেন বাড়ি ছাড়তে। আমার প্রতিরোধে শেষ অবধি কাজ হয়নি। চার মাস পর ঠিকই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করলেন।

বাম রাজনীতি তারপরও শান্ত হয়নি। কেন্দ্রে বাম রাজনীতিকদের একজন ঘনিষ্ট লোক ছিলেন। তাঁকে দিয়ে আমাকে দেশ ছাড়া করার নানা রকম কায়দা কানুন শুরু হয়ে গেল। গৃহবন্দিত্ব থেকে শুরু করে মানসিক নির্যাতন। অতঃপর কিছুতেই কাজ না হলে শারীরিক। ডাক্তার দেখানো চলবে না। ওষুধ খাওয়া চলবে না। ব্লাড প্রেসার আকাশে উঠছে উঠুক। চিল্লাচিল্লি করার পর ডাক্তার দেখানো হলো বটে, ওদের তিন ওষুধের একটি খেয়েই অজ্ঞান হয়ে গেলাম। এইমসের সিসিউতে একজন নিয়ে এলেন। তার কিন্তু আমাকে সাহায্য করার কথা ছিল না।

ওখানে জীবন বাঁচানোর কাজ চললো, ডাক্তার বেহাল বললেন, ওষুধের 'পয়জনাস রিয়েকশান' হয়েছে, সপ্তাহ দুই লাগবে ব্লাড প্রেসার স্টেবল হতে। কিন্তু সেই বাম রাজনীতিকদের শুভাকাংখী কী করলেন, আমাকে পরদিনই বের করে নিলেন হাসপাতাল থেকে। প্রচণ্ড ফ্লাকচুয়েট করার ব্লাড প্রেসার নিয়ে ঘরে বসে থাকতে হলো। এইমসের কোনও ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। কষ্টে সৃষ্টে অন্য এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। সেই ডাক্তারও দুদিন পর হাওয়া। পরে শুনলাম সেই ডাক্তারের কাছে পুলিশ গিয়ে হুমকি দিয়ে এসেছে, আমার সঙ্গে কথা বলা যাবে না। গা হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল আমার। আমি যদি দেশ না ছাড়ি, আমাকে তো মেরে ফেলবে এরা।

স্টালিনের গুলাগের কথা মনে পড়লো। আমি জীবন বাঁচাতে ভারত ছাড়লাম ২০০৮ সালে। তারপরও আমি কিন্তু বামপন্থী। আমি সমতায় সাম্যে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমি ধর্ম মানি না, কাস্ট মানি না, গরিব ধনী মানিনা, সমতার সমাজে বিশ্বাস করি, এই বিশ্বাসের কথা লিখি, আমি বাম না তো ওরা বাম? মাঝে মাঝে আমার জানতে ইচ্ছে হয় সিপিয়াইএম কেন আমাকে দেশ থেকে তাড়ানোর জন্য অমন মরিয়া হয়ে উঠেছিল? 

১। পঞ্চায়েত নির্বাচনে মুসলমানের ভোট পাওয়ার জন্য? ইসলাম বিরোধীকে তাড়িয়েছি, আমাদের ভোট দে এইবার? কিন্তু আমি কোন ছার? মুসলমানদের কজন চেনে আমাকে? 
২।দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু দুবছর পর হাইকোর্ট বাতিল করেছিল বলে নিষেধাজ্ঞা ? কিন্তু নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা তো আমি করিনি। করেছে এপিডিআর। 
৩। সুনীল গংগো (গঙ্গোপাধ্যায়) বায়না ধরেছিলেন যে করেই হোক আমাকে রাজ্যছাড়া অথবা দেশ্ছাড়া করতে হবে, যেহেতু দ্বিখণ্ডিততে যেভাবে বাংলাদেশের মহাপুরুষদের মুখোশ উন্মোচন হয়েছে, পরের খণ্ডে পশ্চিম্বংগের মহাপুরুষদের মুখোশ সেভাবে উন্মোচন হওয়ার আশংকা আছে? 

কোন কারণটি আসল কারণ জানি না। দ্বিখণ্ডিত ইসলাম নিয়ে মন্তব্য আছে, কিন্তু ওই নাস্তিক বামেরা কি ইসলাম বিশ্বাসী যে সহ্য করতে পারেননি? দ্বিখণ্ডিততে সবচেয়ে বেশি আছে মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। দ্বিখণ্ডিত সেকুলারিজমের পক্ষে, মানবতার পক্ষে , নারীর সমান অধিকারের পক্ষের একটি বই। এগুলোতে তো বামপন্থীদের বিশ্বাস করার কথা।

আমি আসলে পশ্চিমবংগের বাম রাজনীতিকদের চেয়ে বাম পন্থায় বেশি বিশ্বাস করি। আমার ভিতরে ভণ্ডামো হিপোক্রেসি এসব নেই। এখনও বামের পক্ষে লিখি। যারা বৈষম্যহীন সমতার সমাজের পক্ষে লড়াই করা আমাকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করেছে তারা সত্যিকার বাম পক্ষের লোক নয়। লোক নয় বলে দলে দলে শুনি অনেকে বিজেপিতে ভিড়েছে। কই, আমি তো আমার আদর্শ পাল্টাইনি! আমার কাছে কত ছোট হয়ে গেল না ওরা?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা