kalerkantho

এডিসের সবচেয়ে দুর্বল ধাপ লার্ভা, এটাকেই ধ্বংস করতে হবে

ড. মো. গোলাম সারোয়ার   

১৮ আগস্ট, ২০১৯ ১৩:৩৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এডিসের সবচেয়ে দুর্বল ধাপ লার্ভা, এটাকেই ধ্বংস করতে হবে

সিটি কর্পোরেশনের ৮টি অঞ্চলের এডিসের লার্ভার বিস্তার

মশা এমনিই এক কীট যা ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত। ইতিহাসে এই মশা যখন বিখ্যাত হয়েছিল তখন কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতির মশা আবিষ্কার হয় নাই। নমরুদের ধ্বংসের জন্য যে মশা দায়ী সেটা কি এডিস, অ্যানোফিলিস নাকি কুলেক্স প্রজাতির ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু এটা পরিষ্কার ছিল, মশা মহাশয়টি কিন্তু তখন কোনো ভাইরাস বহন করে নমরুদকে মারে নাই। মেরেছিল নড়াচড়া ও অস্বস্তিকার অবস্থার সৃষ্টি করে। আর আজ মশা মহাবিপদের কারণ হয়েছে বিভিন্ন রকমের রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু অর্থাৎ ভাইরাস বহন করে। আবার সেই ভাইরাসটাও যেন তেন ভাইরাস নয়, তাদের মধ্যেও প্রকারভেদ রয়েছে। যার মলিকুলার স্ট্রাকচারে আবার রয়েছে ভিন্নতা। যাই হোক এত জটিলতার মধ্যে না গিয়ে সোজাসাপ্টা কথায় আসা যাক। 

সমগ্র বাংলাদেশে বর্তমানে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে যে মশাটি তার নাম 'এডিস অ্যাজেপ্টি। যে মশাটি তিন প্রকারের হয়ে থাকে। ডোমেস্টিক, পেরিডোমেস্টিক এবং সিলভান প্রকৃতির।

এসব তথ্য হয়তো ইতোমধ্যে জেনেছেন আপনারা। মানুষের বাসাবাড়িতে যে এডিস মশা থাকে, যা শহর এলাকায় স্বচ্ছ পরিষ্কার পানির ওপর যেকোনো অবলম্বনে ডিম পেড়ে বংশ বিস্তার করে। মানুষের রক্ত পান করে রক্তের প্রোটিন দিয়ে ডিমের যত্ন নেয়। এই প্রকার মশা ৩/৪ বার মিলন করে এবং প্রত্যেকবার মিলনের পর স্ত্রী মশাগুলো মরিয়া হয়ে উঠে প্রবাহিত রক্ত (যে রক্ত জীবের শরীরে প্রবাহমান) পান করতে। কারণ রক্তের প্রোটিন ছাড়া তাদের ডিম তৈরি হবে না। শহরের বাড়িতে ছোট পরিসরে, যেমন- বালতি, টায়ার, ফ্রিজের নিচে জমা থাকা পানি, ফুলের টব, নারকেলের খোল, বাসায় ধরে রাখা পানির ড্রামে এমন কি বাথরুমে রাখা বালতির ওপরেও সামান্য পানি থাকলে তাতেও স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম পেড়ে জীবনচক্র পূর্ণ করে। 

এই মশার জীবনচক্রের চারটি ধাপ রয়েছে- ডিম, লার্ভা, পিউপা এবং পূর্ণাঙ্গ মশা। ডিম হতে পূর্ণাঙ্গ মশা হয়ে মারা যাওয়া পর্যন্ত ২০-৩৬ দিন সময় লাগে।

পেরি ডোমেস্টিক প্রকৃতির মশার বাস খামারগুলোতে। যেখানে গ্রাম ও শহরের মিশ্র পরিবেশ বিরাজমান। এদের জীবনচক্রও একই রকমের। আর সিলভান প্রকৃতির এডিস মশা থাকে গ্রামের বাঁশের গর্তে ও গাছের ছিদ্রে। জীবনচক্রের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় না।

এবার বলি এই মশার ভয়াবহতার কথা। যা আমারা সবাই অনুধাবন করছি। তবে আরেকটু গভীরে জানা যাক। এই মশা কোনো অসুস্থ মানুষকে কামড় দিলে এবং যদি সেই ব্যক্তির রক্তে যদি ডেঙ্গু ভাইরাস সর্বোচ্চ পরিমাণে থাকে, তখন সেই উচ্চমাত্রার ভাইরাস মশার শরীরে চক্র পূর্ণ করে। এরপর তা মশার স্যালিভাতে জমা হয় যা কিনা মশার রক্ত পান করতে সাহায্য করে। মশা যখন রক্ত পান করে তখন যদি তা জমাট বেঁধে যায় তাহলে আর মশা রক্ত পান করতে পারে না। তাই প্রথমেই মশা তার স্যালিভা শিকারের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেয়, যাতে করে প্রবাহিত রক্ত কোনভাবেই জমাট বাধতে না পারে এবং মশা সহজেই রক্ত পান করতে পারে।

এই স্যালিভার মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। তারপর এই ভাইরাসের মূল টার্গেট হয় মনোসাইটস এবং ম্যাক্রোফেজেস, যা কিনা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি। আগেই বলা হয়েছে, ভাইরাস একটি নিষ্ক্রিয় কণা অবস্থায় থাকে যখন তা কারো দেহের বাইরে থাকে। যখন তা কারো শরীরে প্রবেশ করে তখন পুরো শরীরের কোষীয় কার্যক্রম ব্যবহার করে বংশ বৃদ্ধি করে এবং সেই দেহের কোষকে ভেঙে নিজেরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়। এসব ঘটতে ৪-৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। তবে সর্বোচ্চ ১০ দিন লাগতে পারে। এই অবস্থায় ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ পায়। 

এখন প্রশ্ন হতে পারে এই প্রাণঘাতি বাহক ছাড়াও কি ডেঙ্গু হতে পারে? হ্যাঁ, এই বাহক ছাড়াও ডেঙ্গু হতে পারে। যেমন অপারেশনের মাধ্যমে কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন অথবা রক্তদানের মাধ্যমে অথবা গর্ভবতী নারীর মাধ্যমে তার গর্ভের সন্তান আক্রান্ত হতে পারে। তবে এই ঘটনাগুলোর সম্ভাবনা অনেক কম। 

দমন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যায়
মশা হলো আথ্রোপোডা পর্বের ডিপ্টেরা অর্ডার এর একটি পতঙ্গ। এর জীবন চক্রের চারটি ধাপ- ডিম, লার্ভা, পিউপা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশার কথা আগেই বলা হয়েছে। আমাদের আগে জানতে হবে এই পতঙ্গটির সবচাইতে দুর্বল ধাপ কোনটি। এর সবচাইতে দুর্বল (ভালনারেবল স্টেজ) হলো লার্ভা। এই লার্ভা আবার চার ধাপে পরিপক্কতা লাভ করে। তাই লার্ভা দমন করাটাই হবে সব চাইতে কার্যকরী পদক্ষেপ। লার্ভা দমনে সঠিক পরিমাণে লারভিসাইড প্রয়োগেই বিনাশ হতে এই মারাত্মক বাহক।

এমনিতেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আবার এডিস মশার ঘনত্ব বেড়ে গেছে। সঙ্গত কারণেই এ পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, শুধু এডিস মশার সংখ্যাই নয়, মশার লার্ভার ঘনত্বও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। অর্থাৎ এসব লার্ভা থেকে মশা বের হলে আগামী দিনগুলোতে মশার সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যাবে। 
 
এটা নতুন কথা নয়। তবুও বলা, গবেষণায় অধিকাংশ এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানিতে, প্লাস্টিকের ড্রামে, বালতি, খোলা ট্যাংক ও ফুলের টবে। ফলে এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখেও প্রয়োজনীয় সচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। কখনো কখনো এই রোগের প্রকোপ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, নেয় ভয়াবহ আকার। চলতি বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর যে মাত্রা দেখা যাচ্ছে, তা অনেকের মনেই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে এই রোগে আক্রান্ত মানুষ ও মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। ডেঙ্গু রোগের হাত থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হলো রোগটি প্রতিরোধ। রাষ্ট্রের তো অবশ্যই এ নিয়ে দায়িত্ব রয়েছে, সেই সঙ্গে নাগরিকদেরও অনেক কিছু করণীয় আছে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা