kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ডেঙ্গু রোগী ব্রাজিলের, জানতে হবে তারা কিভাবে সামলাচ্ছে

সোহেল রানা   

১১ আগস্ট, ২০১৯ ১২:৩২ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ডেঙ্গু রোগী ব্রাজিলের, জানতে হবে তারা কিভাবে সামলাচ্ছে

ডেঙ্গুর মহামারী বিশ্বব্যাপী। ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য, আংশিকভাবে টীকাযোগ্য। প্রয়োজন বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। 

ডেঙ্গু নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে সমগ্র বাংলাদেশকে। এডিস মশা এখন এই জনপদে মূর্তিমান এক আতংকের নাম। আমাদের দেশের জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো এক দীর্ঘ ক্লান্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মশার সাথে। নিরলস কাজ করছেন ডাক্তাররা, জনপ্রতিনিধিরা, সরকারি বেসরকারি ডাক্তার নার্সরা। 

কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন আমাকে তাড়া করেছে। যে পৃথিবীর মানুষ মস্তিষ্ক ট্রান্সপ্লান্টেশন করছে, মংগল গ্রহে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ করছে, চালকবিহীন গাড়ি রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছে, সেই একই পৃথিবীর মানুষ এডিস মশার সাথে যুদ্ধে জিততে পারছে না কেন? এডিস মশা থেকে ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা কি সম্পূর্ণ নতুন? অন্য দেশ, অন্য সমাজ যুদ্ধটা কিভাবে করছে? এই জ্বরের কি টীকা আছে- আমরা প্রায়ই শুনি ডেঙ্গুর টীকা নাই। এটা কি সঠিক? এডিস মশাকে নির্মূল করতে আমরা কি কি করতে পারি? 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই মশকী দমন ও রোগ প্রতিরোধের অন্যান্য কৌশলের খবর পাই। ডাক্তার ও গবেষকগণ তাদের মূল্যবান মতামত দিচ্ছেন। আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে লাগলাম। সাথে এটাও বুঝলাম এই উত্তরগুলোর অনেকটাই আমাদের পলিসি লিটারেচার বা মিডিয়ার আলোচনাতেই নাই। 

ম্যালেরিয়ার পর সবচেয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে এডিস মশা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই মুহূর্তে এডিসবাহিত ডেঙ্গু পৃথিবীর সবচেয়ে  ঘন ও ক্রমবর্ধনশীল মশকী ভাইরাস। মূলত এডিস ইজেপ্টি ও এডিস আলবোপিকটাস দুই প্রজাতির মশা ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, পীতজ্বর ইত্যাদি জ্বরের ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস বহনকারী মশার নাম এডিস ইজেপ্টি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় যার মধ্যে ক্লিনিকে নেওয়ার অবস্থা হয় প্রায় ৯৬ মিলিয়ন আক্রান্তের। আইসিসিডিআরবি, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের একটি সমন্বিত গবেষণা বলছে, প্রতিবছর প্রায় ২৪ লক্ষ লোক বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়।  সাম্প্রতিক সময়ে এই জ্বর থেকে অধিকতর মারাত্মক হেমোরেজিক জ্বর ও শক সিনড্রোমের প্রাদুর্ভাবের বৃদ্ধির কারণে এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

গত কয়েক বছর ধরে রিপোর্টেড ডেঙ্গু জ্বরের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিলো বিশ্বে ৩.৩৪ মিলিয়ন (প্রত্যেক দেশের অফিসিয়াল তথ্য অনুসারে)।  এটি কি শুধু বাংলাদেশেই হচ্ছে? না। ১৯৭০ সালের আগে মাত্র ৯টি দেশ ডেঙ্গু জ্বর সংক্রমণের ব্যাপারে রিপোর্ট করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে প্রায় ১০০টি দেশের মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সারা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ডেঙ্গু রোগী ব্রাজিলের। ২০১৬ সালে পৃথিবীর সকল রিপোর্টেড ডেঙ্গুর প্রায় ৫০ ভাগ শুধু ব্রাজিলের। ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার গত ১০০ বছর ধরে নিরলস যুদ্ধ করে যাচ্ছে এডিস মশার সাথে। 

আমার প্রশ্ন হলো, যদি সেটাই হয় তাহলে ব্রাজিল কিভাবে এডিসের সাথে যুদ্ধ করেছে সেটা কি আমরা জানি? ব্রাজিলের পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনগুলো কি কি? এর মধ্য থেকে আমরা কি কিছু নিতে পারি কি? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডেঙ্গু জ্বরের কি টীকা কোন দেশে আছে?

দুঃখজনক হলো, এসব প্রশ্নের আলোচনা আমি পলিসিমেকার ও মিডিয়ায় খুব একটা দেখতে পাচ্ছি না। সমালোচনা ও দোষারোপ এর খবরে ভর্তি মিডিয়া। আপনি যদি ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে চান ও এডিসের সাথে যুদ্ধ করতে চান তাহলে আপনার পরিকল্পনা ও কৌশলগুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে। অন্য দেশে কিভাবে যুদ্ধ করছে জানতে হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কি কি সমাধান নিয়ে আসছে সেটি জানতে হবে। আমরা যদি সারাক্ষণ সমালোচনায় দিন কাটাই আর ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের পদক্ষেপ নেই তবে সেটি নিশ্চয়ই এই যুদ্ধে আমাদের জিততে সহযোগিতা করবে না। আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা, সঠিক গবেষণা ও সঠিক পদক্ষেপ এডিশ মশার সাথে যুদ্ধ জিততে আমাদের সহযোগিতা করবে। 

আসুন দেখে নিই ডেঙ্গু সমস্যায় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ব্রাজিল কিভাবে এডিস মশার সাথে যুদ্ধ করছে। গত প্রায় ১০০ বছর ধরে ব্রাজিলিয়ান সরকার ডেঙ্গু ও এডিস নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে করছে যুদ্ধ। যুদ্ধের অস্ত্রগুলো ছিলো-পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নগর সংস্কার, রাসায়নিক, বাতাসে ধোঁয়া ছেড়ে দেওয়া, তথ্য, শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগ।

যেকোনো যুদ্ধে জেতার জন্য প্রতিপক্ষ সম্বন্ধে সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন। প্রতিপক্ষের শক্তি, কৌশল, সংখ্যা সম্বন্ধে স্টাডি করা। 

সমস্যা হলো, এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিপক্ষ মশা। কোন কোন প্রজাতির কতগুলো মশা আছে, এদের ব্রিডিং সাইটগুলো কোথায়, এসব মশকীর ঘনত্ব ও বণ্টন কিরকম- এগুলো কিভাবে জানা যাবে? এটা জানার জন্য তো সার্ভে করা প্রয়োজন। সমাধান হলো, বিজ্ঞান কিভাবে মশার সার্ভে করতে হয় সেটি জানে। সেই সার্ভে হতে পারে তিন ধরনের- লার্ভা, পিউপা বা এডাল্ট সার্ভে। এই সার্ভে পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত বিভিন্ন গবেষণাপত্রে পাওয়া যাবে। 

ব্রাজিল সরকার পিউপা ও মশকীর ঘনত্ব ও হটস্পট বের করার জন্য লিরা নামে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে যেটি দিয়ে প্রতি হেক্টরে কতগুলো এডিস পিউপা আছে সেটি তারা বের করতে পারে। সার্ভের বাইরেও ব্রাজিল সরকার মশার অবস্থান পর্যবেক্ষণ ও চিহ্নিত করার জন্য প্রায় ৫০টির মতো সফটওয়্যার, মোবাইল এপস ও ইলেকট্রনিক মশা ডিসপোজেটিভ ব্যবহার করছে। ব্যবহার করছে এন্টি মসকুইটো সাউন্ড এপস। 

সার্ভের পর মশা মারা ও বিস্তার রোধেও ব্রাজিল সরকার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মশার বংশবিস্তার রোধে জেনেটিক্যালি মডিফাইড পুরুষ এডিস মশা ব্যবহার করেছে। মশার লার্ভা ও মশকী ধ্বংসের জন্য ফাঁদ (গ্রাভিড এডিস ট্র‍্যাপ, ইকোভেক, মাইক্রোট্র‍্যাপ), আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের সাহায্যে সেন্সর দিয়ে মশা মারা, বায়োলার্ভিসাইড ব্যবহার করে মশা ধ্বংস করা, লার্ভাল ফিশ দিয়ে এডিসের লার্ভা খেয়ে ফেলা, পাইরিপ্রোক্সিফেন- লার্ভিসাইড, বায়োরিপ্যালান্ট দিয়ে (মন্ট্রিকার্ডিয়া লাইফেরিয়া) মশা ধ্বংসের মত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। রয়েছে বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া। যেমন- এডিস মশার মধ্যে উলব্যাশিয়ে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটিয়ে মশার রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা কমানো, ড্রোন ব্যবহার করে মশা পর্যবেক্ষণ ও ট্র‍্যাক করা ইত্যদি। রাসায়নিক হিসেবে ব্যবহার করছে লাইম অ্যান্ড ক্লোরিন ইন কনস্ট্রাকশন, পাইরিপ্রোক্সিফেন- লার্ভিসাইড, ফ্লোটিং ফটোক্যাটালাইটিক ডিভাইসেস। এত কিছুর পরও যদি ডেঙ্গু হয়েই যায় তখন কি করা যাবে? 

২০১৬ সালে ব্রাজিল সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করে। ওই বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুসরণ করে সিওয়াইডি-টিডিভি নামে এক ডেঙ্গু ভ্যাকসিন সানোফি প্যাস্টর নামে এক ওষুধ কম্পানি ১১টি দেশের বাজারে ছাড়ে। ৯-৪৫ বছর বয়সীদেরকে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর ৩ বারে এই ভ্যাকসিন দেওয়া যায়। 

এই ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক নাম ছিলো ডেংভ্যাক্সিয়া। কিন্তু কার্যক্রমের পরপরই ডেংভ্যাক্সিয়া নিয়ে অনেকগুলো বিতর্কের সৃষ্টি হয়। 

১. নেগেটিভ রক্তের কাউকে এই টীকা দিলে তার ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বরের তীব্রতা আরো বেড়ে যায়। 

২. ৯-১৬ বছরে পজিটিভ রক্তের রোগীর ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে এই টীকার সাফল্যের হার ৬৩% কিন্তু নেগেটিভ রক্তের রোগীর ক্ষেত্রে  মাত্র ৩৮.৮%. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালে তাদের সুপারিশ সংশোধন করে জানায়, ভ্যাকসিন প্রদানের পূর্বে রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ প্রয়োজন ও আংশিকভাবে এই টীকা কার্যকরী। কিন্তু বিজ্ঞান এই সমস্যাগুলো সমাধানে নিরলস পরিশ্রম করছে। কিভাবে টীকার সাফল্যের হার বাড়ানো যায় সেটি নিয়ে গবেষণা চলছে। নতুন কিছু টীকা আবিষ্কারে দ্বারপ্রান্তে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা। 

তার মানে, ডেঙ্গু বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে। বিশ্ব বিভিন্নভাবে এর সাথে যুদ্ধ করছে। আমাদের সরকার ও জনস্বাস্থ্য প্রশাসন তাহলে কি করতে পারে? 

প্রথমেই আমাদের একট সঠিক ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেটি করতে হলে দ্রুততার সাথে এ সংক্রান্ত কৌশল নিয়ে গবেষণাগুলো স্টাডি বাড়াতে হবে। সেটি করতে পারে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট ও আইসিসিডিআরবি। এই স্টাডিগুলাই সরকারকে পলিসি সাপোর্ট দিবে। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সমতুল কোন সংস্থার আলোচনা শুরু হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার ভিত্তিতে টীকা কার্যক্রম চালু করতে পারে। নতুন টীকার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া যেতে পারে। 

মোদ্দা কথা হলো, যুদ্ধটা জনস্বাস্থ্য রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে করতে হবে বুদ্ধি, কৌশল, দূরদৃষ্টি ও বিজ্ঞানমনস্কতার সমন্বয়ে। যুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষকে শামিল করতে হবে। 

লেখক: সহকারী সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা