kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

ভয়াল ডেঙ্গুজ্বর, খুব কাছ থেকে যেভাবে দেখলাম

আনিসুর বুলবুল   

৮ আগস্ট, ২০১৯ ১৫:২৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভয়াল ডেঙ্গুজ্বর, খুব কাছ থেকে যেভাবে দেখলাম

শুক্রবার ...

নার্গিসাপার দুদিন ধরে জ্বর। সাথে মাথা ব্যথা। ভাতিজা নাবিলেরও দুদিন ধরে জ্বর। সাথে হাত-পা ব্যথা। একজন থাকেন মানিকগঞ্জ। আরেকজন ঢাকায়।

জ্বরের তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হয়।

এদিকে দুলাভাই ঢাকায় ওদিকে নার্গিসাপা বাসায় একা। আবার এদিকে নাবিলও একা। ভাই-ভাবী খুলনায়।

এখন কী করি?

দুজনেরই ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে একই দিনে।

ঢাকা থেকে দুলাভাই মানিকগঞ্জ গিয়ে আপাকে হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ডেঙ্গু টেস্ট করাতে করাতে দিন শেষ হয়ে যাবে। দায়িত্ব দিই স্থানীয় সাংবাদিক মারুফকে।

আর আমি নাবিলকে নিয়ে যাই অ্যাপোলোতে।

টেস্টের রিপোর্ট নার্গিসাপারটা একদিনেই পাই। ডেঙ্গু নেভেটিভ। কিন্তু নাবিলের রিপোর্ট আর ওই দিন পাই না। বলা হয়েছিল, রিপোর্ট বিকেল পাঁচটার পর ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। বার বার চেক করি, কোনো লাভ হয় না।

শনিবার ...

দুপুর বারোটা। অ্যাপোলো হাসপাতালে গিয়ে লম্বা সিরিয়ালে দাঁড়াই; টোকেন মেশিন নষ্ট। ডেস্কের কাছে গিয়ে জানতে পারি; প্রচুর ডেঙ্গু রোগী। রিপোর্ট এখনো হয়নি। দুইটার পর যেতে হবে। দুই ঘণ্টা পর ফের হাসপাতালে যাই। ফের সিরিয়ালে দাঁড়াই। এবার হাতে রিপোর্ট পাই। ভাতিজার ডেঙ্গু পজিটিভ!

এখন কী করি?

টেনশনে পড়ে যাই। ভাইকে ফোন দিই। কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলি। প্ল্যাটিলেট কাউন্ট দুই লাখের উপরে থাকায় তারা ভয় না পেতে বলেন। তারপরও ডাক্তারের পরামর্শ নিতে বলেন। অ্যাপোলোতেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিই একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের। সন্ধ্যায় তাকে দেখাই। ডাক্তার তরলজাতীয় খাবার খেতে বললেন। তখনও নাবিলের জ্বর একশ তিন। প্রেসক্রিপশনে কোনো ওষুধ লিখলেন না। মুখে বললেন প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খাওয়াতে। তিনদিন পর একটা সিবিসি করিয়ে তাকে দেখাতে বললেন।

এদিকে আমি নাবিলকে বাসায় নিয়ে যাই। ওদিকে খুলনা থেকে ভাই-ভাবী ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেন।

রাত ১১টা। হঠাৎ অফিসের গ্রুপে ইমার্জেন্সি ম্যাসেজ দেখতে পাই। আমাদের এক সহকর্মী বুকের ব্যথায় ফ্লোরে শুয়ে পড়েছেন। সাথে বমিও করছেন। তাকে দ্রুত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আনতে বলি।

হাসপাতালে আমি আগে পৌঁছি। ইমার্জেন্সি রুম বোঝাই লোকজন। ডাক্তারের রুমের সামনে জটলা। তিন-চারজন আনসার সদস্য চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সবাই ডেঙ্গু রোগী। এরইমধ্যে হারুন ভাইকে নিয়ে তারেক পৌঁছে হাসপাতালে।

হাসপাতালের স্টাফরা দ্রুত তার ইসিজি করান। এরপর ঘণ্টাখানেক সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও ডাক্তারকে ইসিজি রিপোর্ট দেখাতে পারি না দেখে স্টাফরাই এগিয়ে আসেন। তাদের একজন রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারকে দেখান। ডাক্তার কয়েকটা ইনজেকশন লিখে দেন।

রাত আড়াইটার দিকে একটা সিএনজি ভাড়া করে হারুন ভাইকে বাসায় পাঠিয়ে দিই।

রবিবার ...

সকালে বাথরুমে গিয়ে নাবিল পড়ে যায়। আমি আয়ানকে নিয়ে পাশের রুমে। ছুটে এসে নাবিলকে টেনে তুলে মাথায় পানি দিই। ভাই-ভাবী বলেন দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে।

এখন কী করি?

কুর্মিটোলার পরিচিত একজন ডাক্তারকে ফোন দিই। তিনি জানান, তাদের ডেঙ্গু কর্নার ফুল। কোনো সিট খালি নেই। ফ্লোরিং হচ্ছে। নিয়ে আসতে পারেন।

আরো কয়েকটা হাসপাতালে খোঁজ নিই। কোথাও কোনো সিট খালি নেই। ডেঙ্গু রোগী ভরপুর। শেষে অ্যাপোলোতেই নিয়ে যাই। নাবিলের অস্থিরতা বেড়ে যায়। হুইল চেয়ারে বসিয়ে ইমার্জেন্সিতে নিই। সেখানেও কোনো সিট খালি নেই। ঘণ্টাখানেক বসে থেকে একটা সিট পাওয়া যায়। সেখানে ডাক্তার দেখে বললেন, প্রেসার ঠিক আছে। ইমার্জেন্সি থেকে ভর্তি করানো সম্ভব হবে না। আউটডোর থেকে যদি সম্ভব হয়। আপনারা যে ডাক্তার দেখিয়েছেন তার শরণাপন্ন হোন।

ফিরে যাই ডাক্তারের কাছে। রিকোয়েস্ট করে ভাতিজাকে ভর্তি করানো হয়।

সোমবার ...

প্লাটিলেট কমে দেড় লাখ। নাবিলকে স্যালাইন দেয়া হয়। ঘণ্টায় ঘণ্টায় পেঁপে, আনার, ডাবের পানি খাওয়াতে থাকি। ভাই-ভাবী নাবিলের কাছেই থাকেন।

মঙ্গলবার ...

ভাতিজা সকালে বমি করে। আমরা টেনশনে পড়ে যাই। প্লাটিলেট আরো কমে যায়। এবার সত্তর হাজার। আমাদের টেনশন হয়। ডাক্তার আমাদের সাহস দেন। বলেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই। তরলজাতীয় খাবার খাওয়ান।

বুধবার ...

প্লাটিলেট বেড়ে যায়। আশি হাজার। ডাক্তার বললেন, কোনো টেনশন নাই। আপনাদের কালই রিলিজ দেওয়া হবে। আমাদের টেনশন কিছু হলেও দূর হয়।

বৃহস্পতিবার ...

আজ নাবিলকে বাসায় নিই। ডাক্তার বলেছেন, তরলজাতীয় খাবার বেশি বেশি খাওয়াতে। আজ মনে হচ্ছে, কাঁধ থেকে একটা বড় বোঝা নেমে গেল!

যা বলা দরকার

এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের তিন থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দেয়। এই রোগটি শুধুমাত্র এডিস মশার মাধ্যমেই ছড়ায় না। যদি কোনো মশা ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কামড় দেয় এবং সেই মশা যদি অন্য কোনো মানুষকে কামড়ায়; তাহলে সেই ব্যক্তিও ডেঙ্গু জ্বর আক্রান্ত হবেন। 

ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দিলে অতি দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তবে ডেঙ্গু জ্বর হলে আপনাকে খাবারের প্রতিও বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে পেঁপে, ডালিম, ডাবের পানি, ব্রুকলি, কমলা, পালংশাক খাওয়া যেতে পারে। আর তৈলাক্ত-ভাজা খাবার, মসলাযুক্ত খাবার ও ক্যাফিনেটেড পানীয় পরিহার করতে হবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা