kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ আগস্ট ২০১৯। ৭ ভাদ্র ১৪২৬। ২০ জিলহজ ১৪৪০

মুসলিম মায়ের মৃত্যুতে হিন্দু সন্তানের ফেসবুক পোস্ট; অতঃপর মানবতার জয়গান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ জুলাই, ২০১৯ ২১:০৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুসলিম মায়ের মৃত্যুতে হিন্দু সন্তানের ফেসবুক পোস্ট; অতঃপর মানবতার জয়গান

স্নেহ বা ভালোবাসার কোনো ধর্ম হয় না। যেকোনো ধর্মের মানুষ ভালোবাসতে পারে যেকোনো ধর্মের মানুষকে। আর তারই প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতের মল্লপুরমেপ কালিকাভু এলাকার এক পরিবারে। মুসলিম এক মায়ের মৃত্যুতে হিন্দু সন্তানের ফেসবুক পোস্টে জানা যায় মানবতার এক অপূর্ব কাহিনি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত মাসে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন শ্রীধরন নামে এক ব্যক্তি। তিনি লিখেছিলেন, তার ‘উম্মা’ ঈশ্বরের ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। মালয়ালি শব্দ উম্মা-র অর্থ, মুসলিম মা। অর্থাৎ মালয়ালি ভাষায় মুসলমানেরা মা-কে উম্মা বলে ডাকেন। পোস্টটি করার সঙ্গে সঙ্গেই নানা প্রশ্ন উঠকে থাকে। ব্রাহ্মণ বংশের সন্তান শ্রীধরনের কাছে কেউ জানতে চান, তিনি আম্মা (মালয়ালি ভাষায় হিন্দুদের মা সম্বোধন) লিখতে গিয়ে ভুল করে উম্মা লিখেছেন কি না। কেউ আবার জানতে চান, তার আসল নাম শ্রীধরন কি না। কেউ আবার ইঙ্গিত করেন তার ছবির দিকে, যেথানে তিনি একটি ফেজ টুপি পরে রয়েছেন। রীতিমতো ট্রল করা শুরু হয় তাকে নিয়ে।

তারপর ফেসবুকে করা প্রশ্নের জবাব দিতে আরো একটি পোস্ট করেন মল্লপুরমের যুবক, কর্মসূত্রে ওমানের বাসিন্দা শ্রীধরন। আর সেই পোস্টের পরেই উন্মোচিত হয়, মানবতার এক অপূর্ব কাহিনি। মা ও সন্তানের স্নেহের কাছে ধর্মীয় তফাত যে আদতে কতটা ফিকে, তা স্পষ্ট হয়ে যায় শ্রীধরনের বক্তব্য জানার পরে।

ফেসবুকের ওই পোস্টে শ্রীধরন জানান, খুব ছোটবেলায় শ্রীধরনের মা মারা যাওয়ার পরে, তিনি এবং তার দুই বোনকে বড় করে তুলেন সেই ‘উম্মা’ এবং উপ্পা (মালয়ালিতে মুসলিমদের বাবা সম্বোধন)। মুসলিম পরিবারে তাদের বেড়ে ওঠায় কোনো রকমে বাধা তৈরি করেনি ধর্ম। এমনকী তাদের ধর্ম পরিবর্তনেরও কোনো চেষ্টা করা হয়নি কখনই।

ফেসবুকে শ্রীধরন লেখেন, এটা তাদের জন্য, যাদের মনে সন্দেহ রয়েছে আমি আসলে কে। আমি মল্লপুরমেপ কালিকাভু এলাকার বাসিন্দা, এখন ওমানে থাকি। আমার যখন মাত্র এক বছর বয়স, আমার মা তখন মারা যান আমায় এবং আমার দুই দিদিকে রেখে। তারপর থেকেই আমাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বড় করেন উম্মা এবং উপ্পা। নিজের সন্তানের মতোই আমাদের দেখভাল করতেন তারা। পড়াশোনা করিয়েছেন আমাদের, আমার দুই দিদির বিয়েও দিয়েছেন। এমন নয় যে, তাদের নিজেদের সন্তান ছিল না বলে আমাদের বড় করেছেন। তাদেরও তিনটি সন্তান ছিল। কিন্তু আমরা ছ’ভাইবোন একসঙ্গেই বড় হয়েছি কোনো বিভাজন ছাড়াই। আমাদের ধর্ম নিয়ে তাদরে কোনো সমস্যা ছিল না। ধর্ম বদলও করা হয়নি আমাদের। উম্মা আমাদের সৎ-মা নন, সত্যিকারের মা-ই ছিলেন।

পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীধরনের পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। পরে জানা যায়, শ্রীধরনের আসল মায়ের নাম ছিল চাক্কি। তিনি সুবাইদা এবং আবদুল আজিজের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন। হঠাৎই মারা যান চাক্কি। ১১ বছরের রামানি, ছ’বছরের লীলা এবং এক বছরের শ্রীধরন মাকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে। তখনই সুবাইদা তাদের বাড়িতে নিয়ে এসে লালন-পালন করতে থাকেন। সুবাইদার নিজের তিন সন্তানের সঙ্গেই ধীরে ধীরে বড় হয় তারা।

সুবাইদার তিন সন্তান শানাবাস, জাফর এবং জোশিনা যখন মসজিদে যেত, শ্রীধরনরা যেত মন্দিরে। রোজ সন্ধ্যায় জোশিনারা কোরান নিয়ে পড়তে বসত, ভাগবদ্গীতা পাঠ করত শ্রীধরনরা। প্রত্যেকেই বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নিজের নিজের কাজে।

এদিকে চলতি বছরের শুরুর দিকে কিডনির অসুখে অসুস্থ হয়ে পড়েন সুবাইদা। খবর পেয়ে আসেন তার সন্তান শানাবাস। তিনিও আরবেই কর্মরত। তিনি জানান, সুবাইদা তাকে নিষেধ করেছিলেন শ্রীধরনকে খবর দিতে। তা হলে শ্রীধরন চাকরি ছেড়ে চলে আসবেন বলে আশঙ্কা করেছিলেন তিনি। পরে অবশ্য খবর পান শ্রীধরন। কিন্তু তার ছুটির আবেদন মঞ্জুর হওয়ার আগেই মৃত্যু সংবাদ আসে সুবাইদার।

তার পরেই ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন শ্রীধরন। যে পোস্টের সূত্র ধরেই জানাজানি হয় মানবতার এমন কাহিনি।

সূত্র: দ্য ওয়াল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা