kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

ভারতে গো-মাতা রক্ষার আড়ালে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেখছেন অনেকে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ জুন, ২০১৯ ০৯:৫৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভারতে গো-মাতা রক্ষার আড়ালে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেখছেন অনেকে

একটা সময় ছিল অনেক পরিবারে খাবারের একাংশ দেওয়া হতো গরুকে। প্রাণীটিকে প্রতিদিন গোসল করানো হতো। সন্ধ্যা হলে গোয়াল ঘরে দেওয়া হতো ধূপের ধোঁয়া, টানিয়ে দেওয়া হতো মশারি। কলকাতায় গরুর এসব সেবা প্রথা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে কয়েকটি সংগঠন। 

হরিকৃষ্ণ শরাফ এ ধরনের একটি সংগঠনের প্রধান। তিনি বলেন, শহরে গরুর অভাব ও সংস্কৃতি  পরিবর্তনের ফলে প্রথাটি উঠে যাচ্ছে। তাই প্রথাটি  ফিরিয়ে আনতে উত্তর ও পূর্ব কলকাতার কিছু আবাসনে রাখা হয়েছে গরুর ছবি আঁকা বাক্স। আগ্রহীরা রোজ সেখানে রুটি এবং তরকারির খোসা ফেলছেন। স্বেচ্ছাসেবকরা সেগুলো দিয়ে আসছেন বিভিন্ন গোয়াল ঘরে। 

তবে আগে এই প্রবণতার এত বেশি বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়নি বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের অনেকেই। তাঁদের আশঙ্কা, সময়ের সঙ্গে সংস্কৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তন রুখে দিয়ে ঐতিহ্য বজায় রাখার আপাত সাংস্কৃতিক চেষ্টার আড়ালে বিশেষ একটি রাজনৈতিক ধারণা শহুরে মানসিকতায় গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

অনেকেরই মনে পড়ছে সুকুমার রায়ের 'চলচ্চিত্তচঞ্চরী' নাটকের আশ্রমের কথা। সেখানে ছাত্রদের মাথায় ঢোকানো হতো সহজ বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে যে কোনো শব্দ বা বস্তুকে অবলম্বন করে তা থেকে পর্যায়ক্রমে নানা অনুভূতির ধারাকে ফুটিয়ে তোলা যায়। 

মগজ ধোলাইয়ের সেই রীতি অব্যাহত মেনে নিয়ে প্রবীণ সমাজতাত্ত্বিক আন্দ্রে বেতেই বলেন, 'প্রাচীনকালে মানুষ যেভাবে থাকত বা যা করত তাতে ফেরা আর সম্ভব নয়। সমাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তাকে পেছনো যায় না বা উল্টে দেওয়া যায় না। তাই এটা স্পষ্ট যে এর মধ্যে বিজেপির একটা প্রভাব রয়েছে।' 

সমাজতাত্ত্বিক রুচিরা ঘোষের ব্যাখ্যা হলো, 'সরস্বতী শিশু বিদ্যালয় বা দুর্গাবাহিনীর মতো সংগঠনের মাধ্যমে অনেক দিন থেকেই আরএসএস মূলত গ্রামবাংলায় তাদের রাজনৈতিক ভাবধারা অনুপ্রবেশে কাজ করছে। এখন পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আলোকপ্রাপ্ত শহুরে নাগরিকদের অন্দরমহল এবং মগজেও সনাতন ঐতিহ্যকে ছুঁয়ে থাকার অজুহাতে হিন্দুত্ববাদকে ঢোকানোর চেষ্টা হচ্ছে।'

এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন হরিকৃষ্ণ। ফুলবাগান, কাঁকুড়গাছি, লেক টাউন, বাঙুর, শ্রীভূমি এলাকায় সংগঠনের সদস্যরা রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, 'ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে গরু একাকার হয়ে আছে। গরুকে আমরা পুজো করি। কিন্তু গোমাতার অনেক কষ্ট। এ কারণে নতুন প্রজন্মকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে চাইছি।' ২০১৫ সালে প্রথম 'গরুর সঙ্গে সেলফি' প্রতিযোগিতা তরুণদের মধ্যে খুব সাড়া ফেলেছিল বলে দাবি করেন তিনি।

সম্প্রতি এমন সংগঠনের হাত ধরে কলকাতার কিছু উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির ছোট ছোট গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। এঁরা বেশিরভাগই বাঙালি। কেউ অধ্যাপক বা শিক্ষক, ব্যবসায়ী বা উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী। তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত মেডিটেশন, বৈদিক সংস্কৃতি, মন্ত্রের অর্থ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ পথশিশুদের স্কুল চালান। সেখানে পড়াশোনার সঙ্গে যজ্ঞের পদ্ধতি ও উপকারিতা, ঠিক মন্ত্রোচ্চারণ, যোগও শেখানো হয়।

প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় শহরে আয়োজন করা হয় বৈদিক যজ্ঞের। মন্দিরের বাইরে খাবার বিতরণ, গোয়াল ঘরের দেখাশোনা, মালিকানাহীন ও অসুস্থ গরুদের গোশালায় রাখা, গরুগুলোকে 'দত্তক' নিয়ে খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা করাও রয়েছে সংস্থাগুলোর কর্মসূচিতে। বাড়ির শিশুদের বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই গোশালায়।

গত কয়েক বছরে বেদ-পুরাণচর্চা, মন্ত্র, যজ্ঞ এবং গরুভক্তির উদ্‌যাপনকে কলকাতার নাগরিকরা প্রশংসা করেছেন। বিষয়টিকে দেশজ সংস্কৃতি, বিশ্বাসের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। 

এই ধরনের গোষ্ঠীগুলো অবশ্য রাজনৈতিক প্রভাবের কথা স্বীকার করতে নারাজ। দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা এক অধ্যাপক বলেন, 'আমরা পুরোপুরি অরাজনৈতিক, ধর্মমুখী কাজের স্বেচ্ছাসেবক। ভারতের মহান সংস্কৃতির গোড়ায় ফিরতে চাইছি। ফিরিয়ে আনতে চাইছি আধ্যাত্মিক শিক্ষার ঐতিহ্য।'

রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, 'এসব কর্মসূচির সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁরা কুসংস্কার ছড়াচ্ছেন কি-না, বলতে পারব না। তবে বেআইনি না হলে আমরা এমন কর্মসূচির বিরোধিতাও করছি না।' 

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা