kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

রোগ প্রতিষেধক টিকায় সন্দেহ 'গোটা বিশ্বের এক সংকট'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ জুন, ২০১৯ ১৪:৩১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোগ প্রতিষেধক টিকায় সন্দেহ 'গোটা বিশ্বের এক সংকট'

গত ১০০ বছরে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে রোগ প্রতিষেধক টিকা। কিন্তু অনেক দেশেই টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে, আর এই প্রবণতা এখন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বা ডাব্লিউএইচও, এই প্রবণতা সম্পর্কে এতটাই উদ্বিগ্ন যে তারা একে ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্য ১০টি চরম হুমকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

টিকা কাজ করে কীভাবে? 
রোগ প্রতিষেধক টিকা বা ইনজেকশনের মাধ্যমে রোগের দুর্বল কিংবা মৃত ব্যাকটেরিয়া রোগীর দেহে ঢোকানো হয়।

কীভাবে টিকা আবিষ্কৃত হলো? 
টিকা তৈরি হওয়ার আগে বিশ্ব ছিল অনেক বেশি এক বিপদজনক জায়গা। এখন সহজেই আরোগ্য করা যায় আগে এমন সব রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যেত।

টিকার ধারণা তৈরি হয় চীনে। দশম শতাব্দীতে 'ভ্যারিওলেশন' নাম এক চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল যেখানে অসুস্থ রোগীর দেহ থেকে টিস্যু নিয়ে তা সুস্থ মানুষের দেহে বসিয়ে দেওয়া হতো। এর আট শতাব্দী পর ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার দেখলেন, দুধ দোয়ান এমন গোয়ালিনী রয়েছেন গরু বসন্তে আক্রান্ত হলেও তাঁদের মধ্যে প্রাণঘাতী গুটি বসন্তের সংক্রমণ একেবারেই বিরল।

সে সময় গুটিবসন্ত ছিল সবচেয়ে ভয়ানক এক সংক্রামক ব্যাধি। এই রোগ যাদের হতো তাদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ মারা যেতেন। যারা বেঁচে থাকতেন তারা হয় অন্ধ হয়ে যেতেন, অথবা তাদের মুখে থাকতো মারাত্মক ক্ষতচিহ্ন।

১৭৯৬ সালে ড. জেনার, জেমস ফিপস্ নামে আট বছর বয়সী এক ছেলের ওপর এক পরীক্ষা চালান। তিনি গরুর বসন্ত, যেটি কোনো মারাত্মক রোগ নয়, তার থেকে পুঁজ সংগ্রহ করে সেটা ইনজেকশন দিয়ে ওই ছেলের শরীরে ঢুকিয়ে দেন। কিছুদিন পর জেমস ফিপসের দেহে গরুর বসন্তের লক্ষণ ফুটে ওঠে।

ওই রোগ সেরে যাওয়ার পর তিনি ছেলেটির দেহে গুটিবসন্তের জীবাণু ঢুকিয়ে দেন। কিন্তু দেখা গেল জেমস ফিপসের কোনো গুটি বসন্ত হলো না। গরুর বসন্তের জীবাণু তাকে আরও মারাত্মক গুটি বসন্ত থেকে রক্ষা করেছে।

ড. জেনারের এই পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় ১৭৯৮ সালে। এই প্রথম ভ্যাকসিন শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হলো বিশ্ব। 'ভ্যাকসিন' শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'ভ্যাক্সা' থেকে যার অর্থ গরু।

টিকা বা ভ্যাকসিনের সাফল্য কোথায়? 
গত এক শতাব্দীতে টিকা ব্যবহারের ফলে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক কমেছে। ১৯৬০ এর দশক থেকে হামের টিকা ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু তার আগে এই রোগে প্রতিবছর ২৬ লাখ লোক প্রাণ হারাতো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হামের টিকা ব্যবহারে মৃত্যুর সংখ্যা ৮০% কমে আসে। কয়েক দশক আগেও লক্ষ লক্ষ মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গুত্ব কিংবা মৃত্যু বরণ করতেন। এখন পোলিও প্রায় নির্মূল হয়েছে।

টিকা ব্যবহারে কেন কিছু মানুষের অনীহা? 
টিকা আবিষ্কারের সময় থেকেই চিকিৎসার নতুন এই পথ নিয়ে সন্দেহ ছিল। আগে মানুষ ধর্মীয় কারণে টিকার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। তারা মনে করতেন টিকার মাধ্যমে দেহ অপবিত্র হয়। এটি মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার খর্ব করে বলেও কিছু মানুষ মনে করতেন।

সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের বিভিন্ন জায়গাজুড়ে টিকাবিরোধী লীগ গড়ে ওঠে। তারা বিকল্প ব্যবস্থার পরামর্শ দিতেন, যেমন রোগীকে আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া। ব্রিটিশ টিকা-বিরোধী ব্যক্তিত্ব উইলিয়াম টেব যুক্তরাষ্ট্র সফর করার পর সেখানেও এই ধরনের সংগঠন গড়ে ওঠে।

সম্প্রতি টিকা-বিরোধী ব্যক্তিত্বদের একজন হলেন অ্যান্ড্রু ওয়েকফিল্ড। তিনি ১৯৯৮ সালে এক রিপোর্ট প্রকাশ করেন যেটিতে তিনি এক ভুল তথ্য উপস্থাপন করেন যাতে তিনি দাবি করেন এমএমআর ভ্যাকসিনের সঙ্গে অটিজম এবং পেটের অসুখের যোগাযোগ রয়েছে।

এমএমআর হচ্ছে একের ভেতর তিন টিকা। এটি  শিশুদের ওপর ব্যবহার করা হয় হাম, মাম্পস, এবং রুবেলা (যাকে জার্মান মিসলস বলা হয়) প্রতিরোধের জন্য। পরে তাঁর ওই গবেষণা ভুয়া বলে প্রতিপন্ন হয় এবং তার মেডিক্যাল ডিগ্রি কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর ওই দাবির পর টিকা নেওয়া শিশুর সংখ্যা কমে আসে। শুধুমাত্র ব্রিটেনেই ২০০৪ সালে এক লক্ষ শিশু কম টিকা নেয়। এর ফলে সে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যায়।

টিকাদানের ইস্যুটিকে ঘিরে রাজনীতিও বাড়ছে। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাত্তেও সালভিনি বলেছেন তিনি টিকা-বিরোধীদের দলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই বলার চেষ্টা করেছিলেন  টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সম্প্রতি তিনি সব শিশুকে টিকা দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

টিকা নেওয়ার ঝুঁকি কোথায়? 
যদি জনসংখ্যার একটা বড় অংশ টিকা নেন তবে  রোগের বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এর ফলে যাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাও রোগের কবল থেকে রক্ষা পান। একে বলা হয় 'গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিরোধ'। কিন্তু এই ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন ঘটলে সেটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিরোধের জন্য কত লোককে টিকা দিতে হবে তা নির্ভর করে রোগের ওপর। যেমন, হামের ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীর ৯৫% লোককে টিকা দিতে হয়। কিন্তু কম সংক্রামক ব্যাধি পোলিওর জন্য ৮০%-র বেশি হলেই চলে।

গতবছর নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে অতি-কট্টর ইহুদি মহল্লায় কিছু লিফলেট বিতরণ করে বলা হয়েছিল টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক রয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য ঐ গোষ্ঠীকেই দায়ী করা হয়েছিল।

গতবছর ইংল্যান্ডের সবচেয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসক  হুঁশিয়ার করেছিলেন এই বলে যে সাধারণ মানুষ যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় টিকার ওপর ভুয়া খবর পড়ে প্রতারিত না হন।

মার্কিন গবেষকরা দেখিয়েছেন রাশিয়ায় তৈরি কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করে অনলাইনে টিকার ওপর মিথ্যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে যা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। সারা বিশ্বে ৮৫% শিশুকে টিকা দেওয়ার হার গত কয়েক বছর ধরে অপরিবর্তিতই রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকার কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ২০ থেকে ৩০ লক্ষ শিশুর প্রাণরক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। যেসব দেশে যুদ্ধবিগ্রহ চলেছে বা যেখানে স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল সেখানে টিকা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বেশি। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, উন্নত দেশগুলিতেও এই বিষয়ে একটা ঢিলেমি এসেছে। কারণ এসব রোগ যে কত ভয়াবহ হতে পারে সেটি তাঁরা ভুলেই গেছেন।

সূত্র : বিবিসি বাংলা  

মন্তব্য