kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

ছিলেন চিরশত্রু, এখন ঘর করছেন এক সঙ্গে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৫ জুন, ২০১৯ ১৮:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ছিলেন চিরশত্রু, এখন ঘর করছেন এক সঙ্গে

মানুষ বেঁচে থাকলে যে বদলে যায়, এটাই তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। একসময় যে দু'জন একে অপরকে চিরশত্রু ভাবতেন,  সেই তারাই এখন সুখে সংসার করছেন। ঘর আলো করে এসেছে এক মেয়ে। 

তারা হলেন, গৌরি মালা এবং রোশান জায়াথিলা। তাদের মেয়ের বয়স এখন ১১ মাস। অথচ ১০ বছর আগেও তারা শত্রু ছিলেন। জানা গেছে, ২৬ বছর বয়সী গৌরি ছিলেন শ্রীলঙ্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগার্সদের শিশু যোদ্ধা। রোশানের মতো মানুষদের বিরুদ্ধে ছিল তার লড়াই।

গৌরি মালা বলেন, সিংহলীদের দেখতেই পারতাম না। তাদের সঙ্গে কখনো কথা বলিনি আমি। আমরা ভাবতাম এরা খারাপ মানুষ এবং আমাদের হত্যা করবে।

অন্যদিকে রোশানের জন্য বিদ্রোহীরা ছিল ঘৃণিত শত্রু। ২৬ বছর ধরে চলা যুদ্ধে যাদের বোমা হামলা প্রাণ কেড়ে নেয় নিষ্পাপ মানুষের। ২৯ বছর বয়সী রোশান বলেন, আমরা একে অপরকে শত্রু ভাবতাম। কিন্তু এখন আমরা সুখী দম্পতি। আমাদের মেয়ে আমাদের ভালোবাসার প্রতীক।

গৌরির জীবনে যুদ্ধ ছিল নিয়মিত বিষয়ের মতো। তবে এটা স্থায়ীভাবে বদলে যায় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। যখন গৌরি জানতে পারেন, তার বড় ভাই শুভ্রমানিয়াম কান্নান ট্রাক্টর চালানোর সময় গোলার আঘাতে আহত হয়েছেন।

ভাঙা মন নিয়ে বড় ভাইকে খুঁজতে গিয়ে বিদ্রোহীদের হাতে অপহৃত হন তিনি। ১৬ বছর বয়সী গৌরিকে এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠায় তারা।

গৌরি বলেন, আমি দেখলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে মানুষ। আমার এক বান্ধবী বোমার আঘাতে আহত হয়। আমরা তাকে ওঠানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সে একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল চিবিয়ে খেয়ে আত্মহত্যা করে। কারণ, তার ক্ষতগুলো এতই মারাত্মক ছিল যে বেঁচে থাকাটা তার কাছে নিরর্থক ছিল। আমাদের গোসল এবং খাবারের কোনো সুব্যবস্থা ছিল না। এক সময় আমার মনে হতে লাগলো যে বেঁচে থেকে লাভ কী?

অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আর সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝে অবস্থিত ভাবুনিয়া জেলায় রোশানের পারিবারিক গ্রামে হিন্দু নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে আঘাত হানে বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি বোমা। এর পরপরই বোমা হামলায় সামরিক-বেসামরিক মানুষদের মৃত্যুর ক্ষোভে বাবা আর চাচাত ভাই-বোনদের মতোই সরকারি নিরাপত্তা বিভাগে যোগ দেন রোশান।

রোশান বলেন, আমরা প্রায় প্রতিদিনই হামলার খবর শুনতাম। সংঘাতে নিজের এক ভাইকে হারাই। মানুষ ভীত ছিল। মারা পড়ার ভয়ে এক সঙ্গে কোথাও ঘুরতেও যেতো না কেউ।

প্রায় এক মাস যুদ্ধ করেছে গৌরি। হৃদযন্ত্রে ত্রুটি থাকার কারণে গৌরিকে মুক্ত করে দেন তার দলনেতা। এর পরেই শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে গৌরি।

সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচিতে পাঠানো আরো অনেক বিদ্রোহীদের সঙ্গে ছিলেন তিনি। বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব থাকলেও সিংহলীদের সঙ্গে মিশে গৌরি অনুভব করেন, তারাও ‘মানুষ’। এরপর সরকারি নিরাপত্তা বিভাগে যোগ দেন তিনি।

উত্তরাঞ্চলে কিছু খামার প্রতিষ্ঠা করেছিল সরকার। আর উদয়নকাট্টুতে এরকমই একটি খামারে পরিচয় হয় গৌরির স্বামীর সঙ্গে।

২০১৩ সালে সেখানে নিয়োগ পান গৌরি। আর সেখানে এক বছর আগে থেকেই কাজ করছিলেন রোশান। তবে তামিল-ভাষী মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় বেশ ঝামেলায় ছিলেন তিনি।

রোশানের দোভাষী হিসেবে কাজ করতেন গৌরি। যে তার জীবন বদলে দিয়েছিলেন। গৌরি বলেন, তিনি নিশ্চয়ই একা হয়ে পড়েছিলেন। আমি চাইতাম তিনি যেন ভালো থাকেন। তাই বাসা থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে আসতাম।

গৌরি বলেন, আমি তাকে বলেছিলাম, আমি তাকে তার মায়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।

রোশান বলেন, আমি যখন ছুটিতে যেতাম, তখন গৌরি কান্নাকাটি করতো। সে নিশ্চিত হতে চাইতো যে টিকে থাকার মতো পর্যাপ্ত অর্থ আমার কাছে আছে কি না।

রোশানের মা তাদের বিয়ের বিপক্ষে ছিলেন। গৌরির বোনও বিপক্ষে ছিলেন। তার ধারণা ছিল সিংহলী কাউকে বিয়ে করলে সম্প্রদায় থেকে বের করে দেয়া হবে গৌরিকে। আর তার স্বামীও তাকে মারপিট করবে।

তারা বলেন, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দেখে দুই পরিবার তাদের মেনে নিতে রাজি হয়।

গৌরি বলেন, ধীরে ধীরে সব কিছু ঠিক হয়ে যায়। আমাদের ছোট্ট ফেরেশতা আমাদের আরো বেশি কাছে এনেছে। রোশান আমার বোনের ‘সবচেয়ে পছন্দের দুলাভাই’ হয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা