kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির পথচলা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৫ জুন, ২০১৯ ১৩:৪২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির পথচলা

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার সুন্দরবন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই উপকূলীয় বনের কোলঘেঁষে রয়েছে অনেক জনপদ। তেমনই একটি জনপদের নাম কয়রা। খুলনা জেলার সর্বদক্ষিণের উপজেলা কয়রা জেলা সদর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এই জনপদে বসবাসরত মানুষগুলো প্রতিনিয়ত হিংস্র বাঘ আর কুমিরের সাথে লড়াই করে বাঁচে। তবুও এদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় সুন্দরবন। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ করে বেঁচে থাকে এই জনপদের মানুষগুলো। শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে পড়া এইসব মানুষ ডুবে থাকে কুসংস্কারে। 

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এবং দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদেরকে উচ্চশিক্ষা লাভের স্বপ্ন দেখাতে কাজ করে যাচ্ছে এক দল ছেলে-মেয়ে। তাদের স্লোগান- 'দূর করে সব অন্ধকার, কয়রা গড়ার অঙ্গীকার'।

গল্পটা প্রথম থেকেই বলি। কয়রা জনপদের কিছু মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে। দক্ষিণ বঙ্গের সেরা বিদ্যাপীঠ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ালেখা করছে সুন্দরবনের কোল থেকে উঠে আসা কয়রার কিছু ছেলেমেয়ে। ক্যাম্পাসে চলার পথে দেখা সাক্ষাৎ হলে তারা গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে পরিকল্পনা করে কিভাবে এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো একটু এগিয়ে নেওয়া যায়, এলাকার পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা লাভের স্বপ্ন দেখানো যায়- দুই একজনের পক্ষে এই কাজগুলো করা সম্ভব না। একটা সংগঠনের মতো দাঁড় করালে সেটা আরো সহজ হয়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হলো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কয়রা উপজেলার সব শিক্ষার্থীদের একটা প্ল্যাটফর্মে আনার কাজ। খুঁজে পাওয়া গেল অনেক শিক্ষার্থী যারা কয়রার অধিবাসী, খুঁজে পাওয়া গেল কিছু শিক্ষক, তারাও কয়রার। সবার সম্মতিক্রমে ২০১৭ সালের ২৭ জানুয়ারী যাত্রা শুরু করল একটা স্বেচ্ছাসেবী অরাজনৈতিক সংগঠন- কয়রা ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলি। 

এবার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার পালা। যেহেতু এই সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো- শুধু নিজেরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না হয়ে এলাকার পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের হাত ধরে তুল নিয়ে আসা। সুতরাং এ অনুযায়ী কাজ শুরু হলো।

প্রথম কাজ মেধা অন্বেষণ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর ঈদের পর কয়রার মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে একটা মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সৃজনশীল ধারার প্রশ্নের মাধ্যমে প্রথমে পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাছাইকৃত ছাত্র-ছাত্রীরা একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। সেই সেমিনারে অনেক উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ এবং নিজ ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিরা অণুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করে থাকেন। কিভাবে পড়ালেখা করলে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, অভীষ্ট স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়, এসব বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করা হয়। সেই অনুষ্ঠানেই বাঁছাইকৃত সেরা ১০ জন মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে পুরস্কৃত করা হয়। 

এই সেমিনারের ইতিবাচক ভূমিকা ছড়িয়ে পড়েছে কয়রা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে। অল্প দিন আগের প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন কয়রা উপজেলার একটা রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।

ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি কারিমুন নেছা বলেন, 'আমরা যখন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছি, তখন আমাদের গাইড দেয়ার মতো কেউ ছিলো না, স্বপ্ন দেখানোর মতো কেউ ছিলো না। বিশ্ববিদ্যালয় কি জিনিস আমরা জানতাম না। এইজন্য আমরা চাই এলাকার ছেলেমেয়েগুলো আমাদের মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা পাক, কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাক।'

সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা, বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান বলেন, 'আমার কয়রা উপজেলা অবহেলিত একটা জনপদ। ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির এই ছেলেমেয়েগুলো অবহেলিত জনপদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এটা অনেক আনন্দের একটা বিষয়। এইসব ইতিবাচক কার্যক্রমের মাধ্যমে কয়রাতে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।'

ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির কর্মকাণ্ডের মধ্যে আরো রয়েছে অস্বচ্ছল ছাত্রছাত্রীদের টিউশনির ব্যবস্থা করে দেওয়া, গরিব মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান, রক্তদান ইত্যাদি।

সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনের এই বিভিন্ন কার্যক্রমের আর্থিক সংস্থান হয় মাসিক চাঁদা থেকে, প্রতিষ্ঠিত সিনিয়রদের ডোনেশন থেকে এবং কয়রা উপজেলার অধিবাসী যারা বিভিন্ন চাকরি, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত তাদের কাছ থেকে। 

কয়রা ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির এই ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন উক্ত আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার প্রমুখ। 

এই বছর ঈদুল ফিতরের পর মেধা অন্বেষণ ও সেমিনার অনুষ্ঠানে ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির প্রথম স্মরণিকা 'চিহ্ন'র মোড়ক উন্মোচন করা হয়। 

বার্ষিক বনভোজন, ইফতার মাহফিল ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে অটুট থাকে ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলির সদস্যদের সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। ভবিষ্যতে আরো ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্ব মহিমায় উজ্জ্বল থাকবে কয়রা ম্যানগ্রোভ ফ্যামিলি অব খুলনা ইউনিভার্সিটি, এমন প্রত্যাশা সবার।

লেখক :  আশরাফুল ইসলাম

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা