kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

আদালতে বুড়ো দানব বনাম কম বয়সী ধর্ষিতার সাহসিকতা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ জুন, ২০১৯ ১৭:১৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আদালতে বুড়ো দানব বনাম কম বয়সী ধর্ষিতার সাহসিকতা

তিনি কেভিন রো, যিনি মেয়েটির ১১ বছর বয়স থেকে যৌন নির্যাতন করে যাচ্ছিলেন

সাহসীকতার নমুনা বিভিন্ন ঘটনায় বিভিন্ন চেহারায় ফুটে উঠতে পারে। এ সপ্তাহের শুরুতেই এমনই একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শন খবর হতে পারে। ব্রিটেনের 'হাল ক্রাউন কোর্ট'-এ এমনই এক ঘটনা চোখের সামনে দেখেছেন এক সাংবাদিক। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম হাল লাইভ এর প্রতিবেদক আনগুস ইয়ং। 

তিনি লিখেছেন, ওই কোর্টে দেখা গেলো, এক কম বয়সী মেয়ে বসে রয়েছেন পাবলিক গ্যালারিতে। বিচারের উপসংহার টানার সময় জুরি ফোরম্যান দাঁড়িয়ে গেলেন। মেয়েটির ওপর যৌন হামলার ৬টি চার্জকে ভিত্তি করে আনীত একাধিক অভিযোগ তুলে ধরে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করতে একমত হয়েছেন বিচারিক আদালত। এর মধ্যে দুবার ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে।  

ডকে বসে আছেন ৬৩ বছর বয়সী অভিযুক্ত কেভিন রো। তিনি আলতো করে দু'চোখ বন্ধ করেছেন। হালকাভাবে শ্বাস নিচ্ছেন। আর কয়েক মিনিট বাদেই তাকে সাড়ে ১২ বছরের জেল দেবেন বিচারক। 

ওই কম বয়সী মেয়েটিই কেভিনের যৌন নির্যাতনের শিকার। অভিযোগে বলা হয়, মেয়েটির ওপর যৌন নিপীড়ন শুরু হয় যখন তার বয়স মাত্র ১১। কোনোভাবে মেয়েটি আনীত অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ জোগাড়ে সক্ষম হয়েছেন। 

রো নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। বিচারকার্য চলার পুরোটা সময় ধরে প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে মেয়েটিকে যেতে হয়েছে। কেভিন নিজেকে নির্দোষ বললেও সোশাল মিডিয়ায় মেয়েটিকে কেভিনের পাঠানো যৌনতাপূর্ণ বার্তাগুলোই তার অনৈতিক কর্মের প্রমাণ বহন করে। 

জুরি বিভিন্ন রায় প্রদান করতে পারতেন। তবে ওই আদালতে উপস্থিত থাকাটা সত্যিকার অর্থেই মেয়েটির সাহসিকতা প্রকাশ করে। ফোরম্যান যখন দাঁড়ালেন তখন তার মনে ঝড় বয়ে যাওয়ার কথা। 

মেয়েটি দেখল, যে মানুষটি তাকে নিপীড়ন ও ধর্ষণ করেছে তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

যৌন লালসার শিকার হওয়া এক বিচারপ্রার্থীর বিবৃতি অন্যদেরও ছুঁয়ে যায়। একই ঘটনা আরো দুটি মামলার সময় দেখা গেছে। এ দুটি মামলাও যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত। সাংবাদিক হিসেবে স্থানীয় সরকার কাভার করতে গিয়ে আদালতের এসব ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছি আমি।  

ওই তিনটি ঘটনাই মূলত বয়স্ক যৌন নির্যাতনকারীর শিকার কম বয়সী মেয়েদের করুণ গল্পই উঠে এসেছে। শারীরিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত তো হয়েছেনই, তাদের মানসিক অবস্থার কথা জানাটাও যেকোনো মানুষের জন্যে হৃদয়ভাঙার কারণ হবে। 

শান্তিপূর্ণ ঘুম অসম্ভব মেয়েটির জন্যে। দুঃস্বপ্ন আর উদ্বেগ তার প্রতিদিনের সঙ্গী। যেকোনো পুরুষের প্রতি অবিশ্বাস চলে আসাও বিচিত্র নয়। 

আদালত শেষ হওয়ার পর দেখলাম মেয়েটি বের হওয়ার দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে ছিলেন তিনজন। তারা তাকে আশ্বস্ত করতে এসেছেন। তাদের মধ্যে একজন কম বয়সী ছেলেও আছেন। তিনি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন। ভদ্রোচিতভাবে একটা হাত তিনি মেয়েটির পিঠে রাখলেন। কিন্তু এতদিনের বিদঘুটে অভিজ্ঞতা এবং প্রবৃত্তিগতভাবেই মেয়েটি ঝট করে হাতটি সরিয়ে দিলেন। 

আমি (সাংবাদিক) নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, ছেলেটি কোনো বাজে উদ্দেশ্য নিয়ে মেয়েটির পিঠে হাত রাখেননি। অথচ মেয়েটির দিকে যিনি নিরাপত্তা ও আশ্বস্তের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেই হাতটিকেও নিরাপদ মনে হচ্ছে না তার কাছে। তবে মেয়েটির ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধ যে তার ভেতরের দানবগুলোকেও জাগিয়ে তুলতে পারে সে সম্ভাবনাও দেখলাম আমি। 

বাস্তবতা হলো, মেয়েটিকে ওই দানগুলোর সঙ্গেই বাস করতে হবে, যাদের দেখলে আমার আত্মাটাও ভয়ে কুঁকড়ে যায়। 

মেয়েটি নির্দোষ হলেও এ ঘটনা তাকে আজীবনের শাস্তি দিয়ে দিয়েছে। আমি পুরস্কারের প্রতি আকৃষ্ট নই। কিন্তু আদালতে মেয়েটি সে সাহসিকতা দেখিয়েছেন তার জন্যে তাকে একটা ডিনার প্লেটের সমান মেডেল দেয়া যেতে পারে। এটা মেয়েটির মতো অন্যরাও পাওয়ার যোগ্য। 
সূত্র: হাল লাইভ 

মন্তব্য