kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

'তারা ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে এবং আমাকে প্রচুর অর্থ দেয়'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ জুন, ২০১৯ ১৩:২৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'তারা ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে এবং আমাকে প্রচুর অর্থ দেয়'

ইতালিস্থ মার্কিন অ্যাম্বেসি থেকে জিওভান্নিকে চাঁদের নমুনা সংগ্রহ করতে বলা হয়। ইনসেটে বিজ্ঞানী, তাঁর বয়স এখন ৮৭ বছর

আমি জন্মেছিলাম ইতালির দক্ষিণের পাহাড়ি অঞ্চলের একটি শহরে। সেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কী তা জানা ছিল না। কিন্তু একই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কাজ করার জন্যে আমাকে সৃষ্টি করা হয়নি। নতুন কিছু শেখা এবং সৃষ্টি করাই ছিল আমার সহজাত প্রবণতা। সপ্তম জন্মদিনে যখন আমি একটা কলম উপহার পেলাম, আমি এটাকে লেখার কাজে ব্যবহার করিনি। ওটাকে নিয়ে আমি বাথরুমে চলে গেলাম এবং এর বিভিন্ন অংশ খুলে ফেললাম। কাজেই এদিক থেকে আমার বেশ নাম ছড়াল। সবাই বলতেন, যদি তুমি জিওভান্নিকে একটা উপহার দাও তবে সে ওটাকে নষ্ট করবে। 

বিভিন্ন জিনিস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ইচ্ছা নিয়ে বড় হতে থাকলাম আমি। একদম সত্যিকারের পরীক্ষা। তাই আমি লেখাপড়ায় শ্রম দিতে থাকলাম। রসায়নবিদ্যাকে মেজর করে শেষ অবধি শিকাগোতে পড়ার জন্যে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ পেলাম। ওই সময়গুলো আমার জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং সুন্দর বছর ছিল। আমার প্রফেসরদের ৫ জনই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। যদি আপনার একটা নোবেল প্রাইজ না থাকে তবে আপনার কিছুই নেই। এই মানুষগুলো আমার কাছে ঈশ্বরের মতো ছিলেন। একবার আমরা একসাথে একটি ক্যাফেটেরিয়াতে খেতে বসি। সেখানে আমি যে যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘাম ঝরাচ্ছি তার বিষয়ে মনোযোগ কাড়লাম। এর নাম ম্যাস স্পেকট্রোমিটার। এটার মাধ্যমে বাষ্পীয় অবস্থায় অণু এবং মলিকিউলকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। এটাকে নিয়ে আমার গবেষণা খুবই সফল পর্যায়ে ছিল। বেশ কিছু মলিকিউল আবিষ্কার করছিলাম এবং এদের মধ্যে কয়েকটি সত্যিই অন্যরকম। এরা উচ্চতাপ প্রতিরোধী। 

মার্কিন সরকার আমার মলিকিউলগুলোর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। তখন অবশ্য তারা রাশিয়ার সাথে ব্যাপক প্রতিযোগীসুলভ আচরণ করতো। আমেরিকা আমাকে তাদের পরীক্ষাগারে কাজের প্রস্তাব দিলো। তবে আমি তা করতে চাইনি। ইতালির প্রতি আমি আকৃষ্ট। সেখানকার শৈল্পিক ঐতিহ্যকে আমি মিস করবো। সেখানকার মানুষের উষ্ণতা মিস করবো। সেখানে রাস্তায় কাপড় নেড়ে দেয়া আর আর খোলা জানালায় বসে গান গাওয়া খুব মিস করবো। তাই আমি গবেষণাকর্ম রোমে চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করি। আমি সিলিকন কার্বাইড বিশেষজ্ঞ এবং আমার যাবতীয় তথ্য নাসায় প্রেরণ করি। আমি জানতাম না তারা আসলে এসব কাগজপত্র কীভাবে ব্যবহার করবে। কারণ, এগুলো সবই নাসার গোপন কাগজ। তবে জানতাম, তারা কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করবে। তারা আমাকে গবেষণায় ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে এবং আমাকে প্রচুর অর্থ দেয়। তারপর আসলো ১৯৬৯ এর সেই দিন। চাঁদে গেলো অ্যাপোলো ১১। চাঁদের অনেক নমুনা নিয়ে ফিরে এলো পৃথিবীতে। কিন্তু এসব নমুনার কিছুই ইতালিতে দেয়া হলো না। আমাদের ১৫টি গবেষণাগার কোনো আশা ছাড়াই প্রস্তাব পাঠায় তাদের কাছে। 

সবার মনে বিস্ময় ছিল, ইতালিকে কেন দেয়া হবে না? আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি, চাঁদের একটা নমুনা দিয়ে আমি কী করতে পারি? তারপর আমি একটা পরিকল্পনা করলাম। যদি আমি এটাকে বাষ্পীয় অবস্থায় নিয়ে যাই, সম্ভবত আমি আদিম নিহারিকার মলিকিউল মিশ্রন সম্পর্কে বুঝতে পারবো। আর এটাই সৌর সিস্টেমের মূল রহস্য। কিন্তু অন্যরা ভাবতো যে আমি পাগল। চাঁদের উপাদানকে বাষ্পে পরিণত করা? এমন কাজ কার মাথায় আসতে পারে! আমি আমার প্রস্তাব পাঠালাম। পরে এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সংবাদপত্রে একটা খবরের শিরোনাম দেখলাম- 'চাঁদের নমুনা ইতালির বিজ্ঞানীর কাছে, জিওভান্নি ডি মারিয়া'। আর তার পরের দিন একটা টেলিগ্রাম পেলাম আমি। আমেরিকান অ্যাম্বেসি থেকে চাঁদের মাটির নমুনা সংগ্রহ করতে বলা হলো। এই সেই সময়, যখন চাঁদের মাটি পাঠানো হলো আমার কাছে।

চাঁদের মাটির মলিকিউলার কম্পোজিশন জানতে আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। চাঁদের ১১ শতাংশ লাইমনাইটে গঠিত। এটা এমন এক ধাতু যাতে সীমার মধ্যে অক্সিজেন রয়েছে। যদি এটাকে হাইড্রোজেনের সাথে বিক্রিয়া ঘটানো হয়, তবে পানি উৎপন্ন হবে। কাজেই চাঁদে পানি রয়েছে! পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করা যায় সোলার এনার্জির মাধ্যমে। চল্লিশ বছর আগে এই গবেষণা পুরো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর অর্থ লুনার কলোনির সম্ভাবনা। কিন্তু এ নিয়ে আর কেউ কোনো কথা বলেনি। কারণ কিছু একটা ঘটেছিল। তখন সবাই মঙ্গল নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। আমার মাথায় এটা কোনভাবেই আসতো না। মঙ্গল আমাদের থেকে কত দূরে! কিন্তু চাঁদ পৃথিবীর কত কাছে। কাজেই চাঁদ নিয়েই আগ্রহী কেন হবো না আমরা? সম্প্রতি চাঁদ আবারো মনোযোগের কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। মঙ্গল এখন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। মানুষ আবারো চাঁদের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। 

এবং আমি প্রস্তুত। আমি এ গবেষণা পঞ্চাশ বছর ধরে করছি। আমার বয়স এখন ৮৭। কিন্তু আমার মানসিক অবস্থা পুরোপুরি ঠিক। আরো অনেক কিছু করার আছে আমার। আমি এখন ফোনের অপেক্ষায় থাকি। কারো কাছে যদি পর্যাপ্ত অর্থ থাকে, তবে চাঁদ নিয়ে কাজ করে যেতে প্রস্তুত। 

লেখক: জিওভান্নি ডি মারিয়া (রোম, ইতালি) 
(সোশাল নেটওয়ার্ক থেকে সংগৃহিত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা