kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

পদ্মাপাড়ের সক্রেটিস ...

সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নূ   

১০ জুন, ২০১৯ ১৮:৩৬ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পদ্মাপাড়ের সক্রেটিস ...

তাঁকে যতই দেখি, বিস্ময় বাড়ে ততই! হিমালয়ের মত মানুষ অথচ কত শুভ্র, সরল, সোঁদামাটির গন্ধমাখা প্রাণবন্ত পুরুষ।

পদ্মাপারের এই মানুষটি ৭৮ বছর বয়সেও ভীষণ তরুণ। তরুণরাই তাঁর বন্ধু, স্বজন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, প্রগতিচিন্তায়, শত শত তরুণের হৃদয়ে নিয়ত প্রজ্জ্বলিত দীপশিখা, ছায়াময় বটবৃক্ষ।

নাম তাঁর হরিপদ সূত্রধর।

জীবনটা কেটেছে শিক্ষকতায়, প্রগতিপন্থী রাজনীতির সুশীতল ধারায়। পাটগ্রাম সরকারি অনাথবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পদ্মার সর্বগ্রাসী ভাঙনের দুঃসহ অভিজ্ঞতাকে সাথে নিয়ে বড় হয়েছেন।

পৈত্রিক নিবাস ছিল হরিরামপুরের হরিণায়, পদ্মার ছোবলে হরিণার ঠিকানা হারিয়ে ঠাঁই নিয়েছিলেন চকিঘাটায়, সেখানেও পদ্মার ছোবল। অবশেষে থিতু হয়েছেন হরিরামপুরেরর বয়রায়। কত উত্থান, কত পতন, কত সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প, হিংসার হলিখেলা। তবুও হরিরামপুরের মাটিকে ফেলে কোথাও যাননি। পদ্মাপারের মাটি তাঁর "মায়ের মত"।

বাম রাজনীতি করেছেন, অভিনয় করেছেন, নাটক লিখেছেন ৩০টি।
শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চেও তার নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে। নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন অনেক। 
পদ্মা ও তার ভাঙনের বিভীষিকা নিয়ে লিখেছেন,"বহে পদ্মা নীল রঙ" নাটকটি।

তিনি বয়ষ্ক ভাতা সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞাপন চিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন তাঁরই ছাত্র শুভ ঘোষের অনুরোধে। তবে অভিনয়ে রাজি হবার সময় শর্ত দিয়েছিলেন, অভিনয়ের জন্য কোন পারিশ্রমিক নেবেন না। নেনও নি।

আমার জানা মতে তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি, যাঁর জীবদ্দশায় তাঁর স্মারকগ্রন্থ "হরিপদ সূত্রধর স্মারকগ্রন্থ" প্রকাশিত হয়েছে। আর এই স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন তাঁরই কৃতি ছাত্র আইন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তৈয়েবুল আজহার।

শিক্ষকতায় অবসর তাঁর কাগজে কলমে। প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মিনিটে এখনও তিনি শিক্ষক। প্রতিক্ষণেই শেখান মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মাটি, মানুষ, প্রকৃতির পাঠ।

তিনি যখন হাঁটেন, মাঠে বসেন, আড্ডা দেন, তখন হটাৎ, দূর থেকে দেখলে মনে হবে শিষ্যপরিবেষ্টিত সক্রেটিস।

আসলেই তিনি পদ্মাপারের জনপদ হরিরামপুরের সক্রেটিস।

আমার সাথে তাঁর পরিচয়ের দৈর্ঘ ক্ষুদ্রতর। নাম শুনেছি যত, দেখা, সান্নিধ্য নিয়েছি তত কম।

গতবছর হরিরামপুর পাবলিক লাইব্রেরির নবযাত্রার আয়োজনের দিন তাঁর পা ছুঁয়ে যখন সালাম করেছি,তখন আমার দেহ মনে অন্য এক শিহরণ টের পেয়েছি। 

অনুষ্ঠানে যতক্ষণ থেকেছি, স্যারের উপর থেকে নজর সরাই নি।

দেখেছি এলাকার মানুষ, তরুণ, শিশু, কিশোর, সবার কি অসীম শ্রদ্ধা তাঁর প্রতি। 

ডাকসাইটে আমলা, বিচারক, প্রতাপশালী রাজনীতিক, অধ্যাপকসহ খেঁটে খাওয়া মানুষেরাও কি অবলীলায় তাঁর কাছে শ্রদ্ধায় নত হয়, কথা বলে, না দেখলে বোঝানো কঠিন।

এই ছবিগুলো দেখুন, গত শুক্রবার "পদ্মার ভাঙন ঠেকাও হরিরামপুর বাঁচাও" ফেসবুক গ্রুপের ডাকে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সবার আগে এসেছিলেন তিনি। কারন যাঁরা এই ডাক দিয়েছে তারা তার আত্মার আত্মীয়, ছাত্র, তিনিই তাদের প্রেরণার বাতিঘর।

দেখুন কত অনায়াসে বসে আছেন ঘাঁসের উপরে, মাটিতে। শত ডাকেও মাটি ছেড়ে চেয়ারে বসেননি। বলেছেন, "দূর থেকে কষ্ট করে যারা এসেছেন, তাদের আগে বসতে দাও।"

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা