kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

একজন পূর্ণেন্দু দা, ফুটপাতে বসেই লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ মে, ২০১৯ ১৪:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একজন পূর্ণেন্দু দা, ফুটপাতে বসেই লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ফুটপাতের দেয়াল। তার খাঁজে সাজিয়ে রাখা বইয়ের স্টল। ষাট ছুঁই ছুঁই আটপৌরে মানুষটি সেখানে বই বিক্রি করেন- সেটি বড় খবর নয়। বই অনেকেই বিক্রি করেন।

কিন্তু স্টলটি পূর্ণেন্দু ঘোষের ব্যক্তিগত 'গবেষণা কেন্দ্র'ও। সেখানে বসে দিনভর নানা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন, লেখালিখি করেন স্টলের মালিক, সবার পুণ্যদা। বই বিক্রি করার ফাঁকেই তিনি লিখে ফেলেছেন সুন্দরবনের একাংশের ইতিহাস। সেই বই সমাদৃত হয়েছে গবেষক মহলে।

এ পর্যন্ত বেরিয়েছে তাঁর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। তাঁর পরবর্তী বইয়ের বিষয়, সুন্দরবনের নদীনালার ইতিহাস এবং নদী-মানুষ সম্পর্ক। নিজেকে পরিচয় দেন 'শব্দশ্রমিক' হিসেবে।

নিজের বাসস্থান ক্যানিং সম্পর্কে লেখা পূর্ণেন্দুর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে গত বছর। ওই বছর  কলকাতা আর্ন্তজাতিক বইমেলায় বইটি বের হয়। বিভিন্ন বিচিত্র পেশায় যুক্ত থেকেছেন ফুটপাতের এই মানুষটি। লেখার পাশাপাশি বই সম্পাদনাও করেছেন কয়েকটি।

স্থানীয়রা তাঁকে বলেন 'অন্য রকম' মানুষ। থাকেন ক্যানিংয়ের এক নম্বর দিঘির পাড় এলাকায়। ক্যানিং থেকে যাতায়াত করেন প্রতিদিন। কাঁধে ঝুলে থাকে একটি ঝোলা ব্যাগ। পড়াশোনার প্রয়োজনীয় বইপত্রে ঠাসা। দোকানে এসে শুরু হয় লেখালেখি। ফাঁকে ফাঁকে বেচাবিক্রি। দিনভর ফুটপাথে থেকে বাসায় ফেরেন রাতে। বাড়ি ফিরে আবারও বসে পড়েন কাগজ-কলম নিয়ে।

বাবা ছিলেন তালাচাবির মিস্ত্রি। প্রবল দারিদ্র নিত্যসঙ্গী। আড়বাঁশি বাজানোরও নেশা ছিল। যাত্রাপালায় বাঁশি বাজাতেন। সেই থেকে তাঁর মগজেও ঢুকে পড়ে সাহিত্য, সংস্কৃতি, আঁকাআঁকির ভূত। তাঁর কথায়, 'ছাত্র খুব খারাপ ছিলাম না। কিন্তু স্কুলের পর পড়াশোনা আর তেমন হল না। স্থানীয় স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হলাম। কিন্তু প্রবল অর্থকষ্ট। ডিগ্রিটা শেষ করতে পারলাম না।' 

চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে পুণ্য দা বলতে থাকেন, 'সংসারে অর্থ দিতে হত। তাই উপার্জন শুরু করলাম। বিচিত্র সব কাজ। কিন্তু ছোট থেকেই লিখতে ভালোবাসতাম, তাই লেখাটা কখনও ছাড়িনি। সারা দিনের পরিশ্রমের পর বাড়ি ফিরে লিখতে বসতাম। লিখতে লিখতে রাত ভোর হয়ে যেত। ঘুম হত না দিনের পর দিন। তবু লিখে যেতাম। লেখা ভুলিয়ে দিত খিদে, ভুলিয়ে দিত অভাব।'

পূর্ণেন্দু বলেন, 'সাহিত্যচর্চাই আমার অক্সিজেন। নাম, যশ, খ্যাতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি যেন আমার লেখা দিয়ে অন্তত একজন মানুষকে ছুঁতে পারি, আনন্দ দিতে পারি।' তাঁর কথায়, 'যদি তথাকথিত সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব করা হয়, তবে  আমি ব্যর্থ। কিন্তু লেখালিখির সূত্রেই আবুল বাশার, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষের সংস্পর্শ  পেয়েছি। আমার লেখা পড়ে কিছু মানুষ আনন্দ পেয়েছেন। এটিই আমার প্রাপ্তি।'

স্থানীয় স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন বঙ্গবাসী কলেজে। কিন্তু যাত্রাদলে আড়বাঁশি বাদকের ছেলে পূর্ণেন্দু দারিদ্রের চাপে শেষ করতে পারেননি পড়াশোনা। চা-বাগানের কাজ করতে যান দার্জিলিংয়ে। সেখান থেকে হোটেলে বাসন মাজার চাকরি নিয়ে ওড়িশায়। তারপর আরও কয়েকটি চাকরি ছেড়ে ২০০৮ সালে যাদবপুরে দেন বইয়ের স্টল। তবে সবকিছুর মধ্যে আসল বিষয় হিসেবে থেকেছে সাহিত্যচর্চা।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অর্জুন নস্করের কথায়, 'অসামান্য কাজ। একজন ফুটপাথের বই বিক্রেতা বিপুল তথ্যসমৃদ্ধ, অথচ অত্যন্ত সুপাঠ্য যে বইটি লিখেছেন, তা লিখতে পারলে অনেক অধ্যাপক, গবেষকই গর্ববোধ করতেন। যে পরিমাণ গবেষণা তিনি করেছেন, আমরা অনেকেই তা পারি না।'

ফুটপাথের পরিবেশে সমস্যা হয় না? পূর্ণেন্দুর উত্তর, 'হয় তো বটেই। বিশেষ করে খারাপ শব্দ আমায় বড্ড ক্লান্ত করে তোলে। তবে সমাধানও তো হাতের কাছেই।' রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা তুলে ধরে বলেন, 'লেখালিখি আর পড়াশোনার মধ্যে থাকলে অন্য কিছু গায়ে লাগে না তেমন।'

সূত্র : এবেলা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা