kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

লিপস্টিক থেকে খাবার পানি- সবকিছুতেই রাসায়নিক

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ মে, ২০১৯ ২০:১৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লিপস্টিক থেকে খাবার পানি- সবকিছুতেই রাসায়নিক

শুরু হয়েছিল নগরায়ন বিস্তৃতির মধ্য দিয়ে। ধীরে ধীরে রাসায়নিক নির্ভর জীবে পরিণত হয়েছে বিশ্বের মানবজাতি। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে উৎপাদন যন্ত্র, প্রসাধন থেকে শুরু করে তৃষ্ণার জল- সবকিছুতেই রাসায়নিক। বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র, লক্ষ লক্ষ ফার্মের স্থানে এখন রাসায়নিক কারখানা আর রাসায়নিক নির্ভর প্রতিষ্ঠান।

কীভাবে এইসব প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হলো- তা নিয়ে লিখেছেন মার্কিন লেখক, সাংবাদিক ম্যাকেই জেনকিনস :

শিক্ষার্থীরা আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, মার্কিন   প্রসাধন সামগ্রীতে কেন ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকে, ম্যাট্রেসে কেন নিউরোটক্সিন থাকে। কিংবা খাবার পানিতে কেন হরমোন ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী উপাদান থাকে, মেশাতে হয় বিশেষ ট্যাবলেট।

এসব প্রশ্নের জবাব দিতে আমি সবসময়ই দেশটির একটি মানচিত্র ব্যবহার করি। তুলে ধরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নির্মিত ৪৮ হাজার মাইল মহাসড়ক। তাদেরকে বলি, সড়কগুলো প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হতো বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হিসেবে। বিশ্বযুদ্ধের পর হঠাৎ করে এইসব উজ্জ্বল, চকচকে নতুন রাস্তাগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হলো মানুষ। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা লক্ষ লক্ষ মানুষ আবিষ্কার করল, তাদের সামনে তৃতীয় বিকল্প রয়েছে: চেনা শহরের বাইরে তারা নতুন সম্প্রদায় গড়ে তুলল। আর ডেভেলপাররা শুরু করল খামার ও বনভূমির ভয়াবহ রূপান্তর। শুরু হলো নতুন উপনিবেশ যুগ।

ভূমি ধ্বংস কিংবা ক্ষতিকর রূপান্তরের ফলে আমাদের পুরনো শহরগুলোতেও অর্থনৈতিক আগ্রাসন যুক্ত হলো। স্থানীয় খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হলো। বনাঞ্চল ও ফার্মগুলো রূপান্তরিত হলো। শহরের পরিধি বাড়তে থাকল। গড়ে উঠল শপিংমল। পুরনো শহর থেকে উচ্ছেদ হলো  হাজার হাজার বাসিন্দা। এই রূপান্তর চলল দেশব্যাপী। যুক্তরাষ্ট্র পরিণত হলো এক কনজুমার নগর জাতিতে। খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও ফার্ম ধ্বংস হওয়ার সুযোগে গড়ে উঠল রাসায়নিক কারখানা। পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাতে সাড়া দিল।

ফলে লিপস্টিক থেকে শুরু করে পানির বোতল,  প্রক্রিয়াজাত খাবার, বার্গার- সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ল রাসায়নিক। এমনকি, জমিতে শস্য উৎপাদনেও ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষতিকর সিনথেটিক সার ও আগাছানাশক।

এসব প্রক্রিয়া ডেকে আনল জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রজাতির বিলুপ্তি। তবে আমরা একসময় বুঝতে শুরু করি, অপ্রত্যাশিত খারাপ পরিণতিগুলোর মধ্যে বড় ধরনের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য সমস্যাও রয়েছে। আর  এগুলো সৃষ্টি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তির ফলে।

যুদ্ধের আগে বেশিরভাগ আমেরিকানরা শহর অথবা  খামারগুলিতে বাস করত। সেসবের কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই।

আমাদের ঘরও এখন রাসায়নিকে ভরা 
ননস্টিক প্যান, শিশুদের আগুনরোধী উপকরণ, প্রসাধনী, ড্রাই ক্লিনিং রাসায়নিক, প্যাকেটজাত খাবার, মাইক্রোওয়েভ পপকর্ন- কোথায় নেই  রাসায়নিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সেন্টারস ফর ডিসিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিক উপস্থিতি পরীক্ষা করছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমরা সবাই রাসায়নিক আক্রান্ত যা ক্যান্সার, হরমোন নিঃসরণ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন, নিউরোলজিক্যাল এবং প্রজনন সমস্যার কারণ হিসেবে বিবেচিত।

কয়েকটি সমস্যা : 
সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যবহারে প্রচুর পরিমাণ সিনথেটিক রাসায়নিক। মানুষের শরীরে এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।

বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে শারীরিক অক্ষমতা ১৯১% বৃদ্ধি পেয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিভাগের ডেভেলপমেন্টাল সার্ভিসেস বলছে, ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে গত কয়েক দশকে অটিজম বেড়েছে ২১০%। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষেত্রে সমস্যায় আক্রান্ত ২৪ লাখ আমেরিকান। আর বিশ্বের অন্যান্য স্থানে এই সংখ্যা দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কেনটাকি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে শিল্প কারখানা পরিষ্কারে ব্যবহৃত রাসায়নিক। বিশেষত ত্রিকোলোরোথাইলেনিন (টিসিই) নামের একটি দ্রাবক। এটি বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার, কিডনি, জরায়ু, এবং অক্সফ্যাগাস ক্যান্সারসহ নানা রোগের কারণ ঘটায়। দেশটির এক তৃতীয়াংশ পানিতে টিসিই'র উপস্থিতি রয়েছে।

তারপর আসে বর্জ্যের প্রসঙ্গ। একজন মার্কিন নাগরিক তার জীবদ্দশায় গড় ১৫ টন বর্জ্য নিক্ষেপ করে। এর বেশিরভাগই প্লাস্টিক। এসব প্লাস্টিক আবার সামুদ্রিক প্রাণির মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। সম্প্রতি ফিলিপাইনের উপকূলে একটি মৃত তিমির পেটে প্রায় ৪০ কেজি প্লাস্টিক পাওয়া যায়।

এবার আসা যাক ঘরের বাইরে। আমাদের খাবারও এখন রাসায়নিক নির্ভরশীল। দেশব্যাপী নগরায়ন বিস্তৃতির ফলে চার মিলিয়ন পরিবারিক ফার্ম হারিয়ে গেছে। আমাদের খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে শিল্প কারখানার চাহিদা অনুযায়ী। কারখানার জন্য উৎপাদিত শস্য যেমন গম, সয়াবিনসহ অনেক শস্যের জিনগত বিবর্তন আনা হয়েছে।

এসব উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে সিনথেটিক সার এবং এমন কীটনাশক ও আগাছানাশক যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে মানবদেহ এবং জীববৈচিত্র্যে। এতে ধ্বংস হচ্ছে প্রজাপতিসহ অন্যান্য জীব-অনুজীব। এক জরিপে ধারণা করা হয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ৭২ মিলিয়ন পাখি মারা যাচ্ছে কীটনাশকের কারণে। পাখির এই মৃত্যুর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, মারা যাওয়া পাখিদের বাবা-মা এমন কীট-পতঙ্গ খেয়েছে যার শরীরে কীটনাশক ছিল। 

খাবারে রাসায়নিক, প্লাস্টিক, এর মাধ্যমে আমাদের পরিবেশগত ও শারীরিক অসুস্থতা- এর সবই নাটকীয়ভাবে ত্বরান্বিত করেছে হাইওয়ে সিস্টেম- মূলত যা নির্মিত হয়েছিল আমাদের রক্ষাকবজ হিসেবে।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা