kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

গুগল লোকেশন চালু রাখাই ছিল খুনির ভুল

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ মে, ২০১৯ ১৯:০৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গুগল লোকেশন চালু রাখাই ছিল খুনির ভুল

আদিয়া শাবানি

'মেয়েটার ফোনের ডেটা বিল বন্ধ হয় ১২টা ৫০ মিনিটে। আর আমরা জানি ছেলেটা ওই বাড়িতে প্রবেশ করেছিল ১২টা ৪৮ মিনিটে। আমরা এটুকু বের করেছি যে, ছেলেটা ওই সময়ই বাড়িতে প্রবেশ করে এবং মেয়েটার ফোনে কিছু একটা করেছে। হয়তো ছেলেটা নিজে থেকেই মেয়েটার ফোন বন্ধ করেছে, অথবা নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ছেলেটার মোবাইলের ডেটা চালু ছিল। তাই আমরা জেনেছি সেখানে গিয়েছিল সে'। গোয়েন্দারা কথা বলছিলেন আদিয়া শাবানির হত্যাকাণ্ডের ক্লাইম্যাক্স অংশ নিয়ে। বলছিলেন কীভাবে বছরখানেক আগে খুন হয়ে যাওয়া মেয়েটার খুনীকে চিহ্নিত করা হয়েছে।   

সুন্দরী, আত্মবিশ্বাসী ও তারুণ্যে ভরা এক অভিনেত্রী ছিলেন আদিয়া শাবানি। স্বপ্ন দেখতেন হলিউডে ক্যারিয়ার গড়বেন। ঘটনাটা ঘটে যায় ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। হারিয়ে যান আদিয়া। তার অন্তরীন হওয়ার সেই ঘটনা এখন ব্লকবাস্টার অপরাধকাহিনি 'টু লিভ অ্যান্ড ডাই ইন এলএ' এর উপজীব্য। এটা সাংবাদিক নিল স্ট্রাউসের সঞ্চালনায় বাস্তবিক অপরাধকাণ্ডের পোডকাস্ট। 

শাবানির আসলে কী হয়েছিল তা বের করতে প্রাইভেট গোয়েন্দা জেইডেন ব্রান্টের সাথে জোট বেঁধেছিলেন সাংবাদিক স্ট্রাউস। শাবানিকে শেষবারের মতো হলিউডে দেখা গিয়েছিল তার প্রেমিক ক্রিস স্পোৎজের সাথে। সবকিছুর শুরু গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। মেসাডোনিয়া থেকে আসা এই অভিনেত্রী পুরো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। আদিয়ার বন্ধুরা জানিয়েছিলেন, আদিয়া তার প্রেমিকা স্পোৎজের সাতে স্রেফ রোড ট্রিপে গিয়েছিল। 

লস অ্যাঞ্জেলস পুলিশ বিভাগ তদন্তে শুরু করলো। যদিও তাদের অনুসন্ধানে হতাশ হয়ে পড়ছিল আদিয়ার পরিবার। তাদের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল। অবশেষে তারা প্রাইভেট গোয়েন্দা ব্রান্টকে ভাড়া করেন। আদিয়ার হারিয়ে যাওয়ার রহস্যভেদে নামলেন ব্রান্ট। 

ব্রান্ট সহকারী হিসেবে আনেন স্ট্রাউসকে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নথিবদ্ধ করার দায়িত্ব স্ট্রাউসের। দুজন মিলে বছরখানেকের বেশি সময় ধরে কাজ করে যান। রহস্যের ভেতরের জটিল ও কুটিল গহ্বর ভরাট করতে থাকলেন। 

এবিসি'কে ব্রান্ট বলেন, কেসের তদন্তের শুরুতেই বুঝতে পারি এ ঘটনায় অনেক প্রতারণা, বৈরীতাপূর্ণ আচরণ জড়িয়ে ছিল। তদন্তের শুরুতেই প্রেমিক স্পোৎজ সন্দেহের তালিকায় চলে আসেন। কারণ, দুই গোয়েন্দা আবিষ্কার করেন যে, শাবানির সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থাতেই স্পোৎজ আরেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন। 

হারানোর একমাস পর নিশ্চিত হওয়া গেলো, তিনি আর বেঁচে নেই। নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ায় তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। ভোঁতা জিনিসের তীব্র আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। খুন হয়েছেন আদিয়া। যেহেতু প্রেমিকের সাথেই ঘুরতে গিয়েছিলেন তিনি, তাই প্রাথমিক উত্তরটা তার কাছ থেকেই জানতে হবে গোয়েন্দাদের। 

কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ায় হাইওয়েতে পুলিশ ধাওয়া করে স্পোৎজকে। সেই সময় গুলিতে আত্মহত্যা করেন তিনি। কাজেই এই প্রেমিক যদি আদিয়ার খুনিও হয়ে থাকেন, তবুও আর জানার উপায় থাকলো না। 

ব্রান্ট জানান, এই পরিস্থিতি পুরোপুরি অনরকম। দুজন মানুষই অপঘাতে মারা গেলেন। এর মধ্যে একজনকে তো খুনি হিসেবে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। এতে করে খুনের ঘটনা তদন্তে আর আগানো কঠিন হয়ে গেলো। কারণ, সন্দেহভাজনের সাথে কথা বলারই উপায় নেই আমাদের। 

এখন স্পোৎজের পরিবারও জানতে চায় আসে কী হয়েছিল? কারণ, দুটো পরিবার পুরো বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। স্ট্রাউসকে সেই পরিবারও ধরেছে। তারা তাদের ছেলের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট তুলে দিয়েছেন স্ট্রাউস ও ব্রান্টের হাতে। 

স্পোৎজের চলাফেরা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে গুগল। এমনকি ফোনের তথ্য থেকেও যা বের করে আনা যায়নি। গুগলের মাধ্যমেই মূলত স্পোৎজের একবারে সঠিক নড়াচড়া বেরিয়ে এসেছে। প্রতি মিনিটে প্রেমিকের পদক্ষেপ জানা গেছে। 

গোয়েন্দারা জানান, এটা সম্ভব হয়েছে কারণ স্পোৎজ কখনোই তার ফোনটা বন্ধ করেননি। তাই আদিয়া তুলে নেয়ার সময়টাও গুগলে দেখা গেছে। যে দিনটাতে আদিয়া হারালো এবং যে পথে হারালো তার সবই বেরিয়ে এসেছে। 

স্ট্রাউস জানান, কেউ যদি হারিয়ে যায় কিংবা কিছু ঘটে যায় তাহলে তার ফোন বন্ধ থাকলে কী যে হতো তা বলা যায় না। যদি ক্রিস স্পোৎজের মোবাইল বন্ধ থাকতো তাহলে আমরা জানি না তথ্য বের করা যেত কিনা। শাবানি বেঁচে থাকার আগমুহূর্ত পর্যন্ত যাবতীয় তথ্য গুগলের তথ্য থেকে মিলেছে। 

এ কথা প্রথমেই জানানো হয়েছে, শাবানির ডেটা বিল বন্ধ হয় ১২টা ৫০ মিনিটে। আর ক্রিস ওই বাড়িতে প্রবেশ করেছিল ১২টা ৪৮ মিনিটে। এমনকি পরে নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ার যে স্থানে আদিয়ার মৃতদেহ মেলে সেখানে ক্রিসের অবস্থানের অত্বিস্তও মেলে। 

এই প্রেমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এলএপিডি মনে করে, আদিয়া হত্যাকাণ্ড ক্রিসের হাতেই হয়েছিল। এ কারণে সে ধরা পড়তে চায়নি। এর চেয়ে আত্মহত্যাকে ভালো মনে করেছে। 

ক্রিসের গুগল লোকেশন ডেটার মাধ্যমে আসলে তার সব সময়ের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। এতেই ঘটনা অনেক পরিষ্কার হয়ে আসে। তবে শাবানির এই 'রোডট্রিপ' এবং খুনের ঘটনার শেষটা ভালো লাগেনি স্ট্রাউসের কাছে। হয়তো ক্রিস সরাসরি খুন করেনি। কিন্তু খুনে সহায়তা করেছে। 

স্ট্রাউস জানান, মেয়েটা (আদিয়া) তার বন্ধুদের বলেছিল যে সে ক্রিস স্পোৎজের আঙ্কেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে যাচ্ছে। কিন্তু ক্রিসের পরিবারের কাছে যখন এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় তখন তারা জানান, ক্রিসের এমন কোনো আঙ্কেল নেই যিনি মারা গেছেন। এতেই ক্রিসের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হয়। 

শাবানিতে তুলে নেয়ার আগে ক্রিসের শেষ অবস্থান হিসেবে একটি হার্ডওয়্যারের দোকান এবং নর্থ হলিউডের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনকে চিহ্নিত করা গেছে। আদিয়াকে গাড়িতে তুলে নেয়ার পথে এসব স্থানেই থেমেছিলেন ক্রিস। যদি জানা যায় সেসব স্থানে কী কী করেছিলেন বা কাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তবে অনেক তথ্যই বেরিয়ে আসবে। 
   
তবে এই অনুসন্ধান চলমান থাকবলে বলে জানান সাংবাদিক। বলেন, আমরা আসল ঘটনা উৎঘাটনের কাছাকাছি। আমরা যাবতীয় তথ্যভাণ্ডারের শেষ কয়েকটা তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছি। 

'টু লাইভ অ্যান্ড ডাই ইন এলএ'র দল এবিসি'কে জানায়, পোডকাস্টের শেষ পর্বে তদন্তকাজের শেষটা বিস্তারিত জানানো হবে। এটা পোস্ট করা হবে এই মাসেরই ১৭ তারিখে। এটা আসলে স্ট্রাউস এবং টেন্ডারফুট টিভি'র সমন্বয় এবং এর সহকারী প্রযোজক হিসেবে আছে ক্যাডেন্স ১৩। 

স্ট্রাউস বলেন, গত সপ্তাহে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি। গুগল আমাদের অনেক প্রশ্নের এমন জবাব বের করে দিয়েছে তা হয়তো কখনোই পাওয়া সম্ভব হতো না। আমরা চাই ক্রিস ও আদিয়ার দুই পরিবার তথ্যগুলো আগেভাগে জানুক।  
সূত্র: এবিসি নিউজ 

মন্তব্য